মেয়েরা বোঝা নয়, বরং সংসারের একটা স্তম্ভ। বাবা-মায়ের শক্তি ও সমাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারিগর। আর এই কথাগুলোই প্রমাণ করলেন বিহারের কমল সিং।

কমল সিং ও তাঁর মেয়েরা (ছবি - সংগৃহীত)
শেষ আপডেট: 15 June 2025 17:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা সময় দেশে নারী-পুরুষের অনুপাত ছিল বিষম। মেয়েদের সংখ্যা এদেশে ছিল অত্যন্ত কম। মেয়ে মানেই 'বোঝা,' বিয়ে দিতে হবে, স্বামী ছেড়ে দিলে ঘরে ফিরে এলে আবারও দেখতে হবে, এমন ধারণায় বুঁদ ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বহু প্রচেষ্টায় মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে মানুষের। মহিলাদের ছোট করে দেখা বা অন্যান্যদের থেকে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ হিসেবে দেখার চোখ বদলেছে। এখন মেয়েরা বোঝা নয়, বরং সংসারের একটা স্তম্ভ। বাবা-মায়ের শক্তি ও সমাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারিগর। আর এই কথাগুলোই প্রমাণ করলেন বিহারের কমল সিং। সাত কন্যার বাবা কিন্তু একবারও চাপ নেননি এই নিয়ে। উল্টে সাত মেয়েকে 'মানুষ' হিসেবে বিবেচনা করে তাঁদের গড়ার কাজ করেছেন প্রতিনিয়ত। দারিদ্র্য বা মানুষের কথা তাঁকে নাড়া দিতে পারেনি।
কমল সিং একজন সাধারণ আটাচাকী। দিনরাত কাজ করতেন। সংসার বাড়তে থাকায় খরচ বাড়তে শুরু করে। নিজের চেষ্টায় তাই একটি আটার মিল খোলেন, দুধ বিক্রি করার জন্য কেনেন গরু। এই দুই থেকে তাঁর যা আয় হত তার সবটাই দিয়ে দিয়েছেন মেয়েদের পড়াশোনার খাতে। আর্থিক সমস্যা ছিল, কিন্তু স্বপ্ন দেখতেন মেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করার। আর সেই স্বপ্ন থেকে সমাজের তথাকথিত সভ্য শ্রেণির মানুষজনের পরামর্শ বা গঞ্জনা টলাতে পারেনি।
মেয়েরা একদিন দেশসেবা করবে, উর্দি পরে ভারত মাতাকে আগলাবে, এই চিন্তাধারা মাথায় গেঁথে গেছিল। আর সেই লক্ষ্যেই দিনের পর দিন এগিয়ে গেছেন। এনিয়ে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'মানুষ আমাকে নিয়ে মজা করত, বলত আমার মেয়েরা বিয়ে করে যৌতুক নিয়ে চলে যাবে। কিন্তু মেয়েদের ওপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা ছিল। আমি জানতাম, ওরা একদিন বড় হবে। নিজেদের নাম উজ্জ্বল করবে।'
কমল সিং নিজেই সাত মেয়েকে প্রস্তুত করতেন। কুস্তিগীর মহাবীর সিং ফোগাটের মতোই মেয়েদের পিছনে সারাদিন কেটে যেত তাঁর। ভোর ৪টেয় উঠে শারীরিক প্রশিক্ষণের জন্য তুলতেন মেয়েদের এবং রাত ১১টা পর্যন্ত পড়াশোনা করাতেন।
নিজের জীবন কার্যত বলিদান দেওয়ার পর তাঁর কঠোর পরিশ্রম সার্থক হয়। আজ তাঁর মেয়েরা বিহার পুলিশ, সিআরপিএফ, সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি), সরকারি রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) এবং আবগারি পুলিশে কর্মরত। আর ছেলে রাজীব সিং রাজপুতও এই সাতজনের সঙ্গেই একইভাবে বেড়ে ওঠে। বর্তমানে বি টেক শেষ করে দিল্লিতে একটি সংস্থায় কর্মরত।
নিজের সবটা দিয়ে দিয়েছিলেন এই বাবা তাঁর সন্তানদের জন্য। বাবাকে কী আগের মতোই ছোট ঘরে, কষ্টে রাখা যায়! বাবাকে ভাল রাখতে মেয়েরা তৈরি করে দিয়েছেন চারতলা বাড়ি। বাবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসারের দায়িত্ব এখন তাঁদেরও। যদিও কমল সিং এখনও তাঁর আটার মিল চালাচ্ছেন, প্রমাণ করছেন, আসল শক্তি কঠোর পরিশ্রম, সাহস এবং সমাজের মানসিকতা পরিবর্তনের মধ্যে নিহিত।