প্রতিদিন সকালে রেস্তরাঁর কর্মীরা কবরগুলি পরিষ্কার করেন, ফুল দেন, প্রণাম করেন। তাঁদের বিশ্বাস, মৃতদের আশীর্বাদেই এই ব্যবসা এতদিন টিকে আছে।

এই রেস্তরাঁকে কেন্দ্র করেই আলোচনা - ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 17 October 2025 15:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি, রাম-লক্ষ্মণ সাথে আছে, করবে আমার কী - এই মন্ত্রটা মুখস্থ রাখুন। কারণ, যদি কখনও এই রেস্তরাঁয় (Resturant) যান, হয়তো দরকার পড়বে।
শুনে অবাক লাগতে পারে। রেস্তরাঁয় খেতে গিয়ে ভূত (Ghost) তাড়ানোর মন্ত্র জপতে হবে কেন? কিন্তু যদি বলা হয়, এই রেস্তরাঁয় আপনি আসলে ভূতেদের সঙ্গেই খাবার খান? চায়ের কাপের ধোঁয়ার মধ্যে মিশে থাকে মৃত্যুর গন্ধ, মাখন-পাঁউরুটির ঘ্রাণের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় আত্মারা!
আহমেদাবাদের (Ahmedabad) লাল দরওয়াজা (Lal Darwaja) এলাকায় রয়েছে এক মায়াময় ঠিকানা - ‘লাকি রেস্তরাঁ’ (Lucky Resturant)। বাইরে থেকে দেখলে এ এক ব্যস্ত আড্ডার জায়গা - কোলাহল, হাসি, গরম চা, আর পাঁউরুটি-মাখনের গন্ধে ভরা। কিন্তু ভেতরে পা রাখলেই বুঝবেন, এ রেস্তরাঁ অন্য জগতের। কারণ এখানে আপনি যখন চায়ে চুমুক দিচ্ছেন, আপনার ঠিক পাশেই নীরবে ঘুমিয়ে আছেন কেউ, এক কবরের (Grave) নীচে।
‘লাকি রেস্তরাঁ’-র জন্মটাই এক অনন্য গল্প। ১৯৫০-এর দশকের গোড়ায়, কেরলর কালিকট (Calicut) থেকে আমেদাবাদে (Ahmedabad) আসেন তরুণ কে এইচ মহম্মদ। জীবিকার স্বার্থে খুলেছিলেন এক ছোট্ট চায়ের দোকান - এক কবরখানার (Graveyard) পাশে। দোকানের চা এত জনপ্রিয় হয় যে, শীঘ্রই তা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। আর মহম্মদ বিশ্বাস করতে শুরু করেন, এই কবরখানাই তাঁর সৌভাগ্যের চাবিকাঠি।
এই বিশ্বাসই একদিন তাঁকে করে তোলে আরও সাহসী। বন্ধু কৃষ্ণন কুট্টির সঙ্গে পার্টনারশিপে কবরখানাসহ গোটা জায়গাটাই কিনে ফেলেন। আর সেই কবরের উপরেই গড়ে তোলেন এক আশ্চর্য রেস্তরাঁ - ‘লাকি’। যেখানে অন্যেরা ভয় পেত, সেখানে তাঁরা দেখেছিলেন সুযোগ। আর সেই পদক্ষেপই একদিন ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

শুরুতে মানুষ অবাক হয়েছিল, কেউ কেউ ভয়ও পেয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে লাকি রেস্তরাঁ হয়ে উঠল আমেদাবাদের সংস্কৃতির এক প্রতীক। আজও শহরের বহু মানুষ কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে এখানে এসে এক কাপ চা খেয়ে নেন সৌভাগ্যের আশায়। রেস্তরাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত অতিথি ছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী এম এফ হুসেন (MF Hussain)। চায়ের টানে তিনি প্রায়ই চলে আসতেন এখানে। একদিন কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রেস্তরাঁটিকে উপহার দেন নিজের আঁকা একটি ছবি (Painting)। আজও সেই ছবি ঝুলে আছে দেওয়ালে।

রেস্তরাঁর ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে সবুজ পাথরের কবর, এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে পুরো ঘরজুড়ে। কেউ যাতে তার ওপর অজান্তে পা না দেয়, তার জন্য প্রতিটি কবর ঘিরে দেওয়া হয়েছে লোহার রেলিংয়ে। কবরগুলির মাঝখানে সাজানো টেবিল-চেয়ার। সেখানে বসে মানুষ খায়, কথা বলে, হাসে, কখনও কখনও চুপ করে তাকিয়ে থাকে সেই নিঃশব্দ পাথরের দিকে।
এই কবরগুলির আসল ইতিহাস আজও কেউ জানে না। শোনা যায়, এগুলো ষোড়শ শতকের এক সুফি সাধকের শিষ্যদের। কিন্তু এখানে মৃত্যু মানে অশুভ নয়, বরং এক নিঃশব্দ শ্রদ্ধা। প্রতিদিন সকালে রেস্তরাঁর কর্মীরা কবরগুলি পরিষ্কার করেন, ফুল দেন, প্রণাম করেন। তাঁদের বিশ্বাস, মৃতদের আশীর্বাদেই এই ব্যবসা এতদিন টিকে আছে।

কেউ কেউ রেস্তরাঁর নাম ‘লাকি’ শুনে হাসে। এত মৃত মানুষ যেখানে, সেটা ‘লাকি’ কীভাবে? কিন্তু আসল সৌভাগ্য তো এখানেই, যেখানে মৃত্যু ভয়ের নয়, বরং সহাবস্থানের প্রতীক। যেখানে মৃতরাও প্রতিদিন সাক্ষী থাকেন জীবনের উদযাপনে।
‘লাকি রেস্তরাঁ’ আজ শুধু একটি খাবারের জায়গা নয়, এ এক দর্শন। যেখানে কফিনের পাশে ওড়ে চায়ের ধোঁয়া, আর মানুষ শিখে নেয়, সৌভাগ্য ভয় থেকে নয়, শ্রদ্ধা থেকে জন্ম নেয়।