পুজোর আগে কুমোরটুলির অলিগলি যেন ফোটোশ্যুটের সেট। মেকআপ, আলো, ক্যামেরা নিয়ে জমজমাট শুটিংয়ে বিপাকে পড়ছেন মৃৎশিল্পীরা। কেউ কেউ ফোটো তোলা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছেন যাতে কাজ নির্বিঘ্নে চলতে পারে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 12 September 2025 17:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাটির তৈরি দুর্গার সামনে সত্যিকারের দুর্গা। পুজোর আগে ইনস্টাগ্রাম খুললেই রিল-ছবিতে ভরে ওঠে ফিড। ফেসবুকের অবস্থাও একই। আর কুমোরটুলিতে? তিল ধারণের জায়গা থাকে না। প্রতিমা শিল্পীরা অনেকসময়ই বিরক্ত হয়ে বলে দেন, সরে যেতে বা অন্যদিকে চলে যেতে। কিন্তু তাতে কার কী। স্পেস দেওয়া, সেটা আবার কী, আখের গোছাতে হবে তো!
এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চা চলে কিন্তু পদক্ষেপ শূন্য। কেউ কোনওদিন কোনওরকম পদক্ষেপ করেননি। প্রতিবাদও যৎসামান্য। ফলে দিনের পর দিন একই ঘটনা হয়ে চলেছে। কিন্তু এবার কুমোরটুলির চিত্রটা বেশ আলাদা। দুর্গাপুজোর আর হাতে গোনা ক’টা দিন বাকি। কিন্তু ফোটোগ্রাফারদের সেই ভিড়, উঠতি মডেলদের দাপাদাপি নেই বললেই চলে।
প্রতিমা গড়ার ব্যস্ততার মধ্যে লালপাড় সাদা শাড়ি পরা মডেল বা গলায় ক্যামেরা ঝোলানো ফোটোগ্রাফাররা যে পরিমাণ বিরক্ত করেন, তার প্রতিবাদ স্বরূপ অনেক শিল্পীই এবার নিজের স্টুডিওতে ছবি তোলা নিষিদ্ধ করেছেন।
শিল্পীদের অভিযোগ, এই ভিড় এখন আর কেবল প্রতিমা দেখতে আসা মানুষের নয়, বরং নিজেদের ছবি তোলার নেশায় মেতে উঠেছেন সকলে। কারও হাতে স্ক্রিপ্ট, কারও হাতে আলো-ঝলমলে লাইট। হঠাৎ ধাক্কা লাগলেই ক্ষতি হতে পারে লক্ষ টাকার প্রতিমার। 'পুরো পাগলামি চলছে' ক্ষোভ প্রকাশ করেন কুমোরটুলি মৃত শিল্পী সমিতির সম্পাদক কার্তিক পাল। তাঁর কথায়, 'কেউ কথা শুনতে চান না। আমরা অনুরোধ করলেও সরে দাঁড়ান না। এত ভিড়ের মধ্যে একবার কিছু ভেঙে গেলে ক্ষতি আমাদেরই।'
কেবল ছবি নয়, এখন নাচ-গানও যোগ হয়েছে। সাজগোজ করে তরুণ-তরুণীরা প্রতিমার সামনে নাচছেন, রিলস বানাচ্ছেন। অথচ শিল্পীদের অনুমতি তোয়াক্কা করার বালাই নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সংস্কৃতি সমিতি ও মৃৎশিল্পী সমিতি, শ্যুটিংয়ের জন্য টিকিট চালু করেছিল। তাতেও কাজ হয়নি। বরং হিতে বিপরীত হয়েছে।
তাই এবার ভিড় এড়াতে একেবারেই ক্যামেরার প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন একাংশ। ৩০ বছর ধরে কাজ করা প্রদীপ রুদ্র পাল সাফ জানাচ্ছেন, 'আমাদের ওয়ার্কশপে কোনও ফোটো তোলা যায় না। কাজের শান্তি ভাঙলে প্রতিমা শেষ করা যায় না।'
তবে ব্যাতিক্রম আছে। সকলেই যে ক্যামেরার বিরোধী, তা নয়। প্রতিমাশিল্পী তথা চলচ্চিত্রকার ইন্দ্রজিৎ পাল মনে করেন, দায়িত্বশীল কভারেজ তাঁদের শিল্পকে পরিচিতি দেয়। তিনি বলেন, 'অনেকেই অনুমতি নিয়ে ছবি তোলেন, তাঁদের আমি সমর্থন করি। কিন্তু কেউ কেউ কাজের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটান, সেটা সমস্যা। আমি সবার কাছে অনুরোধ করব, এই জায়গাটার মর্যাদা যেন বজায় থাকে।'
অতএব, উৎসবের আগে প্রতিমাশিল্পীদের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের জায়গা কুমোরটুলির একাংশ এখন ফোটোগ্রাফার, ছবি তোলা সর্বোপরি 'বিরক্তির' বিরুদ্ধে। আর একাংশ মনে করছে, শৃঙ্খল মেনে সকলেই নিজের মতো কাজ করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, সেই শৃঙ্খল কি আদৌ সকলে মানেন?