শীত মানেই ফ্যাশনের স্বপ্ন। সিনেমা দেখে মাথায় ঢুকত বিদেশি উইন্টার লুকের ভাবনা, কিন্তু পকেট ফাঁকা। ভরসা ছিল মায়ের বোনা সোয়েটার।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 6 January 2026 14:54
শীত এলেই স্মৃতির দরজাগুলো একে একে খুলে যায় (Kolkata Weather)। প্রথম ডাকটা আসে ভোরের শিরশিরে হাওয়া আর সন্ধের মিহিন কুয়াশা থেকে (Weather Update)। তারপর শহুরে রাস্তায় ছাতিম ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধ, সকালে দেরি করে ওঠা রোদের আলস্য। যে রোদ বিছানা ছাড়াতে চায় না, শাল-সোয়েটারের অপেক্ষায় থাকে (West Bengal Weather)।
শহরের শীত আলাদা (Winter Kolkata)। এখানে কুয়াশার সঙ্গে মেশে ট্রাফিক জ্যামের গন্ধ (Coldest Day)। শিশিরভেজা মেঠোপথ নেই, নেই পিঠেপুলি আর ভাটিয়ালি। শহুরে শীত কাটে খবরের কাগজ আর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে। তবু শীত এলেই মন ফিরে যায় শৈশবে— যেমন কবি সুফিয়া কামাল লিখেছিলেন, পৌষ-পার্বণের পিঠা খাওয়ার আনন্দে মায়ের বকুনির মধ্যেও লুকিয়ে থাকত উৎসব। এইভাবেই শীতের কলকাতা স্মৃতি, প্রেম, রোদ, কুয়াশা আর হারিয়ে যাওয়া মানুষে ভরা। একটু এলোমেলো, তবু ভীষণ আপন।
মঙ্গলবার যখন শহরের তাপমাত্রা নেমেছে ১০.২ ডিগ্রিতে, তখন বহু বছর পর একটা চেনা ছবি ফিরে ফিরে আসছে। লোকজন সকাল সকাল আগুন পোহাচ্ছে, অবস হাতে প্রাণ ফেরাতে ঘষাঘষি করছে। আর মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই শীত কাঁপুনির চেয়েও বেশি উপভোগ করার।
শীতের কলকাতা মানেই ব্যক্তিগত স্মৃতির শহর। এই শহরের শীত ভাবতেই মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় সার্কাস দেখা— ‘দ্য গ্রেট অজন্তা সার্কাস’। সেই সময় পশু-অধিকার আন্দোলনের আগের যুগ। রিংমাস্টারের চাবুক, বাঘের লাফ, জলহস্তীর পাউরুটি খাওয়া, ক্লাউনদের কাণ্ডকারখানা, সবই ছিল শৈশবের বিস্ময়।
ট্রাপিজের খেলায় ভয় কম, বিদেশিনি সার্কাস-শিল্পীদের দিকে কৌতূহল বেশি। তখনকার শিশুমনে সব ফরসা সার্কাসকন্যাই যেন ‘সোভিয়েত নারী’। পরে সত্যিকারের রাশিয়ান সার্কাস এলে নিষিদ্ধ কল্পনার বয়সও পেরিয়ে যায়। শহর বড় হতে হতে সার্কাসও যেন হারিয়ে যায়। কারণ প্রতিদিনের জীবনেই তখন এত নাটক, এত পশুতা, যে আসল সার্কাস ফিকে হয়ে পড়ে।
শীত মানেই ফ্যাশনের স্বপ্ন। সিনেমা দেখে মাথায় ঢুকত বিদেশি উইন্টার লুকের ভাবনা, কিন্তু পকেট ফাঁকা। ভরসা ছিল মায়ের বোনা সোয়েটার। হলুদ-কালো ফুল স্লিভ পোলো নেক, কিংবা জিন্সের সঙ্গে হাতে বোনা মাফলারে জড়ানো শীত।
শহুরে শীতের কথা বললেই এলভিস প্রেসলির গানের মতো ঢুকে পড়ে ফ্লুরিস। পার্ক স্ট্রিটের দেওয়ালঘেঁষা চেয়ারে বসে ইংলিশ ব্রেকফাস্ট, গ্রিল্ড সসেজ, বেকন, হ্যাশ ব্রাউন, পোচড এগ, মাশরুম আর দু’স্লাইস পাউরুটি। সঙ্গে চা বা কফি। সেই বিল মেটাতে আগে কয়েক সপ্তাহ কম খাওয়া আর প্রেমের প্রস্তুতি।
শীতের প্রেমপার্বণ আবার দুপুরে গড়ের মাঠের রোদ আলাদা রকম। আদুরে বিড়ালের মতো কোলে বসে থাকে সেই রোদ। একটু ঘুরে বসে শরীরের অন্য পাশে রোদ লাগানো, দুটো বাদাম মুখে পুরে পাশের অচেনা মানুষটির সঙ্গে হতেই পারে রাজ্য রাজনীতি, সুনীল-শক্তির পদ্য আলোচনা। কিছুটা শব্দে নয়, বাকিটা ইশারায়।
বেলা গড়ালে গড়ের মাঠ থেকে হাঁটতে হাঁটতে পুরনো বইয়ের দোকান। সেখানেই গৌরকিশোর ঘোষ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের বই নেড়েচেড়ে দেখা। ট্যাকে টান থাকলে ফুটপাথ ঘেঁটে পুরনো বইয়ের গন্ধ। কপালে থাকলে কদাচিৎ শায়েরির গাল থেকে ভেসে আসা চার্মিস ক্রিমের সুবাস।
হেমন্তের প্রাচুর্য পেরিয়ে পরিযায়ী শীত আসে ক্ষণস্থায়ী হয়ে। পাতা ঝরে, প্রকৃতি বিবর্ণ হয়। আবার পৌষের সকালে সরষে হলুদ রঙে মাঠ ভরে ওঠে, কুয়াশা ডানা মেলে নামে। আর কথায় কথায় সুপর্ণাকে ডেকে প্রশ্ন শুরু হয়ে যায়, "শীতকাল কবে আসবে?"