অনেক রোগীর বাইপাস সার্জারি করা যায় না, বা ফুসফুসের অবস্থা বেশ খারাপ থাকে, অপারেশনে রিস্ক থাকে। সে ক্ষেত্রে এই ডিভাইসগুলি জীবনদায়ী হয়ে ওঠে।

ডক্টর দিলীপ কুমার।
শেষ আপডেট: 31 July 2025 19:40
প্রযুক্তি বদলে দেয় সমাজের চালচিত্র। প্রতিটি যুগের অগ্রগতিতে তার ছাপ পড়ে মানবসভ্যতার অবকাঠামোয়— বিশেষ করে চিকিৎসাক্ষেত্রে। স্বাস্থ্যসেবার পরিধিতে যখনই নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটে, আধুনিক অস্ত্রও যোগ হয় সেখানে। এক্ষেত্রে অস্ত্র অর্থে, যন্ত্র। ডিভাইস। যা দিয়ে হৃদরোগীদের প্রাণ বাঁচানো আরও একটু সহজ হয়ে উঠেছে বর্তমানে।
কিছু ডিভাইসের ব্যাপারে অনেকেই শুনেছেন। কিছু আবার একেবারেই নতুন। কিছু ডিভাইসের খবর আবার জেনে রাখা খুবই জরুরি। চিকিৎসার গতানুগতিক পদ্ধতিকে সঙ্গে নিয়েই এসব যন্ত্র কি নতুন দিশা দেখাতে পারছে কার্ডিয়াক কেয়ার বা হৃদ্রোগ নিরাময়ে? রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে চিকিৎসা, নজরদারি কিংবা প্রতিরোধ— সব ক্ষেত্রেই কি তৈরি হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আলোচনায় মেডিকা সুপারস্পেশ্যালিটি হাসপাতালের ক্যাথ ল্যাবের ডিরেক্টর এবং পূর্ব ভারতের অন্যতম ডিভাইস ইমপ্লান্ট বিশেষজ্ঞ ডক্টর দিলীপ কুমার।
পেসমেকার এখন অনেকটাই অ্যাডভান্সড হয়ে গিয়েছে। প্রথম পেসমেকার ব্যবহার করা হয়েছিল ১৯৫৭-৫৮ সালে। সেই পেসমেকারটি প্রায় ৬ ঘন্টা চলেছিল। এর পরের পেসমেকারটি চলে প্রায় এক সপ্তাহ। এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিভাইসটির মান উন্নত ও আধুনিক হতে থাকে। বর্তমান সময়ে এই পেসমেকার এআই পরিচালিত হয়ে উঠেছে।
এই এআই-চালিত পেসমেকারের কার্যকলাপগুলো আপনি নিজেই পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। আপনার ফোনে নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করেই জানতে পারবেন। ঠিক যেমন আমরা স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করি। অর্থাৎ আপনারা আগের থেকেই জানতে পারছেন আপনার হার্টে লাগানো পেসমেকার ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা, বা এতে কোনও সমস্যা হয়েছে কিনা!
পেসমেকারের বিকল্প ডিভাইস রয়েছে নানা রকম। তাতেও রয়েছে একাধিক ভাগ। যেখানে প্রথমেই আসে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস। যাকে বলা হয় কার্ডিয়াক ইমপ্লান্টিবল ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস (Cardiac Implantable Electronic Device) বা সিআইইডি (CIED)। এছাড়াও রয়েছে আইএলআর (ILR) বা ইমপ্লান্টিবল লুপ রেকর্ডার (Implantable Loop Recorder)।
আইএলআর হল, বুকের চামড়ার নীচে ঢোকানো একটি ছোট যন্ত্র, যা দীর্ঘ সময় ধরে হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ করে। এটি অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন শনাক্ত করতে এবং রেকর্ড করতে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা বা বুক ধড়ফড় করার মতো লক্ষণ আগে থেকে বোঝা যেতে পারে। হার্টের অন্যান্য পরীক্ষাগুলি কিন্তু এইসব রোগ নির্ণয় নাও করতে পারে। কিন্তু ডিভাইস সঠিক খবর সবার আগে পৌঁছে দেবেই।
এগুলো ছাড়াও এমন আরও কিছু যন্ত্র আছে, যেগুলো হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাকে কমাতেও যথেষ্ট কার্যকর। সেগুলোকে প্রেসার সেন্সার (Pressure Sensor) বলা হয়ে থাকে। এছাড়াও রয়েছে মেকানিক্য়াল ডিভাইস যেমন, হার্ট লিক, হার্ট ভাল্ভ ইত্যাদি। রয়েছে ইম্পেলা ও ইকমোর মতো সার্কুলেটরি ডিভাইস।
অনেক রোগীর বাইপাস সার্জারি করা যায় না, বা ফুসফুসের অবস্থা বেশ খারাপ থাকে, অপারেশনে রিস্ক থাকে। সে ক্ষেত্রে এই ডিভাইসগুলি জীবনদায়ী হয়ে ওঠে।
মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ-- এই ডিভাইসগুলো সবার জন্য। কিন্তু হার্টের জন্য ব্যবহৃত এই অত্যাধুনিক ও সফিস্টিকেটেড ডিভাইসগুলো রোগের ওপর নির্ভর করে। আর একজন ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞই বলে দিতে পারেন যে, কোন ডিভাইস কোন রোগীর উপযুক্ত। যেমন, যে পেশেন্টের করোনারি আর্টারিতে সিঙ্গেল ব্লকেজ আছে, তাঁর ইম্পেলার দরকার নেই। তাই কোন ডিভাইস কোন রোগীর জন্য ঠিক হবে, সেটা একমাত্র ডাক্তারই ঠিক করে দিতে পারেন।
এই ধরনের কার্ডিয়াক ডিভাইসগুলো প্রায় সব পরিস্থিতির সঙ্গেই খাপ খেতে সক্ষম। তবে তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন, কারও এমআরআই (MRI) করার সময়, রোগীর শরীরে যদি কার্ডিয়াক ডিভাইস বসানো থাকে, তখন সেই ডিভাইসে কিছু পরিবর্তন করা হয়, যাতে এমআরআই করতে কোনও অসুবিধা না হয়।
এই কার্ডিয়াক ডিভাইস নিয়ে পেশেন্ট নির্ভয়ে বিমানযাত্রা করতে পারেন। এমনকি মাইক্রো পেসমেকার (Micro Pacemaker) নিয়ে মানুষ মহাকাশ (space) যাত্রাও করতে পারেন।
শুধু তাই নয়, এই যন্ত্রগুলোর ওজন ও আকার অত্যন্ত ছোট হয়। এখন সবচেয়ে ছোট যে লিডলেস পেসমেকারটি বসানো হচ্ছে, তার ওজন মাত্র ১.৭৫ গ্রাম!
যে কোনও ভাল প্রাপ্তির পিছনেই একটা মূল্য দিতে হয়। সুতরাং, নতুন যে ডিভাইসগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই বহুব্যয়সাপেক্ষ। তবে এটাও বলতে হবে যে, বেশিরভাগ লাইফ সেভিং থেরাপি, বা আধুনিক পেসমেকার, এগুলো এমনিতেই ব্যয়সাধ্য। ফলে যত আধুনিক পরিষেবা আসছে, দামও বাড়ছে।
তবে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি প্রকল্পগুলি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনও আপস করার জায়গা নেই।
আগেকার দিনের পেসমেকারে লাইফ সেভিং প্রপার্টি থাকলেও বেশ কিছু সাইড এফেক্টও ছিল। ১০-১৫ শতাংশ রোগী কার্ডিয়াক ডিসফাংশন (Cardiac dysfunction)-এর শিকার হতেন। পেসমেকার বাইরে বেরিয়ে থাকা, লিক-জনিত সমস্যা, এধরনের একাধিক আশঙ্কাজনক অসুবিধা হত।
তবে এখন এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এটা হলফ করে বলা যায় যে, আগে যে ধরনের বাধা-বিপত্তি, জীবনের ঝুঁকি সঙ্গে নিয়ে পেশেন্টদের চলাফেরা করতে হত, এখন সেই দিনের ইতি ঘটেছে। আগামী দিনগুলোতে রোগীরা নিশ্চিন্ত মনে জীবনযাপন করতে পারবেন।