সংসার, সন্তান আর আর্থিক সীমাবদ্ধতায় জীবনের ‘প্রাইম টাইমে’ যেটা সম্ভব হয়নি, চাকরি থেকে অবসরের পর ইন্দিরা খুঁজে নিয়েছেন তাঁর স্বপ্নপূরণের সুযোগ।

প্রাক্তন বায়োকেমিস্ট্রি শিক্ষিকা ইন্দিরা আজ একের পর এক দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন
শেষ আপডেট: 27 August 2025 16:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোটবেলা থেকেই তাঁর ইচ্ছে ছিল একদিন না একদিন তল্পিতল্পা নিয়ে সারা পৃথিবীর কোণা কোণা ঘুরে দেখবেন। কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত ভারতীয় মহিলার জীবনের গল্পটা যা হয় আর কী! সংসার, সন্তান আর আর্থিক সীমাবদ্ধতায় জীবনের ‘প্রাইম টাইমে’ সেটা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে মনের কোণে লালন করে রাখা স্বপ্নের কাছে হার মানল বয়সের বাধা (Kerala woman solo traveller)।
ষাটের কোঠায় এসে ‘রইল ঝোলা, চলল ভোলা…’ কে জীবনের ধ্রুবতারা করে পথে নেমেই পড়লেন কেরলের ইন্দিরা এম (এখন বয়স তাঁর ৭০ ছুঁয়েছে) (Indira M)। ২০১৫ সালে প্রথম একা বিদেশযাত্রা, দক্ষিণ আফ্রিকার সাভানায় সাফারি করতে গিয়ে যেন নতুন করে জীবন খুঁজে পেলেন তিনি (solo travel at 70)।
প্রাক্তন বায়োকেমিস্ট্রি (Biochemistry) শিক্ষিকা ইন্দিরা আজ একের পর এক দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পাসপোর্টের হিসেব বলছে, ইতিমধ্যেই তিনি একা ঘুরে দেখেছেন ৩৫টি দেশ। তাঁর দাবি, বয়স কোনও বাধা নয় - বরং প্রতিটি মহিলা, বিশেষ করে মায়েদের অন্তত একবার হলেও একা ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে জীবনে স্বাগত জানানো উচিত (women travel inspiration)।
একলা সফর, নতুন বন্ধু
অপরিচিতরাও কাছের বন্ধু হয়ে ওঠেন, এটাই ইন্দিরার ভ্রমণের সবচেয়ে আনন্দদায়ক দিক। তাঁর কথায়, “আমরা দিব্যি মিশে যাই। জীবনের গল্প ভাগ করে নিই। বয়স এখানে কোনও সীমাই নয়।” প্রথম সফরে শুধু ভাবছিলেন খরচের এই ধাক্কা আদৌ সফল হবে তো! ভয় কিন্তু ছিল না মোটেও। আর সেই সফরই তাঁকে ভ্রমণের প্রেমে ফেলেছিল।
আফ্রিকা থেকে ইউরোপ, বাড়ছে তালিকা…
প্রথম একলা সাফারি তাঁর কাছে ছিল ‘কল্পনার বাইরে’ এক অভিজ্ঞতা। জোহানেসবার্গ, কেপ টাউন ঘোরা, বন্যপ্রাণী দর্শন, আর সেখানকার পর্যটন ব্যবস্থা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তারপর থেকে প্রতি বছরই তিনি নতুন নতুন দেশ ভ্রমণ শুরু করেন। গ্রিস, মিশর আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সফরও সেই লিস্টে যোগ হয়েছে।
ভ্রমণের স্বাধীনতা ও নিজেকে আবিষ্কারের আনন্দ
ইন্দিরা বলেন, “যখন বয়স কম ছিল, তখন হাতে টাকা ছিল না। বিয়ের পর সন্তান সামলাতে গিয়ে সময়ও পেতাম না। তখন একা একা ঘুরতে যাওয়ার ধারণাই ছিল না মনে। এখন সন্তানরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, তাই নিজের জন্য সময় বের করে নিতে পারছি।” তাঁর কাছে একা একা ঘুরতে যাওয়া মানে স্বাধীনতার উপলব্ধি, আত্মবিশ্বাস আর নিজস্ব ছন্দে জীবনে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা।
ইন্দিরার মেয়ে রোহিনী রাজাগোপাল জানান, মাসিক পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের আর্থিক নিরাপত্তার পরই ইন্দিরা তাঁর স্বপ্নপূরণের সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ‘ব্যবহারিক’ ভ্রমণও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সাহসী সফর
২০১০ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর এক বন্ধুর উৎসাহে প্রথম দলের সঙ্গে মিলে ঘুরতে যাওয়া শুরু করেন ইন্দিরা। সেই আত্মবিশ্বাসের জোরেই এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। মাঝেমধ্যে ছোটখাট সমস্যা এসেছে ঠিকই - একবার ইস্তানবুলে স্যুটকেসের কোড ভুলে গিয়ে তা ভাঙতে হয়েছে, জাপানে ঘুরতে গিয়ে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই ভ্রমণসঙ্গীদের পাশে থাকাই নিজেকে সামলে নেওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
ইন্দিরার মতে, সোলো ট্রাভেল মহিলাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, জীবনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনে। তাঁর কথায়, “পরিবার সঙ্গে থাকলে সবসময় চিন্তা লেগে থাকে। একা গেলে নিজের জায়গা তৈরি হয়, ব্যক্তিগত আনন্দ পাওয়া যায়। নিজের চোখে পৃথিবী দেখা যায়।”
মা, মেয়ে, স্ত্রী - এই সব পরিচয়ের বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে বাঁচা, নিজেকে সময় দেওয়া খুব জরুরি বলে মনে করেন ইন্দিরা। জীবনের প্রশ্নে তাঁর আত্মবিশ্বাসী জবাব, “প্রতিদিন তো অন্যের জন্য বাঁচি আমরা। অন্তত একবার সেই সময়টা নিজেকে দিন। একে একে জড়ো করা অভিজ্ঞতাগুলো সারাজীবন মনে থাকবে।”