বর্ষায় ঘরে সবেদা চাষের (Chikoo Farming) পূর্ণাঙ্গ গাইড। রোপণ, যত্ন, মালচিং থেকে ফল সংগ্রহ—সবকিছু জানুন সহজ ভাষায়।

বাড়িতেই সবেদা চাষ।
শেষ আপডেট: 27 August 2025 16:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নিজের একফালি ছোট্ট জমিতে বাগান করে, তাতে গাছ লাগানো আর সেই গাছ থেকে ফল পাওয়া— এ এক অন্যরকম আনন্দ। ছোট্ট একটা বীজ থেকে চারা গজানো, ধীরে ধীরে বড় হওয়া, আর হঠাৎ একদিন মিষ্টি ফলের পুরস্কার, এই অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই অমূল্য। এই অমূল্য অভিজ্ঞতা কিন্তু বাড়িতে বসে পাওয়া খুব কঠিন নয়। বিশেষ করে এই বর্ষায়। সুমিষ্ট সবেদা ফলতেই পারে সহজে।
দানাদার, মিষ্টি শাঁসে ভরপুর সবেদা খেতে অনেকেই ভালবাসেন। গ্রামাঞ্চলে গাছ দেখা গেলেও, শহরের বাজারে বেশ চড়া দামে বিক্রি হয় এই ফল। এই বর্ষায় বাজারের ভরসায় না থেকে, ঘরেই লাগিয়ে ফেলা যায় সবেদা গাছ। কারণ বর্ষায় এই গাছের আদর্শ সময়। ভেজা মাটি ও আবহাওয়া উপযুক্ত থাকে। সকলেই সহজেই বর্ষার সময়ে ঘরে শুরু করতে পারেন সবেদা চাষ।
চলুন দেখে নেওয়া যাক, কীভাবে ধাপে ধাপে সবেদা লাগাতে হবে, যত্ন নিতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের হাতে ফল সংগ্রহ করতে হবে।
প্রথমেই ঠিক করতে হবে, কোন জাতের সবেদা আপনার এলাকায় ভাল ফল দেবে। জনপ্রিয় জাতগুলির মধ্যে রয়েছে— ‘ক্রিকেট বল’, ‘কালিপট্টি’ ও ‘কোলাডা’।
বীজ থেকে গাছ করলে, ফল ধরতে পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় লাগে। তবে বীজ থেকে গাছ করলে শেকড় মজবুত হয়। আবার দ্রুত ফল চাইলে, নির্ভরযোগ্য নার্সারি থেকে কলম করা চারাগাছ কিনতে পারেন। এতে ২–৩ বছরের মধ্যেই ফল পাওয়া যায়।

চারা বাছাইয়ের সময় খেয়াল রাখবেন, পাতাগুলি যেন সবুজ, দাগহীন ও সতেজ থাকে। হলদে বা ঝিমিয়ে পড়া চারা নেবেন না। আর বীজ রোপণের আগে তা টাটকা হতে হবে। পুরনো বীজ দ্রুত অঙ্কুরোদগম করতে পারে না। সারা রাত জলে ভিজিয়ে রাখলে বীজের খোসা নরম হয়ে দ্রুত গজায়।
সবেদা গাছ গরম ও রোদপ্রিয়। প্রতিদিন অন্তত ৬ ঘণ্টা সরাসরি রোদ পাওয়া জায়গা বেছে নিন।
মাটিতে যাতে জল না জমে, সেদিকেও নজর দিন। জল জমে থাকলে শেকড় পচে যায়। তাই উঁচু জায়গায় বা রেইজড বেড তৈরি করে গাছ লাগানো ভাল। মাটিতে যদি জল জমে, তবে সেখানে মোটা বালি বা ছোট পাথর মিশিয়ে দিন।
গাছ চারিদিকে ছড়িয়ে বড় হয়। ১০ থেকে ১২ মিটার পর্যন্ত উঁচুও হতে পারে। তাই গাছ ও দেওয়াল বা অন্য গাছের মধ্যে অন্তত ৪–৫ মিটার জায়গা রাখুন।

সামান্য অ্যাসিডিক থেকে নিরপেক্ষ মাটিতে সবচেয়ে ভাল হয় সবেদা। নিশ্চিত না হলে pH টেস্ট কিট ব্যবহার করতে পারেন।
৪৫ সেমি গভীর গর্ত করুন। চওড়ায় যেন চারা বা বীজের দ্বিগুণ হয়। আশপাশের মাটি নরম করে দিন যাতে শেকড় সহজে ছড়িয়ে যায়। গর্তে পচা গোবর বা কম্পোস্ট মিশিয়ে দিন। এতে মাটির উর্বরতা ও জলধারণ ক্ষমতা বাড়বে।
কাদামাটি হলে বালি ও জৈবসার মিশিয়ে হালকা করুন। আর বেলে মাটিতে কম্পোস্ট মেশান যাতে আর্দ্রতা থাকে।
চারা লাগানোর সময় যদি শিকড় আঁকড়ে থাকে তবে হালকা করে ছাড়িয়ে নিন। গর্তে বসিয়ে শিকড় ও কান্ডের সংযোগস্থল যেন মাটির সমতলে থাকে। নরম করে মাটি চাপা দিন।
বীজ লাগালে ২–৩ সেমি গভীরে পুঁতে হালকা জল দিন। মাটি ভিজে থাকবে কিন্তু জল জমে থাকবে না। সাধারণত ৩–৪ সপ্তাহে বীজ গজায়। ধৈর্য ধরতে হবে।

লাগানোর পর শুকনো পাতা বা খড় দিয়ে মাটি ঢেকে করে দিন। এতে আর্দ্রতা থাকবে, মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
বর্ষায় অতিরিক্ত জলের কারণে শেকড় পচতে পারে। তাই জমা জল এড়ানো জরুরি।
ছোট চারা হলে বৃষ্টির ঘাটতি থাকলে সপ্তাহে এক-দুবার গভীরভাবে জল দিন। বীজ ও অঙ্কুরিত চারা হলে প্রতি ২–৩ দিনে হালকা জল দিতে হবে।
সকালবেলা জল দেওয়া সবচেয়ে ভাল। পাতায় যাতে জল না পড়ে, খেয়াল রাখুন। এতে ছত্রাক সংক্রমণ হয় না।
বর্ষায় মালচিং খুব দরকারি। গাছের গোড়ায় ৫–৭ সেমি পুরু মালচ দিন, তবে কান্ড থেকে কয়েক সেমি দূরে রাখুন। এতে মাটি আর্দ্র থাকবে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে ও আগাছা হবে না।

ভারী বৃষ্টির পর মালচ আলগা করে দিন যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে।
সবেদা গাছ শক্ত হলেও মিলিবাগ, এফিড, ফলমাছির মতো পোকা আক্রমণ করতে পারে। পাতায় আঠালো ভাব, কুঁকড়ে যাওয়া বা দাগ দেখলে ব্যবস্থা নিন।
নিমতেলের স্প্রে প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে কাজ করে। ভোর বা সন্ধ্যায় ব্যবহার করা ভালো। ছত্রাকের সংক্রমণ হলে আক্রান্ত ডাল কেটে ফেলুন। গাছের চারপাশে গাঁদাফুল লাগালে প্রাকৃতিকভাবেই অনেক পোকা দূরে থাকে।

প্রতি তিন মাসে একবার এনপিকে (১০:১০:১০) সার দিন। নাইট্রোজেন পাতার বৃদ্ধি, ফসফরাস শেকড় ও ফুল, আর পটাশ ফল ধরতে সাহায্য করে।
অর্গানিক চাষ করলে গোবরসার বা ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করুন। সার গাছের ড্রিপ লাইন ধরে ছড়িয়ে দিন এবং পরে জল দিয়ে মিশিয়ে দিন।
গাছ দু’বছরের বেশি হলে শুকনো বা অসুস্থ ডালপালা কেটে ফেলুন। এতে আলো-বাতাস ঢুকবে, ফুল ও ফল বেশি হবে।
বর্ষায় ভারী ছাঁটাই করবেন না, এতে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
সবেদা গাছে ফল পাকতে সময় লাগে। গাছে ফল একেবারে পাকে না। খয়েরি রঙ ও হালকা নরম হলে বুঝবেন তুলতে হবে।
কাঁচি দিয়ে সাবধানে ফল কাটুন। কয়েকদিন ঘরের তাপমাত্রায় রাখলে ফল পুরোপুরি মিষ্টি ও সুগন্ধি হয়ে যাবে।

নিজের হাতে চাষ করা সবেদার স্বাদই হবে অন্য রকম। ধৈর্য, সঠিক যত্ন আর ভালবাসা থাকলে নিজের বাগান থেকেই মিষ্টি ফল পাড়বেন আর তারিয়ে তারিয়ে খাবেন।