সমাজের বুনে দেওয়া কিছু প্রথা সোহেল ভাঙতে পেরেছেন, কিছু এখনও বাকি। তাঁর মতে, ছেলে হয়ে যদি সোয়েটার পরা যেতে পারে, তাহলে ছেলে হয়ে সোয়েটার বুনতে পারা যাবে না কেন?

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 4 December 2025 18:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১৬ সালে মাকে হারানোর পর না ছাড়তে চাওয়া এক বিষণ্ণতা ঘিরে ধরেছিল সোহেলকে। একধাক্কায় যেন অনেকটা বড় হয়ে যাওয়া! নিজেকে ঠিক করে সামলানোর আগেই চলে এল ২০২১ সাল, লকডাউন, ওয়ার্ক ফ্রম হোম আর... দোসর অ্যাংজাইটি (anxiety)। একদিকে ছেলে হিসেবে বাড়ির দায়িত্ব, অন্যদিকে অফিসের চাপ - একপ্রকার দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন ২৯ বছরের সোহেল। ডাক্তার, থেরাপি সবই হল কিন্তু সুরাহা হল কই!
মায়ের কাছ ঘেঁষে থাকা ছেলেটার মনে পড়ে মায়ের অবসরযাপনের কথা। সেলাই করা, উল বুনতে দেখেছে সে মাকে। কোথাও যেন শুনেছিলেন উল বোনা নাকি অ্যাংজাইটি কমাতে সাহায্য করে। অর্ডার করে বসলেন উল-কাঁটা। তারপর ইউটিউব থেকে শেখা শুরু (karnataka guy knits wool and broke stereotypes)। টানা ২২ দিন, টানা লেগে থাকা। প্রথমে তো উলের সুতোয় আঙুল জড়ানো ছিল স্রেফ মনের শান্তি খোঁজার একটা মাধ্যম, তারপর সেটাই হয়ে উঠল হবি, অবসরযাপনের খেলা। কাঁটা-কাঁটা ঘষে ঘর গুণে উল বোনার মাঝেই কেমন করে যেন শুরু হল জীবনকেই নতুন করে বোনা (engineer guy breaking stereotypes)।

সোহেল নারগুন্দ কর্নাটকের বাসিন্দা, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। উলের কাঁটা ঘষে তিনি ভালবাসা বোনেন, ভালবাসায় বোনেন। সোহেলের কথায়, 'উল বুনতে গেলে ব্রেন আর হাতের মধ্যে একটা কো-অর্ডিনেশন হতে হবে। দু'মাস লেগেছিল ঠিক করে শিখতে।'
দিদিকে সব খুলে বলা, মাঝে মাঝেই হোয়াটঅ্যাপে হাতের কাজ দেখানোটা যতটা সহজ ছিল, বাবা কিচ্ছু জানতেন না। তাঁর কাছে মুখ ফুটে নিজের এই নতুন ভাললাগার কথা বলাটা বেশ কঠিন মনে হয়েছিল সোহেলের। ভেবেছিলেন, বাবা হয়তো মেনে নেবেন না, হয়তো মুখের ওপর বলে বসবেন, 'মেয়েদের মতো কাজ'। কিন্তু সাহস করে বাবাকে একদিন বলেই ফেলেন, বাবা যে শুনে এতটা খুশি হবেন, সেটা ভাবনাচিন্তার বাইরে ছিল সোহেলের।
তাঁর কথা, 'আমি সবসময় মুখিয়ে থাকতাম, কখন অফিসের কাজ শেষ হবে, আর উল-কাঁটার দুনিয়ায় যেতে পারব।'
পরিবারকে বরাবর পাশে পেয়েছেন সোহেল। এমনকি প্রথম সোয়েটার বোনা-ও দিদির সঙ্গেই।
চার দেওয়ালের বাইরের পৃথিবীর চোখ কি হামলে পড়েনি তাঁর ওপর?
সেটা আবার আরও এক অন্যরকম গল্প। মাঝে প্রায় এক মাসের কাছাকাছি বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সেই সময়ও মানসিক চাপ কাটাতে সহায় হয়েছিল সেই উল-কাঁটা। আশপাশে থাকা গ্রামের কিছু লোকের কাছে এটা একটু অদ্ভুত মনে হয়েছিল যে ছেলে হয়ে উল বুনছে! তাঁরা এগিয়ে এসে বলেছিলেন, 'এটা তো আমরাও পারি না, তুমি কীভাবে করছ!' সেই দু'চার কথাই সাহস যুগিয়েছিল সোহেলকে যে, এবার বাইরের পৃথিবীর কাছেও এটা প্রকাশ করার সময় এসেছে।
তারপর একে একে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে থাকেন তাঁর হাতে বোনা সোয়েটার-মাফলারের ছবি। সোহেলের উদ্দেশ্য ছিল একটাই, মানুষকে এটা বোঝানো যে, উল বোনা শুধু মেয়েদের কাজ নয়। তাঁর কথায়, 'আমি নতুন প্রজন্মের কাছে এই একটা দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চেয়েছিলাম যে, মোবাইল স্ক্রিনের বাইরেও একটা জগত আছে।'

এই পর্যন্ত জীবন একরকম ছিল। একদিন তাঁকে উলতে বুনতে দেখে একজন ভিডিও করে পোস্ট করে দেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। 'মেয়েদের মতো উল বুনছে'র পাশাপাশি উঠে আসে অনেক মানুষের ভালবাসাভরা কমেন্ট। ভাবলেন, শখ তো ঠিকই আছে, যদি ছোট্ট একটা ব্যবসা শুরু করা যায়?
সোশ্যাল মিডিয়ায় সোহেলের চেনাজানা মানুষরা তো বটেই, অচেনা অনেকের থেকেই ভালবাসা আসতে থাকে। 'তোমার জন্য আমি আবার উল বোনা শুরু করেছি' - এমন নানা বার্তায় তাঁর মেসেজ বক্স ভরে উঠতে থাকে। কিছু বানিয়ে দিতে হবে - এমন ধরনের মেসেজ নিয়ে অনলাইনে অর্ডার আসতে শুরু করে সোহেলের কাছে। চাকরির পাশাপাশি শুরু করেন নিজের ছোট্ট ব্যবসাও।

মা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, খুব খুশি হতেন সেই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই তাঁর। অনেকেই তাঁর পোস্টের নীচে কমেন্ট করে জানান তাঁরা অনেকেই ওঁর মতো জীবনের খুব খারাপ সময়ে উল বোনা বা কুরুশ বোনা শুরু করেছিলেন। মনখারাপ নিমেষে পালিয়েছে। কোনও মহিলা কমেন্ট করে জানিয়েছেন যে, তিনিও বাবার কাছে সোয়েটার বোনা শিখেছেন।
সমাজের বুনে দেওয়া কিছু প্রথা সোহেল ভাঙতে পেরেছেন, কিছু এখনও বাকি। তাঁর মতে, ছেলে হয়ে যদি সোয়েটার পরা যেতে পারে, তাহলে ছেলে হয়ে সোয়েটার বুনতে পারা যাবে না কেন?
ছবি - সোহেলের ইনস্টাগ্রাম