এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য, শহরের ক্ষুধার্ত মানুষদের খাওয়ানো, একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ। গরিব, বস্তিবাসী, র্যাগপিকাররা এখন রাস্তাঘাট থেকে প্লাস্টিক কুড়িয়ে এনে খাবার পাচ্ছেন।

‘গার্বেজ ক্যাফে’, যেখানে প্লাস্টিকের বিনিময়ে পাওয়া যায় পেটপুরে খাবারদাবার
শেষ আপডেট: 30 August 2025 13:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিকের ব্যবহার এখন পৃথিবী জুড়ে এক জ্বলন্ত সমস্যা। প্লাস্টিক যথেচ্ছ ব্যবহার তো হয়, মানুষের জীবনকে এটা অনেক সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু তার সঠিক ম্যানেজমেন্ট নিয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় প্লাস্টিক দূষণ এখন ব্যাপক এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেই সমস্যার সমাধানেই ভারতের নানা প্রান্তে এখন ছড়িয়ে পড়ছে এক অভিনব উদ্যোগ, ‘গার্বেজ ক্যাফে’, যেখানে প্লাস্টিকের বিনিময়ে পাওয়া যায় পেটপুরে খাবারদাবার (plastic for food scheme)। এর সূচনা হয়েছিল ছত্তীসগড়ের অম্বিকাপুরে, আর সেই উদ্যোগই এখন দেশ জুড়ে উদাহরণ (Garbage Cafe India)।
অম্বিকাপুরের এই ক্যাফেতে (Ambikapur Garbage Cafe) ঢুকতেই পাওয়া যায় গরম খাবারের গন্ধ। কাঠের বেঞ্চে বসে কেউ চুপচাপ খাচ্ছেন, কেউ আবার গল্প করছেন। তবে বাকি ক্যাফের থেকে আলাদা এই ক্যাফে এক জায়গাতেই - এখানে টাকার বিনিময়ে নয়, খাবার পাওয়া যায় প্লাস্টিক জমা দিয়ে (recycling initiative India)। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসেন গরম খাবারের আশায় (hunger and plastic pollution solution)। শর্ত একটাই, হাতে থাকতে হবে পুরনো পলিথিন, খাবারের মোড়ক, জলের বোতলের মতো প্লাস্টিক বর্জ্য (Chhattisgarh waste management)।
গারবেজ ক্যাফের গল্পটা ঠিক কী?
অম্বিকাপুর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের (AMC) উদ্যোগে তৈরি এই ক্যাফের দায়িত্বে আছেন বিনোদ কুমার প্যাটেল। তাঁর কথায়, ১ কেজি প্লাস্টিক দিলে মিলবে একটা ‘ফুল মিল’ - ভাত, ডাল, রুটি, তরকারি, স্যালাড, আচার। আধ কেজি প্লাস্টিক দিলে একটা ‘জলখাবার’ যেমন সমোসা বা বড়া পাও পাবেনই।

ক্যাফের স্লোগান - “More the waste, better the taste”। অর্থাৎ, যত বেশি প্লাস্টিক, তত ভাল খাবার।
স্থানীয় বাসিন্দা রেশমি মণ্ডল যেমন প্রতিদিন সকালেই বের হন ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক সংগ্রহ করতে। আগে এগুলো বিক্রি করতেন স্ক্র্যাপ ডিলারের কাছে মাত্র ১০ টাকা কেজি দরে। যা দিয়ে সংসার চালানোই সম্ভব হত না।
এখন তাঁর জীবন বদলেছে, তাঁর কথায়, "আমি এখন পরিবারকে পেটভরে খাবার খাওয়াতে পারি এই প্লাস্টিক দিয়ে। এতে আমাদের জীবনে অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে।"
‘খিদে মেটানো’ আর ‘পরিবেশ বাঁচাও’ দুই বড় সমস্যার সমাধান এক ছাদের তলায়
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই ছিল, শহরের ক্ষুধার্ত মানুষদের খাওয়ানো এবং একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ। গরিব, বস্তিবাসী, র্যাগপিকাররা এখন রাস্তাঘাট থেকে প্লাস্টিক কুড়িয়ে এনে খাবার পাচ্ছেন।
শারদা সিং প্যাটেল, যিনি শুরু থেকে এখানে কাজ করছেন, বলেন, "প্লাস্টিকের বদলে খাবার দিলে আমরা শুধু পেট ভরাচ্ছি না, শহরকেও পরিষ্কার রাখছি।"
সাফল্যের অঙ্ক
বিনোদ প্যাটেলের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ২০ জন মানুষ এখানে খাবার খান। ২০১৯ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৩ টন প্লাস্টিক সংগ্রহ হয়েছে। এর ফলে অম্বিকাপুরে প্লাস্টিকের পরিমাণ ব্যাপক হারে কমেছে। ২০১৯ সালে যেখানে বছরে ৫.৪ টন প্লাস্টিক ল্যান্ডফিলে যেত, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ২ টনে।
যদিও শহরের মোট প্লাস্টিক বর্জ্য ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ২২৬ টনে, যার প্রায় সবটাই রিসাইকেল হয়। গারবেজ ক্যাফে মূলত সেই অংশটুকু সংগ্রহ করছে যা সাধারণ ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়।
অম্বিকাপুরের সাফল্যের গল্প
অম্বিকাপুর এখন পরিচিত হয়েছে ভারতের অন্যতম পরিষ্কার শহর হিসেবে। আগে এখানে ৪৫ টন দৈনিক বর্জ্য ফেলার জন্য ছিল ১৬ একর জমির একটি ডাম্পিং গ্রাউন্ড। কিন্তু ২০১৬ সালে সেটিকে পার্কে রূপান্তর করা হয় এবং শহর চালু করে ‘জিরো ওয়েস্ট বিকেন্দ্রীভূত বর্জ্য ব্যবস্থা’।
সংগৃহীত প্লাস্টিক ব্যবহার হচ্ছে সড়ক তৈরিতে অথবা রিসাইক্লিং করে বিক্রির মাধ্যমে সরকারের আয় হচ্ছে। ভিজে আবর্জনা কম্পোস্টে রূপান্তরিত হচ্ছে, আর সামান্য অংশ যাচ্ছে সিমেন্ট কারখানায় জ্বালানি হিসেবে। ফলে অম্বিকাপুর হয়ে উঠেছে ‘জিরো ল্যান্ডফিল সিটি’ (zero landfill city)।
স্বচ্ছতা দিদিদের অবদান (Swachh Bharat Ambikapur)
গারবেজ ক্যাফেতে আনা প্লাস্টিক জমা হয় AMC-এর পরিচালিত বিশেষ কেন্দ্রগুলিতে, যাদের বলা হয় SLRM (Solid & Liquid Resource Management) সেন্টার।
এমন ২০টি কেন্দ্র রয়েছে অম্বিকাপুরে, যেখানে বর্জ্য আলাদা করা হয় ৬০টিরও বেশি ভাগে। কাজ করেন ৪৮০ জন মহিলা - তাঁদের বলা হয় ‘স্বচ্ছতা দিদি’।
তাঁরা প্রতিদিন ঘরে ঘরে গিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ করেন। মাসে পান ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বেতন। সোনা টোপ্পো, যিনি একটি কেন্দ্র চালান, বলেন, প্রতিদিন ৩০–৩৫ জন মানুষ প্লাস্টিক নিয়ে আসেন। কখনও র্যাগপিকার, কখনও দোকানের কর্মী বা সাধারণ শ্রমিক।
তবে একটি সমস্যা থেকেই গেছে। বর্জ্য কুড়ানো মানুষরা এখনো পর্যাপ্ত গ্লাভস, মাস্ক ইত্যাদি পান না। ফলে তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। এই নিয়েও ভাবনাচিন্তা চলছে।

বড় পরিসরে প্রভাব
স্বচ্ছ অম্বিকাপুর মিশনের সভাপতি শশিকলা সিনহা জানিয়েছেন, ২০১৬ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০,০০০ টন শুকনো বর্জ্য (প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু, ই-বর্জ্য) পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে।
এই মডেল এতটাই সফল যে এখন ছত্তিশগড়ের ৪৮টি ওয়ার্ডে চালু হয়েছে।
সরকারি আধিকারিক রিতু সাইন জানিয়েছেন, উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি মডেল তৈরি করা যা কার্যকর, পরিবেশবান্ধব এবং আর্থিকভাবে টেকসই হয়। এখন একে বলা হচ্ছে “অম্বিকাপুর মডেল”।
অম্বিকাপুর দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে শিলিগুড়িতে ২০১৯ সালে চালু হয় একই প্রকল্প। তেলঙ্গানার মুলুগুতে প্লাস্টিকের বদলে চাল দেওয়া শুরু হয়। কর্নাটকের মাইসোরে ২০২৪ সালে চালু হয় প্রকল্প, যেখানে ৫০০ গ্রাম প্লাস্টিক দিলে জলখাবার, ১ কেজি দিলে পুরো মিল পাওয়া যায়। পিছিয়ে নেই উত্তরপ্রদেশও, সেখানে প্লাস্টিকের বিনিময়ে নারীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়া হচ্ছে।
তবে দিল্লিতে ২০২০ সালে শুরু হওয়া ২০টিরও বেশি গারবেজ ক্যাফে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় - জনসচেতনতার অভাব, বর্জ্য আলাদা না করা এবং অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে।
ভারতের বাইরে ক্যম্বোডিয়ায় টনলে স্যাপ হ্রদের আশপাশে প্লাস্টিকের বিনিময়ে চাল দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞের মত
গুজরাতের আমদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিনাল পাঠক বলেন, "এ ধরনের উদ্যোগ সমস্যার মূলে পৌঁছয় না। অতিরিক্ত প্লাস্টিক উৎপাদন আর সঠিক বর্জ্য আলাদা করার অভাবই মূল সমস্যা। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা তৈরির জন্য এটি খুব কার্যকর। এটা এক ভাল শুরু, তবে আরও বড় পরিবর্তন প্রয়োজন।"