পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকের গোড়া পর্যন্ত লেখা নির্বাচিত গল্প, ‘বেহুলার ভেলা’-র প্রায় সমস্ত গল্প এবং ‘চতুর্থ সীমানা’-র কিছু গল্পে মতি নন্দী কালোবাজারি এবং অর্থনৈতিক মন্দায় বেঁকেচুরে যাওয়া মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবার ও সেই পরিবারের রোজগেরে সদস্য--কেরানি চরিত্রের ওপর আলো ফেলেছেন।

মতি নন্দী
শেষ আপডেট: 10 July 2025 16:51
মতি নন্দীর গল্প বাঙালি মধ্যবিত্ত কেরানি শ্রেণির স্বরূপ—তাদের হতাশা, বঞ্চনা, জীবনযাপনের কৃত্রিমতার স্বচ্ছ আয়নার মতো। লেখকের নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ বিচার ও বিশ্লেষণ এই চরিত্রগুলির নির্মাণে সহজেই ধরা পড়ে।
‘দ্বাদশব্যক্তি’ উপন্যাসে মতি নন্দী তারক সিংহ নামক এক আইএ পাস নগণ্য কেরানির চরিত্র তুলে ধরেছিলেন। এর অনুপ্রেরণার বিষয়ে বলেতে গিয়ে লেখক যা জানান, তা আমাদের আলোচনার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হবে। তিনি মন্তব্য করেন—“আমি তারক সিংহ নই। কিন্তু ওর ভাবনা চিন্তায় আমি আছি। ওকে বানিয়েছি সম্পূর্ণতই কল্পনার দ্বারা। আশেপাশে দেখা বা মেশা মানুষদের আদল থেকে ও তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞতার পাল্লার মধ্যে ওকে শক্ত করে ধরে রেখেছি। আমার সব লেখার চরিত্রকেই তাই করি।... আমার কাছ থেকে ও আর যেটুকু পেয়েছে তা হল, আমার প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব এবং উত্তর কলকাতার যে পাড়ায় বংশানুক্রমে প্রায় একশো বছর আছি সেই পরিবেশ।” ('দ্বাদশব্যক্তি', মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতা, দীপ প্রকাশন, ২০১৬, পৃষ্ঠা-vii)।
বস্তুত, শুধু তারক সিংহ নয়, 'জীবনযাপন প্রণালী' গল্পের প্রদ্যোত কিংবা 'পাষাণভারে'র অনিল—এরা প্রত্যেকেই মতি নন্দীর বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল। চরিত্রের খুঁটিনাটি, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, চাকরিস্থলে এরা কেমন সম্মান ও সহযোগিতা পায়, পরিবারে আর পাঁচটা সদস্য কোন্ চোখে দেখে—এমন নানান বিষয় তিনি খোলা চোখে দেখেছিলেন। আর দেখতে দেখতে লেখক উপলব্ধি করেন, এই ছাপোষা মধ্যবিত্ত কেরানিকুলের জীবনদর্শন মোটেই সহজ ও স্বাভাবিক নয়। তাদের ছকেবাঁধা জীবনচর্যার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে গভীর নৈরাশ্য। চরিত্রগুলির আচরণ, তাদের সূক্ষ্ম চিন্তাভাবনা কিংবা প্রত্যক্ষ উক্তিতে সেই বোধকে উপস্থাপিত করেছেন তাঁর লেখা একাধিক গল্পে। সেই আলোচনায় প্রবেশ করার আগে সংক্ষেপে মধ্যবিত্ত কেরানি সম্প্রদায়ের হতাশার প্রসঙ্গটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি বিচার করব।
আমরা জানি বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আশি বছরের মধ্যে। এই সময় জমিদার শ্রেণি এবং সাধারণ প্রজাদের মধ্যবর্তী স্তর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে 'মধ্যস্বত্বভোগী' নামক একটি সম্প্রদায়। কালক্রমে এর-ই রূপ বদলে তৈরি সম্পন্ন চাষি থেকে ক্ষুদ্র গাঁতিদার কিংবা জমিদার, দারোগাবাবু থেকে তাঁর সেপাই-সামন্ত অধ্যুষিত 'গ্রাম্য মধ্যশ্রেণি'। তখনও শহরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি জন্ম নেয়নি; গ্রামেও এদের সংখ্যা তেমন কিছু উল্লেখযোগ্য ছিল না। ১৮২৯ সালে ‘বঙ্গদূত’ পত্রিকা জানায়—''গৌড়রাজ্যের মধ্যবিত্ত অবস্থাবস্থিত প্রজাসমস্ত যেরূপ সুস্থ সন্তুষ্ট এরূপ অন্যত্র কুত্রাপি দৃষ্টচর নহে।'' (‘গৌড়দেশের শ্রীবৃদ্ধি’, ‘বঙ্গদূত’, ১৩ জুন, ১৮২৯)।
কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ফলে অবস্থা ধীরে ধীরে পাল্টে যায়। নাগরিক প্রভাব গ্রামীণ কাঠামোকে প্রভাবিত করে। নগদ টাকা ও বাণিজ্যিক মুনাফালাভের লোভ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও 'শহুরে ভদ্রলোক' তকমালাভের অদম্য আকর্ষণ—সর্বোপরি নানাবিধ চাকুরির সুযোগ গ্রামীণ মধ্যশ্রেণিকে নগরাভিমুখি করে। বাণিজ্য ও প্রশাসননির্ভর কলকাতার কর্মজগতে নানাবিধ সদাগরি ও বেসরকারি অফিসকাছারিতে 'writer', 'clerk', 'copyist' ইত্যাদি বহুবিধ নামে অভিহিত মধ্যবিত্ত কেরানিকুলের একটি বিশিষ্ট মূর্তি গড়ে ওঠে… বহু যুগ পেরিয়ে এখনও যে শ্রেণির চরিত্রের মৌল লক্ষণগুলি বদলায়নি। এই সম্প্রদায়ভুক্ত সামান্য উচ্চস্তরের কর্মী, 'সরকারবাবু' নামে যাঁরা পরিচিত ছিলেন, তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে প্রাবন্ধিক বিনয় ঘোষের নীচের মন্তব্যকে আমরা সাম্প্রতিক সময়ে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজেরই অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি:
''সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হল উমেদারি ও মোসাহেবিকে চারুকলার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। যিনি তা পারেন তিনি কৃতী তো বটেই, মনিবের কাছেও অপরিহার্য হয়ে ওঠেন। সরকার-চরিত্রের এই গুণটি পরবর্তীকালে মধ্যবিত্ত বাঙালি চরিত্রের একটি বিশিষ্ট উপাদানে পরিণত হয়েছে।'' ('বাঙালি মধ্যবিত্তশ্রেণি', বিনয় ঘোষ, বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা, কলকাতা, প্রকাশ ভবন, ২০০৯, পৃষ্ঠা-১৭৭-১৭৮)।

সুতরাং, বাঙালি কেরানিসমাজের বাহ্যিক দিক দিয়ে একটি স্থির, অনড়, অপরিবর্তনীয় ও পরিচিত রূপ উনিশ শতকেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই স্থবির জীবনে প্রবল আঘাত নেমে আসে বিশ শতকে। উপর্যুপরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কালোবাজারি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ, বঙ্গবিভাগজনিত কারণে বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু মানুষের আগমন এবং এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় মুদ্রাস্ফীতি, বেকারের সংখ্যাবৃদ্ধি বাঙালি মধ্যবিত্তের চিরাচরিত মূল্যবোধ, নীতিবোধ ও বিশ্বাসবোধকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। তিরিশের দশকে অর্থনৈতিক মন্দা, অসহযোগ আন্দোলনের ব্যর্থতা বাঙালিকে সচকিত করেছিল। সে আহত হলেও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বিষয়ে আশাবাদী ছিল। কিন্তু বহু আকাঙ্ক্ষার স্বাধীনতা অর্জিত হলেও দেশভাগ ও বঙ্গবিভাজন বাঙালির মনে আশাভঙ্গের বেদনা সঞ্চারিত করে। রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়, জাতীয় শোক বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে জীবনের উদ্দেশ্য, ভবিষ্যৎ তথা অস্তিত্বের অসাড়তায় বিশ্বাসী করে তোলে। কেরানি সম্প্রদায়ের যান্ত্রিক জীবনযাত্রায় উদ্দেশ্যহীনতা ও নৈরাশ্যের যন্ত্রণার নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।
এখন মতি নন্দীর কিছু নির্বাচিত গল্পে কেরানি চরিত্রের এই অবসাদ ও নৈরাশ্যগ্রস্ত চেহারা কীভাবে ফুটে উঠেছে, আমরা সেই আলোচনায় প্রবেশ করব।
১৯৫৯-১৯৭০—এই কালপর্বে লেখা গল্প 'জীবনযাপন প্রণালী'। গল্পের নামে 'প্রণালী' শব্দটুকু বুঝিয়ে দেয় জীবন অতিবাহন গল্পের নায়কের কাছে কতটা কৃত্রিম। ছন্দোবদ্ধরূপে নয়, বিধিবদ্ধ একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে তার জীবন চালিত হয়। গল্পের শুরুতেই প্রদ্যোত তার অফিসে এসে সহকর্মীদের চোখেমুখে চাপা আতঙ্ক আর উত্তেজনার ছাপ দেখে সম্ভাব্য যাবতীয় দুশ্চিন্তা করতে আরম্ভ করে। কিন্তু যখন জানতে পারে নীচুতলার কর্মী মৃত্যুঞ্জয় লটারিতে সেকেন্ড প্রাইজ বাবদ চল্লিশ হাজার টাকা পেয়ে চাকরি ছেড়ে বাকি জীবন 'বিশ্রামের' পরিকল্পনা করেছে, তখন অর্থের মোহ নয়, প্রদ্যোতকে বিদ্ধ করে মৃত্যুঞ্জয়ের মতো যন্ত্রচালিত জীবন থেকে মুক্ত হয়ে ঝাড়া হাত পায়ে দিনকাটানোর বাসনা। মৃত্যুঞ্জয়কে ঈর্ষা করতে থাকে সে হঠাৎ বড়োলোক হল এই ভেবে নয়, বরং এই হাঁফ ধরা জীবন থেকে যে সে পরিত্রাণ পাবে সেটা চিন্তা করে--''এই প্রথম সে ঈর্ষা করতে শুরু করেছে মৃত্যুঞ্জয়কে অতগুলো টাকা পাওয়ার জন্য। এখন তার মনে হচ্ছে, এতদিন ধরে রুটিনমাফিক, যন্ত্রের মতো শুধু খেটেই চলেছি। আরও অনেক বছর ধরে তাকে খেটেই যেতে হবে। অথচ এই লোকটা কেমন রেহাই পেয়ে গেল।'' ('জীবনযাপন প্রণালী', মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতা: দীপ প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা-৫০)।
এর প্রতিক্রিয়ায় রাস্তার ভিড়, বাস-ট্যাক্সির গর্জনে মৃত্যুঞ্জয় 'বিশ্রাম লোলুপতার এবং বিরক্তির ঊর্ধ্বশ্বাস গমনাগমন' খুঁজে পায়, বাড়ি ফিরে ছেলেকে অংক শেখাতে গিয়ে সে ক্লান্ত বোধ করে এবং রাতে স্ত্রীর পাশে শুয়ে উপলব্ধি করে--''একমাত্র নিঃসঙ্গতা ছাড়া বিশ্রাম বোধ হয় পাওয়া সম্ভব নয়।'' ('জীবনযাপন প্রণালী', মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতা: দীপ প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা-৫০)।

প্রথমে মৃত্যুঞ্জয় লটারির কেটে অনেক টাকা হাতে পেয়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকে, তা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তর্ক-বিতর্কও করে। পরে তার 'ইচ্ছে করে' তক্ষুনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার 'সাহস দেখাতে'। কিন্তু মধ্যবিত্তের পিছুটান, অবসাদ তাকে নিরস্ত করে। মৃত্যুঞ্জয় চাকরি ছাড়ে না। লটারিতে কোনো পুরস্কারও সে পায় না। বদলে এই যান্ত্রিক জীবনকেই নিজের ভবিতব্য মনে করে সে দ্বিতীয়বারের জন্য লটারির টিকিট কাটে এবং খুশিরামকে নির্দেশ দেয়—“দু-তিন মাস পর ড্রয়িং হবে এমন কিছু থাকে তো দাও।'' (‘জীবনযাপন প্রণালী’, মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতাঃ দীপ প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা - ৫২ )। প্রতীক্ষাকে বিলম্বিত করার মাধ্যমে নিজের হতাশা আর ক্লান্তিকে অবদমিত করে রাখার এ এক দুর্মর প্রয়াস। চিরস্থায়ী সুখের সন্ধান মৃত্যুঞ্জয় পায় না; স্বল্পমেয়াদী আশা-আকাঙ্ক্ষার উত্তেজনা থেকেই সে বেঁচে থাকার রসদ শুঁষে নিতে চায়।
বিশ্বযুদ্ধোত্তর ধনতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় বাঙালি মধ্যবিত্তের নীতি, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রমাণ 'পাষাণভার' গল্পে অনিলের চরিত্রে প্রকাশিত। ভিড় ট্রামে তার কথা শুনে একটু নেমে দাঁড়াতে গিয়ে এক অফিসযাত্রী রাস্তায় ছিটকে পড়ে এবং দুর্ঘটনায় মারা যায়। এরপর শুরু হয় অনিলের মানসিক টানাপড়েন। এই মৃত্যুর কারণ হিসেবে সে নিজেকে প্রত্যক্ষত দায়ী করতে থাকে এবং হয় আত্মহত্যা নচেৎ অপরাধ কবুল--সমাধানের এই দুই সম্ভাবনায় এসে থিতু হয়। কিন্তু সেটুকু করতেও যে পরিমাণ উদ্যম প্রয়োজন, অনিলের মধ্যে সেটুকুও যেন অবশিষ্ট ছিল না। বছর পঁয়ত্রিশের বি এ পাস করা শিক্ষিত কেরানি যুবক অনিল প্রেম ভেঙে যাওয়ার পর নিজ উদ্যোগে চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়া এবং চাকরির দরখাস্ত পাঠানো ছাড়া আর কিছুই করেনি। সে অবিবাহিত এবং আখ্যানের সর্বজ্ঞকথকের মন্তব্য, ''বোধহয় বিবাহ করবে না।'' অনিলের এই নিঃসঙ্গ জীবনে পাপবোধের পিছুটান পাষাণভারের মতো চেপে বসে। সস্তার টিকিট কেটে ফিল্ম দেখে সে এই মানসিক যন্ত্রণা নিষ্কৃতি পেতে চায়, কিন্তু ব্যর্থ হয়।
আসলে একজন নিরপরাধ সহনাগরিকের অকালমৃত্যুর বেদনা নয়, অনিলের মনে প্রবল হয়ে ওঠে অপরাধবোধের যন্ত্রণা। তাই পরদিন ট্রামে এক যাত্রীকে দুর্ঘটনার কথা বলার পর সে যখন অনিল নয়, মনে মনে 'আত্মহত্যার মতলব' আঁটা সেই ব্যক্তিকেই প্রকৃত দোষী হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন তা সত্যি নয় জেনেও অনিল স্বস্তি অনুভব করে। যান্ত্রিক নগরজীবনে মানবিকতা, নৈতিকতা এমনকি পাপবোধ যে কতোটা স্বল্পস্থায়ী তার প্রমাণ এই গল্প।
'বেহুলার ভেলা' গল্পে নিম্নমধ্যবিত্ত চাকুরীজীবী প্রমথর বাস উত্তর কলকাতার শোভাবাজার সংলগ্ন অঞ্চলের একটি গলিতে। মাসের শেষ শনিবার মাংস তার পকেট খালি থাকলেও সে 'সোনা ওজন করার ভঙ্গীতে' তিন পোয়া মাংস কিনে আনে। পরিবারে উৎসবের মেজাজ তৈরি হয়, তার পুত্র-কন্যার চোখগুলো তাকে 'বরফ - কুচির মতো ঝিকিয়ে জুড়িয়ে' দেয়। সে তৃপ্তি লাভ করে, কারণ 'এটুকুই সে চেয়েছিল'। কিন্তু প্রণবের এই সামান্য চাওয়াটুকুও অপূর্ণ রয়ে যায়। গল্পকার দেখান একদিকে সুস্বাদু মাংস রান্নার খোশবাই গন্ধ ভেসে এলেও তা প্রণবকে তার সামনের ঘটমান বাস্তব দুর্দশাকে ভুলতে দেয় না। আর্থিক সংকট, আইবুড়ো মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তা, উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলের শারীরিক ক্লেশ উপেক্ষা করে টাকা রোজগারের উদ্দেশ্যে এখানে-ওখানে খেলে বেড়ানো দেখে অনিবার্যভাবে প্রমথর মনে হয়--''জীবনটা যেন ডালভাত হয়ে গেছে। ওঠানামা নেই, স্বাদগন্ধ নেই, কিছু নেই, তবু কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। আশ্চর্য এই ভোঁতার মতো বেঁচে থাকাটাও একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। বদ অভ্যাস।'' (‘বেহুলার ভেলা', মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতাঃ দীপ প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা-১০৩)। এই যান্ত্রিক অনুবর্তন গল্পের ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গভীরতর নৈরাশ্যে দানা বাঁধে যখন ছাদে উঠে, তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে প্রণব তার স্ত্রী অমিয়ার পিঠে হাত রেখে, 'খসখসে চামড়া' আর 'ঝুলে পড়া মাংসের' স্পর্শ পেয়ে মন্তব্য করে--''অমি, এখন একটা মড়া আগলে বসে থাকা ছাড়া আর আমাদের কাজ নেই।'' (‘বেহুলার ভেলা’, মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতাঃ দীপ প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা - ১১৪ )।

ঠিক একইভাবে মৃত সম্পর্ককে বয়ে বেড়ানোর কথা উঠে আসে 'দুর্ঘটনা' গল্পে পেশায় স্কুলশিক্ষক অশোকের আত্মজিজ্ঞাসায়। পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য সে। আয় সামান্য। বাড়তি উপার্জনের জন্য যে টিউশানি পড়ায়, কোচিং শুরু করার পরিকল্পনা করে। কিন্তু একদিন স্কুল থেকে ফিরতি পথে বিত্তবান বন্ধু সুকুমারের সঙ্গে আলাপের পর ''অশোক নিজের হাঁটাটাই ক্লান্তিকর বোধ করল। এবার টিউশ্যনি তারপর বাড়ি। দুই বোন আর মা। আধময়লা জামাকাপড়ের গন্ধ, আরশোলা ওড়ার শব্দ।'' (‘দুর্ঘটনা’, মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতাঃ দীপ প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা - ১৫৪)। অশোকের রোজ মনে হয় পরিবারের সকলের ''ভবিষ্যৎকে জীইয়ে রাখার সামর্থ্য তার কতটুকুই বা। বর্তমানকেই বা কতটুকু পারছে।'' ('দুর্ঘটনা', মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতাঃ দীপ প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা - ১৫৪)। হৃদয়ের উত্তাপ নেই, কর্তব্য সম্পাদনের দায়ভার মেটাতেই যেন খেটে চলেছে সে। নাগরিক যন্ত্রণার একটি বাস্তব রূপ প্রকাশিত হয় এই গল্পে।
প্রকৃতপক্ষে ধনতান্ত্রিক সমাজে সমাজের সর্বস্তরের কর্মরত মানুষদের মধ্যে আত্মবিচ্ছেদবোধ প্রকট হয়ে ওঠে। আধুনিক যন্ত্রসভ্যতায় তারা নিছক বস্তু বা উপযন্ত্র মাত্র। দাসত্ববোধটুকুও তাদের মধ্যে থেকে লুপ্ত হয়ে যায়। এই থেকেই আত্মবিচ্ছেদের সমস্যা জন্ম নেয়। কৃত্রিম জীবনাচরণের সূত্রপাতও হয় এখান থেকেই। ষাটের দশকেই সমাজবিজ্ঞানীর চোখে - ''যন্ত্রী যদি যন্ত্রের ব্যবহার না করে তাহলে যন্ত্রে মরচে ধরে যায় এবং তাতে আর কোনো কাজ হয় না। ধনতান্ত্রিক মহানগরের মানুষের কাছে হৃদয় পরিত্যক্ত।...বোদ্লেয়ার যা তাঁর 'জর্নলে' 'The cheapening of hearts' বলেছেন তা যদি আজকের মনোপলি টেকনোলজির ভোগের স্বর্গে দেখতেন তাহলে আরও অনেক বেশি অবাক হয়ে বিলাপ করতেন।'' (‘মেট্রোপলিটন মন’, বিনয় ঘোষ, মেট্রোপলিটন মন মধ্যবিত্ত বিদ্রোহ, কলকাতাঃ ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান, ২০০৯, পৃষ্ঠা - ৫০)। মতি নন্দীর গল্পের কেরানি চরিত্রেরা এই ভোগের স্বর্গ থেকেও নির্বাসিত। আবার পরিবার, সমাজের মধ্যে থেকেও তারা পরিবারবিচ্ছিন্ন, সমাজবিচ্ছিন্ন--সর্বোপরি আত্মবিচ্ছিন্ন এককের মতো শহরে বাস করে।
'কালপ্রিট' গল্পে একাকীত্বের কষ্ট আরও গভীর ও শৈল্পিক আকারে ব্যক্ত হয়েছে। সরকারি অফিসের তরুণ, 'সুদক্ষ' ও 'কর্মঠ' করণিক গুরুদাস কর্মস্থলে এসে একটি উড়ো চিঠি পায়, যেখানে পত্রপ্রেরক জানান যে, গুরুদাসের মধ্যে তিনি নিঃসঙ্গতা ও চাপা দুঃখের ছাপ দেখতে পান। তিনি নিজেও দুঃখী ও নিঃসঙ্গ। পরিশেষে তার জিজ্ঞাসা - ''তাই কি তোমায় জানতে আমার এত ইচ্ছে করে?'' বিহ্বলিত গুরুদাস স্থির সিদ্ধান্তে আসে, এই কাজ নিশ্চিতভাবে কোনও মহিলা সহকর্মীর এবং পুলকিত হয়ে এরপর সে পত্রদাতাকে খোঁজা শুরু করে। গল্পে বারংবার উল্লিখিত হয় দুটি শব্দ--'চাপা দুঃখ' এবং 'নিঃসঙ্গতা'। গুরুদাস অফিসের বাকি মহিলা কর্মীদের জীবনযাত্রা ও চরিত্র দিয়ে বিচার করতে চায় তাদের মধ্যে কে নিঃসঙ্গ ও দুঃখী হতে পারে। সম্ভাবনা থেকে বাদ দেয় কুশ্রী, বিগতযৌবনা প্রীতি দাশগুপ্তকে আর ভুলে যায় আরেকটি গুরুতর প্রশ্নকে খুঁজতে--''সে নিজে কি নিঃসঙ্গ ও দুঃখী নয়?'' গল্পের শেষে ট্রামস্টপে দাঁড়ানো প্রীতি দাশগুপ্তের 'বিষণ্ণ চাহনি' দেখে তার আত্ম-উপলব্ধি হয় এবং আপনমনে উচ্চারণ করে--''আমরা কেউ একজন ঠকলাম।''

গল্পে মৃদু রঙ্গ-রসিকতার আড়ালে আসলে শহুরে কর্মী মধ্যবিত্তের নিঃসঙ্গতা এবং আত্মবিস্মৃতির ঘেরাটোপে নিঃসঙ্গতার বোধকেও ভুলে থাকার প্রসঙ্গটি ব্যক্ত হয়েছে।
ষাট-সত্তরের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমিতে লেখা গল্প 'সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব'। উদয় বসাক ঘটমান বর্তমানে বিশ্বাসী ভীরু স্বভাবের কেরানি--অতীত যাকে তাড়িত করে না, ভবিষ্যতের কথা ভেবেও যে উদ্বেলিত হয় না। চরিত্রের নাম গল্পের শিরোনামের সাপেক্ষে শ্লেষাত্মক। 'দুর্ঘটনা' গল্পে অশোক যেমন ফুর্তিবাজ, জীবন সম্পর্কে দুশ্চিন্তামুক্ত সুকুমারকে দেখে ঈর্ষান্বিত হয়, আলোচ্য গল্পে সম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী রঞ্জিত কর-কে দেখে উদয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অফিসের পর গঙ্গার ধারে বসে সূর্যাস্তের দিকে চেয়ে সে নিঃসঙ্গ বোধ করে। 'ব্যস্ত থাকার মতো কিছুই আর নেই' বলে তার মনে হয়। 'স্ত্রী সন্তান পরিবার আর চাকরি' তার কাছে সেই মুহূর্তে 'একঘেঁয়ে অপ্রয়োজনের' হয়ে ওঠে। এমনকি টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় খেলতে নেমে ম্যাচের এক তুঙ্গ মুহূর্তে উদয়ের মনে হয়--''সে বড়ো একা। সূর্যাস্তের সামনে একা দাঁড়িয়ে। কোনো শব্দ কোনো বর্ণ, কোনো স্পর্শ তার নাগালের মধ্যে নেই।'' (‘সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব’, মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতাঃ দীপ প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা - ১৯৭)। রঞ্জিত ঘোষ একদিকে যেমন নিজের মতো করে জীবনকে উপভোগ করে--শুচিতা, মূল্যবোধের পিছুটান তাকে বিব্রত করতে পারে না, তেমনি অন্যদিকে পাড়ার মাস্তানদের সঙ্গে 'কম্প্রোমাইজের' পথে না হেঁটে তাদের বিরুদ্ধে লড়ে মারাও যায়। নৈতিকতা এবং ভীরুতা--এই দ্বিমুখী শক্তির টানে উদয় না পারে মনের অবদমিত ইচ্ছেগুলো পূরণ করতে, না পারে প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে। গল্পের শেষ দৃশ্যটি সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ—
''অফিস থেকে বেরিয়ে মন্থরভাবে হেঁটে উদয় গঙ্গার ধারে এল। দরদর করে সে ঘামছে।...গাছের ছায়া-পাওয়া একটা বেঞ্চে বসে সে ঝিরঝির হাওয়ায় চোখ বন্ধ করে আরামে ‘আহ্’ বলে উঠল। কিছুক্ষণ পর সে বেঞ্চে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।'' (‘সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব’, মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতাঃ দীপ প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা - ১৯৮)।
আধুনিক মধ্যবিত্ত কেরানি চরিত্রে এই নির্বিকারত্ব যুগের অন্যতম লক্ষণ। কোনো কিছুতেই তাদের কিছু যায় আসে না। বিকারগ্রস্ত জনতার ঠিক বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকে উদয়ের মতো এমন কিছু মানুষ, যারা সতত পালিয়ে বাঁচতে চায়। জনতার বাইরে এসে দাঁড়ালেই তারা ভয়ংকর নির্জন, নিঃসঙ্গ। জর্জ সিমেল আধুনিক নাগরিক মানুষের এই বিশেষত্বকেই 'blase attitude' বলে চিহ্নিত করেছেন। উদয় কিংবা অশোকের মতো মধ্যবিত্ত কেরানিরা মহানগরের বিপুল ভোগ্যপণ্যের কেনাবেচায়, উত্তেজনার আসরে নিজেদের ভাসিয়ে দিতে পারে না। আবার এর বিকল্প কোনো সামাজিক সংসর্গে নিজেদের যুক্ত করতেও অসমর্থ হয়। মধ্যবিত্তের মস্তিষ্কের এই বন্ধ্যাত্ব দেখেই বিনয় ঘোষ যথাযথ মন্তব্য করেছিলেন--''নার্ভে যখন কারেন্ট থাকেনা তখন একটা মাংসের ডেলার মতো আমরা গড়িয়ে গড়িয়ে চলি যেমন মোটর চলে ট্রাক চলে টেম্পো চলে স্কুটার চলে। খুব ব্যস্ত হয়ে সকলে ছোটাছুটি করি। ব্যস্ততার চেতনা ছাড়া বাকি সব চৈতন্য উধাও।...প্রতিদিন জীবনের এই স্রোত বইতে থাকে, একঘেয়ে একটানা স্রোত, একশব্দ একসুর একতান একতাল একছন্দ।'' ( 'মেট্রোপলিটন মন', বিনয় ঘোষ, মেট্রোপলিটন মন মধ্যবিত্ত বিদ্রোহ, কলকাতাঃ ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান, ২০০৯, পৃষ্ঠা - ৪৯)।

এরকমই একলয়ে বয়ে চলা বদ্ধ, আঁটসাঁট জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে 'কামরার মধ্যে' গল্পে। হিসেব, যুক্তিকে আশ্রয় করে গল্পের চরিত্র অতুলকে মাপা জীবনযাপন করতে হয়। অতুল স্বভাবভীরু, স্ত্রী-নিয়ন্ত্রিত চরিত্র। শহরতলিতে সস্তার ভাড়াবাড়িতে দম্পতি বাস করে। অতুল প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাগজওয়ালার থেকে খবরের কাগজ কিনে স্টেশনে এসে ট্রেনের একটি নির্দিষ্ট কামরাতেই ওঠে। এই নিত্যনৈমিত্তিক, একঘেঁয়ে জীবনে স্ত্রীর অজ্ঞাতসারে সে ট্রেনের সহযাত্রী এক যুবতী মেয়ের প্রতি আসক্ত হয়, কিন্তু মুখ ফুটে কথা বলার সাহস হয় না। অন্যান্য বিষয়গুলোর মতো এটাও তার কাছে অভ্যাস। কিন্তু পার্থক্য এই, যে, এই অভ্যাসটির বিষয়ে সে সচেতন। ভালোবাসার কথা বললে ঠিক কী কী দুর্যোগ ও কেলেঙ্কারি ঘটতে পারে সেটা চিন্তা করেও অতুল শুরুতে এগিয়ে যায় কিন্তু শেষমেশ পিছিয়ে আসে এবং চলন্ত ট্রেনে আপনমনে সজোরে হেসে ওঠে। তা দেখে মেয়েটিও হেসে ফেলে এবং 'ট্রেনের দোলায় ঝিমোতে ঝিমোতে' অতুলের মনে হয়, ''...কোনোদিনই নয়। আমি কোনোদিনই পারব না আমার এই হাসিটার হাত থেকে রেহাই পেতে।'' (‘কামরার মধ্যে’, মতি নন্দী, ছোটোগল্প সমগ্র, কলকাতাঃ দীপ প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা - ২৩০ )।
'জীবনযাপন প্রণালী' গল্পে প্রদ্যোত যেমন দেরি করে ড্র হবে এমন লটারির টিকিট বেছে নিয়ে আশায়-উত্তেজনায় দিনগুজরান করে সুখ খুঁজে নিতে চায়, এই গল্পের অতুলও একইভাবে নিত্যনৈমিত্তিক সুখকর অভ্যাসটি থেকে নিজেকে সরিয়ে না এনে দিন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। লক্ষ্যণীয় বিষয়, দুজনের কেউই প্রাত্যহিক জীবনচর্যার মৌলিক পরিবর্তন করে না। যেভাবে আগে বইছিল, সেভাবেই জীবন বইতে থাকে; তার আমূল বাঁকবদল, যা তাদের আকাঙ্ক্ষার, তা ঘটানোর ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। প্রদ্যোত কিংবা অতুল বিবর্ণ জীবনকে মেনে নিয়ে তার মধ্যে সুখকে খোঁজে।
পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকের গোড়া পর্যন্ত লেখা নির্বাচিত গল্প, ‘বেহুলার ভেলা’-র প্রায় সমস্ত গল্প এবং ‘চতুর্থ সীমানা’-র কিছু গল্পে মতি নন্দী কালোবাজারি এবং অর্থনৈতিক মন্দায় বেঁকেচুরে যাওয়া মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবার ও সেই পরিবারের রোজগেরে সদস্য--কেরানি চরিত্রের ওপর আলো ফেলেছেন। চরিত্রগুলি যৎসামান্য আয়ে সংসারের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে চাওয়ার চেষ্টায় হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতার গভীরে তলিয়ে গিয়ে নিজেদের আত্মিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
গল্পকার যে ছবি তুলে ধরেছেন তা একেবারেই যুগসম্মত। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে মুদ্রাস্ফীতি, বেতনবৃদ্ধি, ভাতাবৃদ্ধি এবং অত্যাবশ্যক খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদনহ্রাসের ফলে ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির চক্রে সাধারণ মধ্যবিত্ত কেরানিকুলের অবস্থা শোচনীয় রূপ ধারণ করেছিল। এর অনিবার্য প্রতিক্রিয়ার কথা বিনয় ঘোষ ১৯৭১ সালে লেখা 'কলকাতার সমাজ' প্রবন্ধে তুলে ধরেছিলেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন—“বিপুল নিম্নমধ্যবিত্তশ্রেণি ('লোয়ার মিড্ল'), যাঁরা ভদ্রলোক-শ্রেণিবাচ্য, তাঁরা ক্রমে নিম্নগামী হবার ফলে কিছুতেই আর তাঁদের ভদ্রলোকত্ব বজায় রাখতে পারছেন না। তাঁরাও জীবন-সংগ্রামের এই চক্রবৎ আবর্তনে ঘুরপাক খাচ্ছেন এবং এই আবর্তনের যেন শেষ নেই মনে হচ্ছে। নিম্নমধ্যবিত্তের বিশাল স্তর টুকরো টুকরো হয়ে ধসে পড়ছে এবং মহানগরের পাতালে অবস্থিত সুবিস্তৃত-সমাজের অন্ধকারে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তার ফলে পূর্বোক্ত 'নাগরিক জঙ্গল' যেমন প্রসারিত ও ঘনীভূত হচ্ছে, তেমনি 'নাগরিক গ্রামাঞ্চলের'-ও ক্রমবিস্তার হচ্ছে।'' ('মেট্রোপলিটন মন', বিনয় ঘোষ, মেট্রোপলিটন মন মধ্যবিত্ত বিদ্রোহ, কলকাতাঃ ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান, ২০০৯, পৃষ্ঠা-২১১)। অর্থ সংরক্ষণের তাগিদে তার বাস কখনও শহরতলিতে সম্প্রসারিত হয়েছে, কখনও তারা যৌথ পরিবার সংসার থেকে আলাদা হয়ে বাঁচতে চেয়েছে, যদিও তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অর্থনৈতিক দুর্দশা, যার জেরে মধ্যবিত্ত কেরানিশ্রেণির আত্মিক জীবন কীভাবে বিপন্ন, বিবর্ণ হয়ে উঠেছিল, তার ছবি নির্মোহ ভঙ্গিমায় উপস্থিত করেছেন মতি নন্দী।