সময়ের সঙ্গে মানুরুং পরিবার নিজেদের গল্প, সাহস আর হাসিখুশি জীবন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নিতে শুরু করেন। আর সেখানেই আসে বড় পরিবর্তন। তাদের ইউটিউবে (Youtube Subscriber) এখন ৩ লক্ষের বেশি সাবস্ক্রাইবার

ইন্দোনেশিয়ার ভাইরাল টিকটিকি মুখ পরিবার
শেষ আপডেট: 13 December 2025 17:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বজুড়ে নানান বিরল রোগের (Rare disease) গল্প শোনা যায়, কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার একটি পরিবারের কাহিনি যেন বাস্তবের থেকেও বেশি অবিশ্বাস্য। একই পরিবারের চার সদস্যের মুখের গঠন জন্মগত এক বিরল রোগে বদলে যায় ঠিক যেন 'টিকটিকির মুখ' (Lizard face family), আর তাতেই শুরু হয় ভুল ধারণা, কুসংস্কার ও অপমানের যাত্রা। গ্রামবাসীরা প্রথমে ভেবেছিলেন- এ নাকি দুষ্ট আত্মার অভিশাপ। তবে সত্যি সামনে আসতেই বদলে যায় সব ধারণা। সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজ সেই মানুরুং পরিবারই সোশ্যাল মিডিয়ায় সাহস, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচকতার প্রতীক হয়ে লাখো মানুষের প্রেরণা।
ইন্দোনেশিয়ার সেই ‘টিকটিকি মুখ’ পরিবার
ইন্দোনেশিয়ার (indonesia lizard family) উত্তর সুমাত্রার মানুরুং পরিবার তাদের অস্বাভাবিক মুখের গঠনের কারণে হঠাৎই বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরিবারের ছয় ভাইবোনের মধ্যে চারজনের চেহারা স্বাভাবিকের থেকে একদম আলাদা- চামড়া খুব নরম, মুখের হাড় গঠন ঠিকমতো হয় না, আর দাঁতের চারপাশের মাড়ি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। এই বদলের জন্য অনেকেই প্রথমে এটিকে অভিশাপ ভাবলেও, আসলে এটি তাদের বংশগত এক বিরল জিনগত রোগ।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই বিরল রোগের নাম ট্রিচার কলিন্স সিনড্রোম (Treacher Collins Syndrome)। এতে মুখের হাড় ও ত্বক ঠিকমতো গঠিত হয় না, ফলে চেহারার আকার বদলে যায়। তবে আশার কথা হল, রোগটি শুধু শরীরের বাহ্যিক গঠনে প্রভাব ফেলে, মানসিক ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা বা শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কোনও ক্ষতি করে না।
অভিশাপের ভয় থেকে বাস্তবের স্বীকৃতি
কেদুংকাং গ্রামের মানুষজন প্রথমে মনে করেছিলেন মানুরুং পরিবারে হয়তো কুসংস্কার বা দুষ্ট আত্মার অভিশাপ লেগেছে। সেই ভুল ধারণার চাপ পড়েছিল পরিবারের ছেলেমেয়েদের ওপরও। মানুরুং পরিবারের প্রধান জানিয়েছেন, “আমাদের মুখের গঠন বদলে গেছে, কিন্তু আমরা সেটাকে মেনে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে শিখেছি।”
এই বিরল রোগে আক্রান্ত পরিবারের ছোট ছেলে সুরিয়া মানরুং পুরনো দিনের তিক্ত স্মৃতি মনে করে বলেন, কাজ খুঁজতে গেলে প্রথমে মানুষ দূরে সরে যেত। সামাজিক ধারণা ও অপমান তাঁদের মানসিকভাবে দুর্বল করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের এই দুর্বলতাকেই শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। অভিশাপ নয়, বরং জীবনের এক বাস্তবতা হিসেবে এটিকে গ্রহণ করেন।
বিশ্বে অন্যান্য অনুরূপ বিরল রোগ
মানরুং পরিবারের মতো আরও একটি বিরল রোগ আছে, যার নাম বার্বার-সে সিনড্রোম। ব্রাজিলের কাওয়ানা নামে এক মহিলা এই রোগে আক্রান্ত। পৃথিবীতে এই রোগের কেস ২০টিরও কম। এই ধরনের জিনগত রোগেও চেহারার গঠন বদলে গেলেও আয়ু বা বুদ্ধিমত্তার কোনও ক্ষতি হয় না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বদলে গেল জীবন
সময়ের সঙ্গে মানুরুং পরিবার নিজেদের গল্প, সাহস আর হাসিখুশি জীবন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নিতে শুরু করেন। আর সেখানেই আসে বড় পরিবর্তন। তাঁদের ইউটিউবে (Youtube Subscriber) এখন ৩ লক্ষের বেশি সাবস্ক্রাইবার এবং টিকটকে ২৩ লক্ষেরও বেশি ফলোয়ার। নিজেদের ভিন্নতাকে লুকোনোর বদলে গ্রহণ করেই তারা মানুষের মন জয় করেছেন। তাদের যাত্রা সবাইকে শেখায়, চেহারা নয়, আত্মবিশ্বাসই মানুষের আসল শক্তি।
মানুরুং পরিবারের (Manrung Family) সংগ্রাম শুধু এক বিরল রোগের বিরুদ্ধে নয়, সমাজের ভুল ধারণা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও। তারা দেখিয়েছেন চেহারার বিকৃত গঠন লজ্জার নয়, গর্বের বিষয়। তাদের গল্প আজ লাখো মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা।