আড়াই বর্গকিলোমিটারের ধারাভি আজ মুম্বইয়ের এক বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি, যেখানে বছরে হাজার কোটির ব্যবসা ঘোরে।

ধারাভি
শেষ আপডেট: 22 February 2026 17:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুম্বইয়ের (Mumbai) ধারাভি (Dharavi) নিয়ে লেখা সহজ নয়। দারিদ্র্য, গ্ল্যামার, দুর্গন্ধ, ব্যবসা—সব একসঙ্গে থাকে এখানে। সরু গলি দিয়ে হাঁটলে অ্যাম্বুল্যান্স ঢুকতে পারে না। রোদও ঢোকে না অনেক ঘরে। তবু এখানেই বছরে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। বিশ্বব্যাংক (World Bank) ও ইউএন-হ্যাবিট্যাট (UN-Habitat)-এর অনুমান বলছে, ধারাভির বার্ষিক উৎপাদন ১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলার—ভারতীয় টাকায় প্রায় ৯,০০০ কোটির বেশি।
এখানকার বাসিন্দা রাজু হনুমন্ত (Raju Hanumanta), পেশায় প্লাম্বার, বলেন, ‘গাটার হ্যায়, পার সোনে কা হ্যায়।’ অর্থাৎ নর্দমা আছে, কিন্তু সোনা দিয়ে মোড়া।
ব্যবসা এত দামি কেন?
ধারাভি মাত্র ২.৩৯ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে। কিন্তু জনসংখ্যা প্রায় ১২ লক্ষ। বস্তির ভাড়া ১০০ বর্গফুট ঘরের জন্য ৩,০০০–৭,০০০ টাকা। কিন্তু বাণিজ্যিক ভাড়া? ছোট দোকান ১.৫ লক্ষ, বড় জায়গা ৫ লক্ষ টাকা মাসে।
এই অঙ্ক অবাক করে। কারণ এখানে নেই সুষ্ঠু নিকাশি, নেই ঠিকঠাক জল, নেই পুলিশ ভেরিফিকেশন। তবু ব্যবসা থামে না। ২০,০০০-রও বেশি ছোট ইউনিট—গার্মেন্টস, চামড়া, রিসাইক্লিং, খাবার—সব চলছে ১০০–১৫০ বর্গফুটে।
বলরুম নয়, ব্যান্ড্রা-কুরলা কমপ্লেক্স (Bandra-Kurla Complex বা BKC) নয়—ধারাভির এই মাইক্রো-ইকোসিস্টেমই মুম্বইকে চালায়।
চামড়ার বাজার: ২৫০ কোটির রাস্তা
ধারাভির কোলিওয়াড়া রোডে ৫০০ মিটারজুড়ে চামড়ার বাজার। ‘শেফার্ড লেদার গুডসে’র (Shepherd Leather Goods) কর্ণধার রাজু ভোইটে (Raju Bhoite) বলেন, এই বাজারের বার্ষিক ব্যবসা ২৫০ কোটি টাকা। ৫,০০০-রও বেশি ছোট কারখানা ব্যাগ, জ্যাকেট, ওয়ালেট বানায়। পণ্য যায় ইউরোপ-আমেরিকায়। কারিগররা ব্যাগপিছু ২০০–৩০০ টাকা লাভ করেন। কাঁচামাল আসে কানপুর ও চেন্নাই থেকে। মালিকদের দৈনিক লক্ষ্য ২০,০০০ টাকা বিক্রি। ছোটদের ৫,০০০। কিন্তু ভাড়া আকাশছোঁয়া। ৩০০ বর্গফুট দোকান ১.৫ লক্ষ। বড় জায়গা ৫ লক্ষ।
কারিগর সুনীল সোনাওয়ানে (Sunil Sonawane) বলেন, 'সরকার বদলেছে, কিন্তু সাহায্য আসেনি। যন্ত্র আর সহায়তা পেলে আমরা গুচ্চি-প্রাডার মতো কাজ করতে পারি।' সবকিছু ঠিক থাকলেও ভয় আছে। পুনর্গঠনের পরে যদি বাজার সরিয়ে দেওয়া হয়, পায়ের চলাচল কমবে, ব্যবসাও কমবে।
কুম্ভারওয়াড়া: মাটির গন্ধে হাজার কোটি
ধারাভির কুম্ভারওয়াড়া (Kumbharwada) এশিয়ার বৃহত্তম মৃৎশিল্প কেন্দ্র। গুজরাতের হাজারের বেশি পরিবার এখানে প্রদীপ, মাটির গ্লাস-থালা বানায়। গুড্ডু কালবাতে (Guddu Kalbate) বলেন, 'বার্ষিক ব্যবসা প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা।' বর্ষায় উৎপাদন কমে যায়। শুকোতে সময় লাগে। দীপাবলির সময় চাহিদা বাড়ে। কিন্তু ঝুঁকি বড়—টিনের চুল্লি থেকে ধোঁয়া। স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আর পরিকাঠামো পেলে চিকিৎসা খরচ কমত, বলেন কারিগররা।
ধারাভি একসময় তামিল বসতি ছিল। আজও ভোর ২.৩০-এ ইডলি বানানো শুরু হয়। কর্নাটকের শানাপ্পা (Shanappa) বলেন, 'এক ব্যাচে ১২০ ইডলি। তিন ব্যাচ বিক্রি হয়ে যায় ভোরের মধ্যেই। ছোট বিক্রেতারা সাইকেলে করে বান্দ্রা থেকে কান্দিভলি পর্যন্ত বিক্রি করেন। এই খাবারের ব্যবসার কোনও সরকারি হিসেব নেই। তবু শহর চলে এই সরবরাহে।'
আর আছে কাবাড়িওয়ালারা। ধারাভি প্রক্রিয়াজাত করে মুম্বইয়ের ৮০% কঠিন বর্জ্য—প্রায় ২০,০০০ টন প্রতিদিন। ২.৫ লক্ষ র্যাগপিকার ও স্ক্র্যাপ ডিলার প্লাস্টিক বাছাই করে, কেটে, শুকিয়ে শিল্পে ফেরত দেয়। ভকিল আলম (Vakil Aalam) বলেন, 'ছেলেরা খালি হাতে কাজ করে। সুচ ফুটে যায়, লোহা কেটে দেয়। তবু দিনে ১,০০০–৪,০০০ টাকা রোজগার হয়।'
পুরনো জিন্স ধুয়ে ব্যাগ বানায় ছোট ইউনিট। এক অদৃশ্য চক্র—কেউ দেখে না, কিন্তু শহরকে পরিষ্কার রাখে।
এখন ধারাভি পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। আশঙ্কা—এটি কি পুনর্বাসন, না কি রিয়েল এস্টেট প্রকল্প? অনেকেই ভয় পাচ্ছেন, ‘অযোগ্য’ বলে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। কেউ কেউ বলেন, নতুন বিল্ডিং উঠবে, কিন্তু ধারাভির চরিত্র বদলানো কঠিন।
ধারাভি শুধু দারিদ্র্য নয়। এটা একটা ইকোসিস্টেম। হাজার কোটির চাকা। সরু গলি, ভেজা দেওয়াল, তবু কাজ থামে না। তাই রাজু হনুমন্তের কথাই শেষ কথা, ‘গাটার হ্যায়, পার সোনে কা হ্যায়।’