ভারতের পুরাণ ও মহাকাব্যের জগৎ কখনওই একরৈখিক ছিল না। এখানে ‘সত্য’ বহুত্বের। যে কারণে ‘একই গল্পের, ভিন্ন রূপ’ বারবার উপমহাদেশের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।

ছবি সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 12 July 2025 15:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের পুরাণ ও মহাকাব্যের জগৎ কখনওই একরৈখিক ছিল না। এখানে ‘সত্য’ বহুত্বের। যে কারণে ‘একই গল্পের, ভিন্ন রূপ’ বারবার উপমহাদেশের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। যেমনটা বলা হয়েছে ওয়েন্ডি ডোনিজারের লেখা 'দ্য কেভ অফ একোস: স্টোরিস অ্যাবাউট গডস, অ্যানিম্যালস অ্যান্ড আদার স্ট্রেঞ্জারস'-এ।’
যেমন, পাণ্ডবদের মৃত্যু প্রসঙ্গে সাধারণত মানুষ শুনে এসেছে, হিমালয়ের পথে গমন করে তাঁরা একে একে মৃত্যুবরণ করেন। যা মহাভারতের বিখ্যাত ‘স্বর্গারোহণ পর্ব’। কিন্তু একই সময়ে অন্য এক সংস্করণ বলে, তাঁরা জীবনান্তে জৈন ধর্মে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন। এবং এই দাবির পেছনে ছিল এক জৈন মুনি— হেমচন্দ্র, যিনি সেই কালে নানা সভায় বক্তৃতা দিয়ে বলতেন, মহাভারতের নায়করা ছিলেন আসলে জৈন ধর্মের অনুসারী। স্বভাবতই, তাতে খেপে যান পৌরাণিক হিন্দু ব্রাহ্মণেরা।
এক সময় সেই বিতর্ক পৌঁছয় রাজদরবারে। রাজা হেমচন্দ্রকে প্রশ্ন করেন, এই দাবির ভিত্তি কী? জবাবে হেমচন্দ্র বলেন, “আমাদের শাস্ত্রে যেমন আছে, তেমনি ব্যাসদেবের মহাভারতেও আছে অন্যরকম এক বর্ণনা। কিন্তু কে বলতে পারে, দু'টি কাহিনি আসলে দু-দু'টি পৃথক যুগের, পৃথক জন্মের পাণ্ডবদের নয়?”
ভারতীয় পুরাণচর্চার পরম্পরা এমনই, যেখানে একই চরিত্র, কিন্তু বহু জন্ম, বহু কাল, বহু রূপে ফিরে আসে। এবং প্রতিটি রূপই ‘সত্য’। কারণ, এখানে ইতিহাস নয়, পুরাণের পুনরাবৃত্তিই গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমের ইতিহাসচর্চার যেখানে সময়, স্থান ও প্রমাণে বাঁধা, সেখানে ভারতীয় গল্পে সবটাই বহমান।
হেমচন্দ্র আরও একটি গল্পও বলেন, নাকি একবার ভীষ্মের দাহকর্ম করতে তাঁকে এমন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আগে কারও দাহ হয়নি। তখন স্বর্গীয় কণ্ঠে ঘোষণা হয়, “এই স্থানে একশো ভীষ্ম, তিনশো পাণ্ডব, আর অগণিত দ্রোণ ও কর্ণের দেহ দাহ হয়েছে ইতিপূর্বেই।” অর্থাৎ, এই সব চরিত্রেরা কেবল একবার নয়, বারংবার জন্মেছেন, মরেছেন, ইতিহাসে ফিরে এসেছেন।
বৌদ্ধ কাহিনিতে যেমন দেখা যায়, এক নারী মৃত সন্তানকে বাঁচাতে বুদ্ধের শরণে যান, বুদ্ধ তাঁকে বলেন এমন এক গৃহ খুঁজতে যেখানে কারও মৃত্যু হয়নি। ফলত, সেই নারী প্রত্যেক বাড়িতে গিয়ে বুঝতে পারেন মৃত্যু সকলের ভাগ্য, এবং সেই উপলব্ধিতেই শুরু হয় তাঁর আত্মিক সফর। এই গল্পগুলিরও সুর ও সত্য অভিন্ন।
আর এখানেই জয় পান হেমচন্দ্র। তিনি শুধু জৈন শাস্ত্রকে নয়, ব্যাসদেবের মহাভারতকেও ব্যবহার করেন নিজের যুক্তির পক্ষে। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, বিবেচনার প্রাচুর্য আর একাধিক ‘সত্য’-র সহাবস্থান এটাই ছিল তাঁর বার্তা। এবং রাজাও শেষে প্রশংসা করেন এই মুক্তচিন্তার সাধুকে। নিন্দা করেন সংকীর্ণমনা ব্রাহ্মণদের।