‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধের ভুয়ো ফোনে ভয় না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ডায়াল করুন এই নম্বরটি।

সাইবার ক্রাইম
শেষ আপডেট: 4 November 2025 21:49
“ডিজিটাল অ্যারেস্ট” কিংবা ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার মতো ফোন পাচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে ভীতসন্ত্রস্ত না হয়ে সামান্য একটু সময় নিয়ে ভাবুন। সেই ফোনটি সন্দেহজনক মনে হলেই ফোন করুন ১৯৩০-তে। অথবা https://sancharsaathi.gov.in/sfc/ , টেলিকম দফতরের (ডট) এই পোর্টালেও অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
সময় যত গড়াচ্ছে, দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। স্মার্টফোন থেকে নানা পরিষেবার বহর ছড়াচ্ছে। এই প্রযুক্তি যেমন বিপুল সুবিধা করেছে, সহজে নাগালে আনছে নানা পরিষেবা (এমনকী প্রান্তিক মানুষেরও), তেমনই সেই সুযোগে প্রতারণা-জালিয়াতির জাল ছড়াচ্ছে প্রতারকেরাও। যদিও যে কোনও পরিষেবা বা প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই নানা প্রতারণার অভিযোগ ওঠে, তবুও ডিজিটাল জালিয়াতির আশঙ্কা থেকে অনেকেই উন্নত পরিষেবার সুবিধা নিতে ভয় পাচ্ছেন। অনেকেই পিছু হঠছেন শুধু প্রান্তিক মানুষই নন, শহুরে নাগরিকও সেই ফাঁদে পা দিয়ে টাকাকড়ি বা ব্যক্তিগত তথ্য খোয়াচ্ছেন। সাইবার বিশেষজ্ঞ, কেন্দ্রীয় টেলিকম দফতর (ডট), বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কিংবা ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার (এনপিসিআই) দাবি, পরিষেবা নেওয়া নাগরিকদের স্রেফ সচেতনতার অভাবের সুযোগেই জাল বিছোচ্ছে প্রতারকেরা। তারা বারবার তাই জন-সচেতনতা বাড়ানোর উপরে জোর দিচ্ছে সবাই।
কী বলছে এনপিসিআই :
মঙ্গলবার ফের এক দফা সতর্কবার্তা বা সচেতনতামূলক নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে এনপিসিআই। তাদের দাবি, ডিজিটাল ব্যবস্থা যেমন সুবিধাজনক, তেমনই সুরক্ষিতও। কিন্তু ডিজিটাল লেনদেন করতে হলে অনলাইন প্রতারণার সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। গোড়াতেই সন্দেহজনক বা প্রতারণামূলক মনে হলে তা গোড়াতেই চিহ্নিত করতে হবে। তাহলেই তা ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহারকারীদের সুরক্ষিত রাখবে।
সাম্প্রতিককালে ডিজিটাল অ্যারেস্ট-এর নামে নয়া ধরনের ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদ পাতছে জালিয়াতেরা। তারা নিজেদের আইলরক্ষক হিসাবে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহারকারীদের মিথ্যা ভয় দেখাচ্ছে এই বলে যে, তাদের পরিবারের কোনও সদস্য বা বন্ধু বা ঘনিষ্ঠ কেউ কোনও আইন বহির্ভূত কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। এ ভাবে তাঁদের নামে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে জোর করে টাকা চাইছে। অনেক সময়ই তারা ভিডিয়ো কল করে তাঁদের ডিজিটাল অ্যারেস্ট করা হচ্ছে বলে ভয় দেখাচ্ছে। আমজনতার একাংশের আইনের বিষয়ে সম্যক জ্ঞান না থাকায় তাঁরা ভাবছেন ডিডজিটাল অ্যারেস্ট বলে সত্যিই হয়তো কিছু হয়। যদিও বাস্তবে আইনে এমন কোনও ব্যবস্থাই নেই। অভিযোগও যে মিথ্যা, তা-ও তাঁরা একবারও ভেবে দেখছেন না। তখন তাঁরা সেই জাল অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে ভয়ে টাকা বা আধার কার্ড ইত্যাদি প্রতারকদের পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অনেক সময়ে ফোনে আসা ওটিপি-ও তাঁরা জালিয়াতদের কাছে দিয়ে দিচ্ছেন। যেটা কোনও মতেই নিজের ঘনিষ্ঠ কাউকেই জানানোরও কথা নয়। ফলে আর্থিক ক্ষতি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য খোয়ানোর মুখে পড়ছেন তাঁরা।
কী ভাবে জালিয়াতিকে চিহ্নিত করবেন?
অফিসিয়ালদের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত ফোন এলে:
কেউ যদি নিজেকে পুলিস, সিবিআই, আয়কর অফিসার বা কাস্টমসের মতো সরকারি প্রতিনিধি দাবি করে আপনাকে ফোন করেন, সতর্ক হয়ে যান। সেই সঙ্গে যদি তারা দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা শুরুর ভয় দেখান, আরও সতর্ক হন। তারা অভিযোগ করতে পারে, আর্থিক তছরুপ, কর ফাঁকি বা ড্রাগ চালানের সঙ্গে আপনার পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ কেউ জড়িয়ে পড়েছেন।
ভয় দেখানো কথাবার্তা বললে:
প্রতারকেরা পুলিস বা সরকারি আধিকারিকের ভুয়ো পোশাক বা লোগো দেখিয়ে ভুয়ো পরিচয় দিয়ে সাধারণত ভিডিয়ো ফোন করে। অনেকে সময় ভুয়ো পুলিস স্টেশনের মতো পারিপাশ্বির্ক আবহ তৈরি করে তার ছবি দেখিয়ে লোকের মনে বিশ্বাস তৈরি করতে চেষ্টা করে এবং অবশ্যই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি বা ভয় দেখিয়ে কথা বলতে পারে।
স্পর্শকাতর তথ্য বা আর্থিক লনদন করার চাপ:
আপনার ঘনিষ্ঠকে অভিযোগ থেকে বাঁচাতে আপনার কোনও ব্যক্তিগত বা একান্ত গোপনীয় তথ্য জানাতে অথবা বড় সড় অঙ্কের টাকা চাইতে পারে। তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর জন্যও আপনাকে জোর করতে পারে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শব্দবন্ধও তারা ব্যবহার করতে পারে যেমন -- “clearing your name”, “assisting with the investigation”, or “refundable security deposit/escrow account” ইত্যাদি। যাতে আপনার মনে হয়, সত্যিই দ্রুত তদন্ত চলছে।
সুরক্ষিত থাকতে এনপিসিআই-এর সহজপাঠ
এমন কোনও অপ্রত্যাশিত ফোন বা মেসেজ পেলে পুরোটা খতিয়ে ভাবতে আগে একটু সময় নিন। গোড়াতেই আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন না। আপনার আশঙ্কা কিংবা দ্রুত নির্দেশ মেনে নেওয়াকেই হাতিয়ার করে জালিয়াতেরা। তাই শান্ত থাকুন। আসল সরকারি কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার আধিকারিক বা প্রতিনিধি কখনও কোনও অভিযোগের তদন্তের জন্য টাকা চাইবেন না। এ ভাবে ফোন বা ভিডিয়ো কল করা তো আরওই অবাস্তব। তাই সব সময়ে কে ফোন করছে, তার পরিচয় ভালো করে জানার চেষ্টা করুন। কোনও পদক্ষেপের আগে আপনার ভরসাযোগ্য কারও সঙ্গে আলোচনা করুন।
সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট জায়গায় অভিযোগ জানান:
সবাই যে ই-মেল বা হোয়াটসঅ্যাপ অথবা এসএমএসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর মতো দক্ষ হবেন এমন নয়। তাঁদের জন্য সহজ একটি ফোন নম্বর— ১৯৩০ চালু রয়েছে। সন্দেহজনক ফোন পেলেই সেখানে ফোন করে সবটা জানাতে পরামর্শ দিয়েছে এনপিসিআই।
যাঁরা ডট-এর পোর্টালে (https://sancharsaathi.gov.in/sfc/) অভিযোগ করতে পারবেন, তাঁরা সেখানেও জানাতে পারেন।
সম্ভাব্য প্রতারকদের কাছ থেকে পাওয়া মেসেজ সেভ করে রাখুন। ভুল করে কোনও নথি দিয়ে থাকলে তার স্ক্রিনশট নিয়ে রাখুন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোদ জানাতে কিংবা তারপরে তদন্তের ক্ষেত্রেও এগুলি কাজে আসতে পারে।
মনে রাখা ভালো, অপিরিচিত কারওর সঙ্গে আলাপ হলে যেমন সতর্ক থাকেন, ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রও সেরকমই থাকতে হবে। এমন কারও কাছে থেকে ফোন বা মেসেজ পেলে আর পাঁচটা পরিষেবার মতোই ডিজিটাল পরিষেবার ক্ষেত্রেও আপনার একমাত্র লক্ষ্য হল, সচেতন থাকা। একই সঙ্গে অন্যদেরও সচেতন করা।