আজ যখন দেশজুড়ে বেসরকারি উদ্যোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে একটা বিভ্রান্তি স্পষ্ট। বার বার বলা হচ্ছে, বেসরকারি উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভার নিতে অপারগ।
.jpeg.webp)
জামশেদজি টাটা
শেষ আপডেট: 12 July 2025 13:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ যখন দেশজুড়ে বেসরকারি উদ্যোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে একটা বিভ্রান্তি স্পষ্ট। বার বার বলা হচ্ছে, বেসরকারি উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভার নিতে অপারগ। এতে ধনসম্পদের কেন্দ্রীকরণ হয় হাতে গোনা ক'জনের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও কিছুদিন আগে কলকাতায় এসে বলেছিলেন— "বেসরকারি উদ্যোগ ও গণতন্ত্র একসঙ্গে চলে না।"
এই প্রসঙ্গে একসময় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী টিটি কৃষ্ণমাচারী। ১৯৫৬ সালের ৪ অগস্ট মাদুরাইয়ে দেওয়া তাঁর ভাষণে সরাসরি অভিযোগ ছিল, “বেসরকারি উদ্যোগ আমাকে ব্যর্থ করেছে।” তাঁর দাবি ছিল, দেশীয় বেসরকারি ক্ষেত্র কোনও উদ্যম দেখাতে পারছে না।
কিন্তু এই অভিযোগ কি সত্যিই যথার্থ? অতীত ঘাঁটলে বোঝা যাবে ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় শিল্পোদ্যোগীদের জন্য পরিবেশ ছিল প্রতিকূল। শুল্ক, পরিবহন নীতি, রেল ভাড়ার হার, সবই ছিল বিদেশি ব্যবসায়ীদের স্বার্থে তৈরি। এরপরও যদি কেউ ভারতকে শিল্প মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করে, সে কৃতিত্ব বেসরকারি উদ্যোগেরই।
মাত্র কয়েক দশক আগেও ভারত বছরে ৬০ কোটি টাকার কাপড় আমদানি করত। আজ সেই ভারত বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে কাপড় রফতানি করে। ল্যাঙ্কাশায়ার আর জাপানের মতো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেও ভারতীয় টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি টিকে আছে, এটাই প্রমাণ করে এর দক্ষতা।
জামশেদজি টাটা (Jamsetji Tata) যখন ভারতের প্রথম স্টিল প্ল্যান্ট (Steel Plant) স্থাপনের কথা বলেন, তখন এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, “ভারতে যদি স্টিল তৈরি হয়, আমি সবটা খেয়ে ফেলব!” আজ টাটা স্টিল এশিয়ার অন্যতম বড় স্টিল প্রস্তুতকারী সংস্থা। আর সেই ব্রিটিশ ব্যবসায়ীর উক্তি ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে শুধুই ব্যঙ্গাত্মক এক স্মারক হয়ে।
মুম্বইয়ের হাউজিং আর মিল মালিকদের বিদ্যুৎ জোগানোর দায়িত্বও নিয়েছিল বেসরকারি উদ্যোগ। আজ সেটাই শহরের শিল্পজীবনের মেরুদণ্ড। একইভাবে শিপিং ইন্ডাস্ট্রিও দাঁড় করিয়েছেন নরোত্তম মোরাজি ও ওয়ালচাঁদ হিরাচাঁদের মতো বেসরকারি উদ্যোক্তারা।
১৯৪৪ সালেই সাতজন দেশীয় ব্যবসায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান প্রস্তাব করেন। যা প্রমাণ করে, তাঁরা কেবল মুনাফা নয়, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েঅ চিন্তিত।
স্বাধীনতার পরে, সরকারি হস্তক্ষেপে শিল্পোন্নয়নে নতুন গতি এলেও বেসরকারি ক্ষেত্র তাতে সমান সঙ্গত করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৪৬ সালে শিল্প উৎপাদন যেখানে ১০০ ছিল, তা ১৯৫৫ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ১৬১.৫-এ।
অর্থনীতিতে এক অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি হয়েছিল সরকারের নীতির কারণে। জাতীয়করণ, লাইসেন্স রাজ, আরোপিত নিয়মাবলী, সব মিলিয়ে পুঁজি বিনিয়োগে নিরুৎসাহ তৈরি হয়। ইম্পিরিয়াল ব্যাংক ও লাইফ ইন্স্যুরেন্সের জাতীয়করণ সেই আঘাতকে আরও তীব্র করে।
বিশ্ব ব্যাঙ্কের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইউজিন ব্ল্যাক ভারত সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন, “Give private enterprise every encouragement to make its maximum contribution.” অর্থাৎ, বেসরকারি উদ্যোগগুলিকে সর্বোচ্চ অবদান রাখার জন্য সকল প্রকার উৎসাহ প্রদান করুন। তাঁর মতে, ভারত বেসরকারি ক্ষেত্রের সক্ষমতা অবমূল্যায়ন করছে, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিচ্ছে।