সমতলের মানুষের কাছে প্রতিটি খাবার যেমন আনন্দের বিষয়, লাদাখের সেনাদের জন্য প্রতিটি আহার বেঁচে থাকার উপকরণ।

এআই দিয়ে বানানো ছবি
শেষ আপডেট: 17 September 2025 18:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় সেনারা (Indian Army) লাদাখের দুর্গম সীমান্তে (Ladakh extreme environment) শুধু শত্রুর মুখোমুখি হন না, প্রতিদিন তাঁদের লড়াই করতে হয় প্রকৃতির চরম রূপের সঙ্গেও। ১৫ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায় কম অক্সিজেন, কনকনে ঠান্ডা আর কঠিন প্রাকৃতিক পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য যে দৃঢ় মানসিক শক্তি দরকার, তারই পাশাপাশি সমানভাবে প্রয়োজন টিকে থাকার জন্য, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সঠিক খাবার ও পুষ্টি (extreme environment survival guide and nutrition)।
১০ হাজার ফুটের ওপরে জীবনের কঠোর বাস্তব
এই উচ্চতায় মানুষের শরীর অতিরিক্ত পরিশ্রম শুরু করে। অক্সিজেনের ঘাটতির ফলে হাঁটাচলার মতো সাধারণ কাজও ম্যারাথন দৌড়ের মতো মনে হয়। সেনারা নিয়মিত দায়িত্ব পালনের আগে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কখনও মাসের পর মাস অ্যাক্লিমাটাইজেশনের (পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার) প্রশিক্ষণ নেন। তবু শরীরের উপর চাপ বেড়ে যায়, ক্যালোরি খরচ আকাশছোঁয়া হয়, পেশির ক্ষয় তো বটেই ওজনও দ্রুত কমতে থাকে। অনেক সময় এক-দুই মাসের মধ্যেই এক একজনের ১০-১৫ কেজি ওজন কমে যেতে দেখা যায়।
ঘরোয়া স্বাদের সান্ত্বনা
লাদাখের চরম প্রাকৃতিক দৃশ্যে খাবার শুধু শক্তি জোগানোর উপায় নয়, মানসিক ভরসারও জায়গা। গরম পরোটা-আচার বা ধোঁয়া ওঠা ডালভাতের প্লেট - ক্লান্তিকর টহলের পর এগুলো মনোবল বাড়িয়ে দেয়। বাড়ি থেকে আনা আচারের বোতল বা ম্যাগির প্যাকেটও প্রিয় রান্নাঘরের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। কঠিন পরিবেশে এই সাধারণ ভারতীয় খাবারগুলিই হয়ে ওঠে বিলাসিতা।

রেশন প্যাকের গল্প
প্রতিটি রেশন প্যাকের পরিকল্পনা করা হয় তাৎক্ষণিক শক্তি আর উষ্ণতা দেওয়ার জন্য। তাড়াতাড়ি গ্লুকোজ পেতে চকোলেট, ক্যালোরির চটজলদি উৎস হিসেবে ড্রাই ফ্রুটস, সহজপাচ্য খাবারের জন্য ইনস্ট্যান্ট নুডলস বা স্যুপ - সবই থাকে। শীতকালে সেনারা স্টোভ ঘিরে বসে খিচুড়ি বা ডালের মতো ওয়ান-পট খাবার রান্না করেন যা হালকা, সহজে হজম হয়, আর শরীর গরম রাখে। রাস্তা বন্ধ থাকা দীর্ঘ শীতের দিনে মূলত ফ্রোজেন খাবারই ভরসা। এপ্রিল থেকে অগস্ট পর্যন্ত কয়েক মাসে রসদ আসার পথ খোলে, তখনই তাজা সবজি ও ফল সেনাশিবিরে পৌঁছতে পারে। বছরের বাকি সময় প্যাকেটজাত সংরক্ষিত খাবারই বাঁচার একমাত্র ভরসা।
উচ্চতায় কেন এত ক্যালোরি দরকার?
সাধারণ মানুষের জন্য দৈনিক প্রস্তাবিত ক্যালোরি প্রয়োজন ২,০০০–২,৫০০। কিন্তু লাদাখে দায়িত্বে থাকা সেনাদের জন্য তা প্রায় দ্বিগুণ - ৪,০০০ থেকে ৪,৫০০ ক্যালরি। এমনকী বিশ্রামের সময়ও তাঁদের শরীর সমুদ্রপৃষ্ঠের সমতলে কষ্টকর কাজের সমান শক্তি খরচ করে। পর্যাপ্ত ক্যালোরি না পেলে শরীর দ্রুত রোগা হতে থাকে।

বিশেষ করে নিরামিষাশীদের জন্য প্রোটিনের ঘাটতি বড় সমস্যা। এর ফলে পেশির ভর কমে যায়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। রেশনের একঘেয়েমি আর পুষ্টির ঘাটতি একে আরও কঠিন করে তোলে। তবু ডায়েট উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। খাদ্যই শক্তি আর দুর্বলতার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি
উচ্চতার জীবনে ঝুঁকি শুধু খাবারেই সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে ফিট সেনারাও কখনও কখনও হঠাৎ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। অক্সিজেনের ঘাটতি হৃদপিণ্ড আর ফুসফুসের উপর চাপ বাড়ায়। দীর্ঘ সময় ভারী শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীর ভেঙে পড়তে পারে। তাই সেনাদের সবসময় শক্তি বাঁচিয়ে চলতে, নিয়ম মেনে জীবনযাপন করতে, এবং শরীরকে যথেষ্ট পুষ্টি দিতে পরামর্শ দেওয়া হয়।
সমতলের মানুষের কাছে প্রতিটি খাবার যেমন আনন্দের বিষয়, লাদাখের সেনাদের জন্য প্রতিটি আহার বেঁচে থাকার উপকরণ।বিশ্বজুড়ে নানা রকম রান্নার স্বাদ নেওয়ার সুযোগ আমাদের থাকলেও, তাঁরা কৃতজ্ঞ থাকেন যে যেটুকু রেশন পাওয়া যায়, তাতেই। সেটাই তাঁদের উষ্ণতা আর শক্তি দেয়। খাবার তাঁদের কাছে বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের শর্ত। হিমশীতল বাতাস, ক্লান্তি, নিঃসঙ্গতা পেরিয়ে পাহারায় দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি।