জীবাস্কোপ (JivaScope) শুধু একটি মেডিক্যাল ডিভাইস নয় - এটি এক প্রতিশ্রুতি। যে জায়গায় অসহায়তা ছিল, সেখানে ফিরিয়ে দিয়েছে আশা।

তূণীর, সঙ্গে তাঁর উদ্ভাবনা ‘জীবাস্কোপ’
শেষ আপডেট: 8 November 2025 21:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারের এক প্রত্যন্ত গ্রামের ধুলোমাখা ক্লিনিক। শ্বাসকষ্টে কাতর এক ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছেন বাবা। স্থানীয় চিকিৎসক সন্দেহ করছেন নিউমোনিয়া, কিন্তু নিশ্চিত যে হবেন, তার জন্য পরীক্ষা করতে হবে। সঠিক পরিষেবা না থাকায় সেই উপায়ও নেই। কাছের ডায়াগনস্টিক সেন্টারও অনেক দূরে, সেখানে যাওয়া মানেই বড় খরচার ব্যাপার।
এমন দৃশ্য গ্রামীণ ভারতে অচেনা নয়। ঠিক এরকম এক মুহূর্তেই ২৫ বছরের তূণীর সাহুর (Tunir Sahoo) জীবনে আনল এক অন্যরকম উপলব্ধি, এই অসহায়তাই একদিন জন্ম দিল তাঁর আবিষ্কার ‘জীবাস্কোপ’ (JivaScope)–এর।
তূণীর, আইআইএম কাশীপুর (IIM Kashipur) থেকে এমবিএ করা এক তরুণ উদ্যোক্তা, তৈরি করেছেন একটি ছোট্ট যন্ত্র। হাতের মুঠোয় ধরা যায় তাকে, এআই-চালিত (AI driven)। ডাক্তার, বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই কয়েক মিনিটে হার্ট ও ফুসফুসের রোগ শনাক্ত করতে পারে, এমন তার ক্ষমতা। মাত্র ৩ হাজার টাকার এই ডিভাইসই তাঁকে এনে দিয়েছে জেমস ডাইসন অ্যাওয়ার্ড ইন্ডিয়া ২০২৫–এর সম্মান (Dyson Award 2025)।
এই আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মঞ্চ প্রতিবছর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ডিজাইনের মাধ্যমে বাস্তব সমস্যার নতুন সমাধান খোঁজা তরুণ উদ্ভাবকদের সম্মান জানায়। প্রায় ২৮টি দেশ থেকে প্রতিযোগী অংশ নেন, এবং বিশ্বজয়ী উদ্ভাবক পান প্রায় ৩০,০০০ পাউন্ড (প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা), তাঁর প্রকল্প উন্নয়নের জন্য।
কলকাতা থেকে বিশ্বমঞ্চের সফর
তূণীরের শিকড় আদতে কলকাতায়, বড় হয়েছেন খড়্গপুরে। সেক্রেড হার্ট হাই স্কুল, তারপর ফার্মেসিতে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন দুর্গাপুরের ডঃ বি সি রায় কলেজ অব ফার্মেসি থেকে। ২০২৪ সালে আইআইএম কাশীপুর থেকে এমবিএ ডিগ্রি।

'বাবা ব্যাঙ্কের অফিসার, মা ইতিহাসের শিক্ষিকা। ওঁদের থেকেই শৃঙ্খলা, কৌতূহল আর অধ্যবসায়ের পাঠ পেয়েছি,' বলছেন তূণীর। তবে ‘জীবাস্কোপ’-এর জন্ম কোনও গবেষণাগার থেকে নয় - জন্ম হয়েছে মাঠে, মানুষের কষ্ট দেখে।
যেখান থেকে শুরু
তূণীরের জীবনে মোড় ঘোরানো সেই দৃশ্য - বিহারের এক ক্লিনিকে শ্বাস নিতে না পারা এক শিশুকে কোলে নিয়ে উদ্বিগ্ন এক বাবা।
'ডাক্তার কিছুই করতে পারছিলেন না। ওষুধ ছিল, কিন্তু নিশ্চিত করার উপায় ছিল না যে আসলেই নিউমোনিয়া কি না,' স্মৃতিচারণ করেন তূণীর।
সেই নীরবতা, সেই অসহায়তা তাঁকে নাড়া দেয় গভীরভাবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি গ্রামীণ চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন, ৬০ জনেরও বেশি ডাক্তার জানান, এই সমস্যা কোনও একটি বিশেষ জায়গার নয়, এটি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা। তূণীর বুঝলেন, সমাধান হতে হবে সহজ, সুলভ ও নির্ভরযোগ্য। তখনই জন্ম নেয় ‘জীবাস্কোপ’।
জীবাস্কোপ: ছোট যন্ত্র, বড় বিপ্লব
এই ডিভাইস মাত্র কয়েক মিনিটে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের অবস্থা স্ক্যান করতে পারে। এতে রয়েছে ইনফ্রারেড-গাইডেড সেন্সর ও অফলাইন এআই অ্যালগরিদম। সবচেয়ে বড় সুবিধা - বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেটের প্রয়োজন নেই।
তূণীরের কথায়, “গ্রামে ইন্টারনেট সংযোগই তো অনিশ্চিত। তাই এমন ডিভাইস তৈরি করেছি যা একদম অফলাইনেই কাজ করতে পারবে। গ্রামের স্বাস্থ্যকর্মীও সহজে ব্যবহার করতে পারবেন।”
২০ বারের ব্যর্থতা দেখেছে জীবাস্কোপের সাফল্য
এই ডিভাইসের পেছনে ছিল প্রচুর পরিশ্রম ও ব্যর্থতা। “প্রথম দিকে হয় খুব নিখুঁত রেজাল্ট দিচ্ছিল কিন্তু ব্যবহার জটিল ছিল। পরে সেটা সহজ হয়ে আসে, আস্তে আস্তে নির্ভুল হচ্ছিল,” বলেন তূণীর।
শেষ পর্যন্ত ইনফ্রারেড গাইডিং যুক্ত করার পর সমস্যার সমাধান হয়, যন্ত্র নিজে থেকেই ঠিক জায়গায় বসে স্ক্যান করে নেয়। এতে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীরাও নির্ভরতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন।
“জেমস ডাইসন অ্যাওয়ার্ডের প্রস্তুতিই আমাদের প্রোডাক্টকে আরও নিখুঁত করেছে,” জানালেন তূণীর।
‘জীবাস্কোপ’-এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল এর অত্যন্ত কম দাম। মাত্র ৩ হাজারি এই যন্ত্র তৈরি হয়েছে সহজলভ্য যন্ত্রাংশ দিয়ে, যেখানে কাস্টম হার্ডওয়্যার নয়, ব্যবহার করা হয়েছে অফ-দ্য-শেলফ কম্পোনেন্ট ও হালকা ওজনের এআই মডেল।
“আমরা চেয়েছিলাম এমন কিছু বানাতে যা গ্রামের চিকিৎসকরাও কিনতে পারেন। দাম বেশি হলে এর বিশেষত্বই থাকবে না,” বলেন তূণীর। এখন তাঁর টিম কাজ করছে দাম আরও কমিয়ে ২ হাজারে নামানোর লক্ষ্যে।

মাঠে নেমে আসলে কেমন কাজ করছে তূণীরের জীবাস্কোপ? ট্রায়ালে সবচেয়ে চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা ছিল আশাকর্মীদের প্রতিক্রিয়া। “একজন আশাকর্মী বলেছিলেন, ‘এখন অন্তত আমি আমার রোগীদের কিছু বলতে পারি, শুধু শহরে পাঠিয়ে দিতে হয় না’, এই কথাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার,” তূণীর বলেন। তাঁর মতে, প্রকৃত উদ্ভাবন মানে শুধু প্রযুক্তি নয় - মানুষকে আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদা দেওয়া।
আগামী দুই বছরে জীবাস্কোপ টিমের লক্ষ্য, eSanjeevani–র সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, দশটিরও বেশি রাজ্যে স্কেল-আপ, এবং হাজারো ক্লিনিক্যাল স্যাম্পলে এআই প্রশিক্ষণ।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ? “লাস্ট-মাইল অ্যাডপশন - গ্রামীণ ডাক্তার, আশাকর্মী, স্বাস্থ্যব্যবস্থা - সব স্তরে প্রশিক্ষণ ও বিশ্বাস তৈরি করা,” বলেন তিনি।
তূণীরের মতে, ডাইসন পুরস্কার তাঁদের দিয়েছে সকলের সামনে এসে দাঁড়ানোর সুযোগ, এসেছে বিশ্বজোড়া সহযোগিতা। তাঁর কথায়, “এখন আমাদের কাজ আরও মানুষের কাছে পৌঁছনো, যাতে একদিন ভারতের প্রতিটি গ্রাম জীবাস্কোপ পাবে, কেউ চিকিৎসা থেকে যেন বঞ্চিত না হন।”
জীবাস্কোপ শুধু একটি মেডিক্যাল ডিভাইস নয় - এটি এক জীবন্ত প্রতিশ্রুতি। যে জায়গায় অসহায়তা ছিল, সেখানে ফিরিয়ে দিয়েছে উত্তর, আশা আর মর্যাদা।
এক পিতা ও তাঁর শ্বাসকষ্টে কাতর সন্তানের গল্প থেকেই শুরু হয়েছিল তূণীর সাহুর যাত্রা - আজ তা হয়ে উঠেছে গ্রামের চিকিৎসাব্যবস্থার সম্ভাবনার নতুন প্রতীক।