রবার চাষে (Rubber Farming) ক্ষতির মুখে পড়ে কেরলের (Kerala) বিজু নারায়ণন (Biju Narayanan) বেছে নেন রামবুটান (Rambutan) ও বিদেশি ফলের চাষ। প্রতি একরে ১৫ লাখ আয় করে নজির গড়লেন।

বিজু নারায়ণন।
শেষ আপডেট: 27 August 2025 16:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রবার চাষের জন্যই পরিচিত ছিল কেরলের কান্নুর জেলার উলিক্কাল গ্রাম। কিন্তু গত কয়েক বছরে সস্তায় রবার আমদানির কারণে চাষের মুনাফা ক্রমে নামতে থাকে। আর এই পরিস্থিতিতেই এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেন সেখানকারই কৃষক বিজু নারায়ণন। এককালের রবার চাষি তাঁর সাত একর জমি জুড়ে ফলাতে শুরু করেন রামবুটান, মাঙ্গোস্টিন, গোলমরিচ, কাজুবাদাম, নারকেল, সুপারি এবং আরও নানারকম ফসল। তাঁর এই কৃষি-বিপ্লব এখন বছরে প্রতি একরে ৯ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় এনে দিচ্ছে!
দেশের সবচেয়ে বড় রবার উৎপাদক রাজ্য হল কেরল। কিন্তু বছর ১২ আগে থেকে এই খাতে ধস নেমেছে। উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছিল, অথচ দাম কমছিল। কারণ ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া থেকে সস্তায় রবার আমদানি হতে শুরু করে। সব মিলিয়ে, কেরলের কৃষকেরা দিশাহারা হয়ে পড়েন।
বিজু নারায়ণনের পরিবারের জমির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল রবার চাষের জন্য। উৎপাদন খরচ যেখানে দাঁড়াচ্ছিল প্রতি কেজিতে ১৬০ টাকা, সেখানে বাজারদর নেমে এসেছিল মাত্র ১০০-১১০ টাকায়। ফলে চাষ থেকে আয় তো হচ্ছিলই না, বরং ক্ষতি হচ্ছিল।
ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা বিজু প্রথমে কর্পোরেট দুনিয়ায় ১০ বছর কাজ করেছিলেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব তাঁর ওপর এসে পড়ে। পড়াশোনা সামলানোর পাশাপাশি চাষও চালাতে হয় তাঁকে। কর্পোরেট চাকরির একঘেয়েমিই তাঁকে টেনে আনে চাষে।
এই অবস্থায় নতুন দিশা খুঁজে বের করেন বিজু। তিনি সাহস করে কেটে ফেলেন সব রবার গাছ, লাগাতে শুরু করেন বিদেশি ও দেশি নানা প্রজাতির গাছ। শুরুতে তাঁকে পাগল বলে ঠাট্টা করেছিল অনেকে। এমনকি পরিবারের লোকজনেরও মাথায় হাত পড়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, সেই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
বিজু মূলত বহুমাত্রিক চাষ পদ্ধতি বেছে নেন। তিনি একসঙ্গে একাধিক উচ্চতার গাছ লাগান, যাতে সূর্যালোক সঠিকভাবে ভাগ হয়ে পৌঁছয় প্রতিটি গাছে। জমির বাইরের প্রান্তে ৪৫ ফুট উঁচু নারকেল গাছ, তারপর থাকে ২৫ ফুট উঁচু মাঙ্গোস্টিন, তারপরে ১৫ ফুটের গোলমরিচ, ১০ ফুটের কলা, আর মাটির কাছাকাছি থাকে আদা ও কচু। এর ফলে একসঙ্গে চার-পাঁচ ধরনের ফসল ওঠে এবং জমির সর্বাধিক ব্যবহার হয়।
রামবুটান চাষে তাঁর সাফল্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ২০১০ সালে প্রথম রামবুটান লাগান তিনি। রামবুটান হল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় ফল। চিন, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডে বেশি উৎপন্ন হয়। এর আকৃতি অনেকটা মাঝারি ধরনের৷ এই ফলটি যখন কাঁচা থাকে তখন বাইরের রং সবুজ হয় এবং পাকলে লাল, গোলাপি কখনো কখনো হলুদ রঙেরও হয়ে থাকে। ফলটি লিচুর মতো রসালো মিষ্টি। গায়ে নরম লাল কাঁটা থাকে। খোসা ছাড়ালেই সাদা শাঁস। কাঁচাই খাওয়া যেতে পারে। শরবত এবং পুডিংয়ের মতো ডেজার্টেও ব্যবহৃত হয়। এতে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আছে, যা শরীর সুস্থ রাখতে সহায়ক। তাছাড়া এতে প্রচুর আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফাইবার ও খনিজ রয়েছে। এতে আছে গ্যালিক অ্যাসিড, যা শরীরের ফ্রি র্যাডিকেলস বা রোগ সৃষ্টিকারী র্যাডিকেলস নিয়ন্ত্রণে রাখে।

বিজু চাষের আগে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছিলেন, পাঁচ বছরে প্রতিটি গাছে ৪০ কেজি, আর সাত বছরে ৬০ কেজি ফল মিলবে। বাস্তবে তাঁর উৎপাদন প্রতি গাছে দাঁড়ায় ৮০ কেজিতে! এক একরে তিনি তুলেছেন ৬ হাজার কেজির বেশি রামবুটান। প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় বিক্রি করে এক একর থেকে আয় করেন প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
বিজুর আরেকটি সাফল্যের কৌশল হল সরাসরি বিক্রি। মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে তিনি ফেসবুক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এতে প্রতি কেজিতে যেখানে তিনি ১৯০–২০০ টাকা পেতেন, সেখানে এখন পাচ্ছেন ২৫০ টাকা।
শুধু আয় নয়, দীর্ঘমেয়াদী কৃষিও তাঁর মন্ত্র। ৮০ শতাংশ জৈব উপাদান, যেমন গোবর, গো-মূত্র, ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করেন তিনি। সঙ্গে থাকে ২০ শতাংশ অজৈব উপাদান, যেমন পটাশ। সারের ব্যবহার করেন মূলত ফোলিয়ার স্প্রে পদ্ধতিতে, অর্থাৎ পানি মিশিয়ে সরাসরি গাছের পাতায় স্প্রে করা হয়, ফলে গাছ দ্রুত পুষ্টি পায়।
আজ বিজু কৃষকদের কাছে এক অনুপ্রেরণা। কৃষি থেকে তিনি শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য পাননি, পেয়েছেন গর্ব আর আত্মতৃপ্তি। তাঁর কথায়, “কৃষকদের নতুন পদ্ধতি শিখতেই হবে। আমি এখন রাজা হয়ে গেছি, চাকরি ছাড়ার কোনও আক্ষেপ নেই।”