সন্ধ্যাবেলা আর কারও দরজায় বন্ধুর কড়া নাড়ে না, বরং নেটফ্লিক্স নোটিফিকেশন জানায়, 'নতুন এপিসোড রেডি!'

গ্রাফিক্স-দিব্যেন্দু দাস।
শেষ আপডেট: 12 November 2025 19:29
সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষও। একসময় বিকেল মানেই বন্ধুর আড্ডা (Friendship), মাঠের ধুলো, চায়ের কাপ আর গল্পের ঝড়। এখন বিকেল মানে ব্লু-লাইটে ভেসে থাকা মুখগুলো, স্ক্রিনের ওপাশে বন্ধুত্ব, স্ক্রলেই বিনোদন, আর নোটিফিকেশনেই সুখের সংজ্ঞা।
বন্ধু এখন হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে, ভালবাসা ইমোজিতে, আর মনখারাপ ‘স্টোরি’-তে। বাইরে না বেরিয়েও মানুষ আজ সারাদিন ‘কানেক্টেড’, অথচ মনের ভিতরটা আরও একা, আরও ফাঁকা (New Society of Loneliness)।
কাটোয়ার তরুণী সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, “আগে বন্ধুরা হঠাৎ বাড়ি চলে আসত। এখন দেখা করতে বললেই বলে—‘ভয়েস কলে কথা বলি!’” তার কথাতেই সময়ের প্রতিধ্বনি, আমরা এমন এক সময়ে পৌঁছেছি, যেখানে সম্পর্ক গড়ি না, বরং অ্যাপ ডাউনলোড করি।
মনোবিদ সৌমী চক্রবর্তী সতর্ক করছেন, “আমরা এমন এক বৃত্তে বন্দি, যেখানে ‘নিজে’, ‘নিজের ফিটনেস’, ‘নিজের ফুড’, আর ‘নিজের ফিড’ ছাড়া আর কিছুই নেই। মানুষ এখন আর সমাজের অংশ নয়, সে কেবল নিজের প্রোফাইলের প্রডিউসার।”
আজ বন্ধুত্ব মানে জিম পার্টনার, নেটফ্লিক্স কো-ওয়াচ, বা এআই চ্যাটবটের সঙ্গে ‘ডিপ টক’। বাস্তব সম্পর্কের উষ্ণতা হারিয়ে গেছে, কারণ সেখানে থাকে তর্ক, দাবি, দায়িত্ব— যা এখনকার মানুষ ‘অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা’ ভাবে।
ফলাফল? ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, অনিদ্রা— এক নিঃশব্দ মানসিক মহামারি ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ এখন সুখ মাপে লাইক, ভালবাসা মাপে কমেন্ট, আর আত্মসম্মান মাপে ফলোয়ার কাউন্টে।
সন্ধ্যাবেলা আর কারও দরজায় বন্ধুর কড়া নাড়ে না, বরং নেটফ্লিক্স নোটিফিকেশন জানায়, 'নতুন এপিসোড রেডি!' ফলে জীবন আজ থমকে গেছে স্ক্রিনে—যেখানে বন্ধুত্ব মানে কনট্যাক্ট লিস্ট, গল্প মানে ইনস্টা রিল, আর একলা থাকা মানে আধুনিকতার প্রতীক।
একটা সময় মানুষ বন্ধু হারালে কাঁদত, এখন ‘নেট না থাকলে’ মন খারাপ হয়। সময়ের এই নিঃশব্দ রূপান্তর, আধুনিকতার সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।
এর থেকে বেরোনোর উপায়? মনোবিদ সৌমী চক্রবর্তী বললেন, “প্রযুক্তি আশীর্বাদ হতে পারে, যদি আমরা তার দাস না হই। নিজের ভাল চাইলে ফোনেও ‘ব্রেক টাইম’ দিন। না হলে হয়তো বন্ধুহীন এই একাকীত্বই হবে পরের মহামারী।”