বাংলাদেশে হাসিনা জমানা শেষ হওয়ার পর সেখানকার পরিস্থিতি অস্থির। বাংলাদেশি ক্রেতা না থাকায় এশহরের নিউ মার্কেট–হগ মার্কেটে বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, ব্যবসায়ীরা দিশেহারা।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 19 November 2025 18:41
বাংলাদেশে সংরক্ষণ নিয়ে আন্দোলন গত বছর ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়। বদলে যায় বাংলাদেশের খোলনলচে। অন্তর্বর্তী সরকার তৈরি হয় এবং দায়িত্বে আসেন মহম্মদ ইউনুস। তারপর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ফাটল ধরতে শুরু করে। পরে জানা যায়, শেখ হাসিনা প্রতিবেশী দেশ ভারতেই রয়েছেন। সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। ওপর ওপর ইলিশ পাঠিয়ে শাক দিয়ে মাঠ ঢাকার চেষ্টা হলেও কূটনাতিক চাপানউতর যে রয়েছে, তা কারও অজানা নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা মানুষজনের সংখ্যা অনেকটাই কমেছে। বাংলাদেশীরা আসতে পারছেন না। ভিসা সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। মাস খানেক ধরে পরিস্থিতি সামান্য স্বাভাবিক হলেও মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি ছাড়া ভারতে প্রবেশ করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের লোকজন আসছেন না ফলে আগে যেমন শ্রীলেদার্স থেকে হগ মার্কেট, পার্কস্ট্রিটের বেশিরভাগ হস্টেল-হোটেল বাংলাদেশী কাস্টমারে ভরা ছিল, এখন সেসব অতীত।
কলকাতার এই চত্বর অর্থাৎ নিউমার্কেট এলাকার কাস্টমার বেশিরভাগই বাংলাদেশী। বাঙালিরা সাধারণত পছন্দ করে গড়িয়াহাট, হাতিবাগান বা দক্ষিণাপন। বাংলাদেশী আসা কমে যাওয়ায় ব্যবসা মার খাচ্ছে নিউ মার্কেট, হগ মার্কেটের প্রায় সব দোকানের। তাঁদের অনেকেই গড়িয়াহাট বা হাতিবাগান চত্বরে দোকান বসাচ্ছেন। কেউ কেউ ইতিমধ্যে জায়গা বদল করেও ফেলেছেন।
এমন একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তি সম্প্রতি জানান, তিনি বাধ্য হয়ে এক বছর পরিস্থিতি দেখার পর গড়িয়াহাটে দোকান ভাড়া নিয়ে চলে এসেছেন। উপায় নেই, পেট চালাতে হবে। আরেকজন আবার জানান, তাঁর পাইকারি ক্রেতা ছিল সব বাংলাদেশের, তাঁরা আর না আসায় পরিস্থিতি খুবই জটিল। অনলাইনে এত জিনিস পাঠানোও চাপের, সমস্যা রয়েছে লজিস্টিকেও, ফলে সম্ভব হচ্ছে না।
তাঁদের একটাই কথা, হাসিনার সময়কালে সবকিছু খুব মসৃণ ছিল কিন্তু কোথা থেকে কী হয়ে গেল! বেশিরভাগ লোকজনই দোকান অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
একই অবস্থা বিধান মার্কেটের। খেলার জার্সি থেকে ফুটবল, চকচকে শাড়ি থেকে সিন্থেটিক কাপড়, সব স্টকই প্রায় বাংলাদেশী খরিদ্দারের পছন্দের কথা মাথায় রেখে। কিন্তু এক বছর ধরে বিক্রি বাট্টায় একটু হলেও ভাটা পড়েছে। নতুন স্টক এনেও ব্যবসায় বিরাট কিছু পরিবর্তন হচ্ছে না। সকলেই শেষ ১২-১৩ মাস ধরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশায় ছিলেন।
কিন্তু কোথায় কী, স্বাভাবিক হওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। সোমবার একাধিক মামলায় হাসিনার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। একই সাজা হয়েছে সেখানকার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের। সাজা ঘোষণার পর হাসিনাকে অবিলম্বে ফেরত চেয়েছে ঢাকা। কোনওরকম দেরি না করে তার জবাব দিয়েছে দিল্লি। সোমবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানায়, ঢাকার রায়ের বিষয়টি দিল্লি সরকারিভাবে নথিভুক্ত করেছে। মনে রাখতে হবে ভারত সবসময়ে বাংলাদেশের মানুষের শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার পক্ষেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে, ভারত ফেরাবে কি না সেবিষয়ে কিছু স্পষ্ট হয়নি।
এক বছর ধরে হাসিনা ফেরার, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার দিকে তাকিয়ে এই দোকানদারা বুঝতে পারছেন না এখন কী করবেন। আদৌ কি কোনওদিন আর বাংলাদেশী খরিদ্দাররা এদেশে আসবেন আর আগের মতো? উত্তর নেই কারও কাছে। আপাতত ব্যবসা বাঁচাতে বিকল্প পথ ভাবা ছাড়া কোনও উপায় নেই, বলছেন তাঁরা।
শুধু খুচরো বিক্রেতারা সমস্যায় পড়েছেন, এমন নয়। ব্যবসা কমেছে পাইকারি ক্রেতাদেরও অর্থাৎ যাঁরা বাংলাদেশের মালপত্র আমদানি করতেন এবং এদেশে বেচতেন। এদেশে আমদানি সেভাবে না হওয়ায় আসছে না শাড়ি, চকোলেট-সহ বহু জিনিস।
এছাড়াও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো শপিং–ট্রিপে আসতেন, তাঁরা এখন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ঢাকা–খুলনা–বরিশাল–চট্টগ্রামের ট্যুর অপারেটরদের মতে, গত এক বছরে কলকাতা ট্যুর বুকিং কমেছে ৬৫%। শুধু পর্যটন নয়, মেডিক্যাল ট্যুরিজম, প্যাকেজ ট্রেড, পাইকারি পোশাক কেনা- সব ক্ষেত্রেই একই অবস্থা।
এদিকে দু’দেশে কূটনৈতিক টানাপড়েন পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। কূটনীতিকদের মতে, ঢাকার তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে হাসিনাকে ফেরত চাওয়া মানে সম্পর্কের নতুনভাবে ‘দ্বন্দ্ব’ তৈরি করা। ভারত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি, প্রত্যর্পণ নীতি এবং নিজেদের কৌশলাগত স্বার্থ, সব বিবেচনা করে এখনও সিদ্ধান্ত জানায়নি। হাসিনাকে দিল্লি ফেরাবে কি না তা সময় বলবে।
কলকাতার পরিস্থিতি যে শুধু এমন তা নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও টালমাটাল। জামা কাপড় রফতানি কমেছে প্রায় ৯%, যার ফলে দেশটির ডলার–রিজার্ভ চাপে। এর প্রভাবে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত বাণিজ্যে, পেট্রাপোল–বেনাপোল ট্রেডে ট্রাক চলাচল কমেছে ২০–২৫%।
ওয়াকিবহল মহলের দাবি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহ যত সময় নেবে স্থির হতে, তত সময় লাগবে ‘ক্রস–বর্ডার শপিং’–ইকোনমি স্বাভাবিক হতে। ফলে নিউমার্কেটের এখন একটাই পথ, বিকল্প কেনাকাটার জনসংযোগ বাড়ানো, স্থানীয় ট্রেন্ড ফিরিয়ে আনা বা গড়িয়াহাট–হাতিবাগানের মতো বাজারে নতুন করে শিকড় গাড়া।