প্রাক্তন ওই সিইও জানিয়েছেন, প্রথম দিকে অনেক কর্মীই বিশ্বাস করতে পারেননি যে, সত্যিই এমন হচ্ছে। কেউ ভেবেছিলেন, পুরোটাই হয়তো রসিকতা।

শেষ আপডেট: 26 December 2025 13:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কে বলে আসলেই সান্তা ক্লজ (Real life Santa Clause) বলে কেউ নেই! পারিবারিক ব্যবসা বিক্রি করে যে বিপুল অঙ্কের অর্থ আয় করেছিলেন, তার একটি বড় অংশ নিজের কর্মীদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন এক মার্কিন CEO। লুইজিয়ানার ব্যবসায়ী গ্রাহাম ওয়াকার (Fibrebond CEO Graham Walker) তাঁর সংস্থা বিক্রি করে পাওয়া অর্থের মধ্যে থেকে প্রায় ২৪ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২,১৫৫.৭ কোটি টাকা) ৫৪০ জন কর্মীর মধ্যে বোনাস হিসেবে বিতরণ করেছেন (CEO gives bonus to employees after selling company)।
সম্প্রতি গ্রাহাম ওয়াকার তাঁর পারিবারিক সংস্থা ‘ফাইবারবন্ড’ (Fibrebond) বিক্রি করেন। তবে এই সংস্থা বিক্রির আগে তিনি সম্ভাব্য ক্রেতার সামনে একটি শর্ত রাখেন, সংস্থা অধিগ্রহণের মোট অর্থের অন্তত ১৫ শতাংশ দিতে হবে কর্মীদের (Graham Walker Fibrebond bonus)। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই শর্ত মেনেই সংস্থাটি বিক্রি হয়।
প্রত্যেক কর্মী কত টাকা পেলেন?
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রাহাম ওয়াকার জানান, কঠিন সময়েও সংস্থার পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতেই তিনি এই বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চলতি বছরের জুন মাস থেকে এই অর্থ দেওয়া শুরু হয়।
গড় হিসাবে প্রত্যেক কর্মী পেয়েছেন প্রায় ৪ লাখ ৪৩ হাজার ডলার। এই বোনাস পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে দেওয়া হবে। তবে শর্ত একটাই, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কর্মীকে সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।
কেমন ছিল কর্মীদের প্রতিক্রিয়া?
প্রাক্তন সিইও গ্রাহাম ওয়াকার জানিয়েছেন, প্রথম দিকে অনেক কর্মীই বিশ্বাস করতে পারেননি যে, সত্যিই এমন কিছু ঘটতে চলেছে। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, পুরো বিষয়টাই হয়তো কোনও রসিকতা বা প্র্যাঙ্ক। আবার অনেক কর্মী আবেগের বশে ভেঙে পড়েন।
ওয়াকার জানান, কর্মীরা এই অর্থ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেছেন - কারও টাকা গেছে বাড়ির ঋণ শোধে, কারও ঋণের বোঝা কমাতে, কেউ গাড়ি কিনেছেন, কেউ সন্তানের কলেজের ফি মিটিয়েছেন, আবার কেউ অবসর জীবনের জন্য সঞ্চয় শুরু করেছেন।
৪৬ বছরের গ্রাহাম ওয়াকার বলেন, “কেউ কেউ প্রথম দিনেই, এমনকি প্রথম রাতেই পুরো টাকা খরচ করে ফেলেছেন। শেষ পর্যন্ত এটা তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, ভাল হোক বা খারাপ।”
এক কর্মীর গল্প: ‘এখন সত্যি করে বাঁচতে পারছি’
সংস্থার এক মহিলা কর্মী, যিনি ১৯৯৫ সালে ঘণ্টাপিছু মাত্র ৫.৩৫ ডলার মজুরিতে ফাইবারবন্ডে কাজ শুরু করেছিলেন, বর্তমানে ১৮ জনের একটি টিমের নেতৃত্ব দেন। তিনি জানান, বোনাসের টাকা দিয়ে তিনি তাঁর বাড়ির 'মর্টগেজ' শোধ করেছেন। পাশাপাশি বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ করে একটি পোশাকের বুটিকও খুলেছেন।
তিনি বলেন, “আগে আমরা 'এক মাসের বেতন থেকে পরের মাসের বেতন' পর্যন্ত হিসেব করে দিন কাটাতাম। এখন সত্যি সত্যি যেন বাঁচতে পারছি। আমি কৃতজ্ঞ।”
কেন এই ঘটনা আলাদা?
সাধারণত কোনও সংস্থা বিক্রি হলে কর্মীরা তখনই বড় অঙ্কের টাকা পান, যদি তাঁদের হাতে সংস্থার শেয়ার থাকে। কিন্তু গ্রাহাম ওয়াকারের ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। যাঁরা এই বিপুল বোনাস পেয়েছেন, তাঁদের কেউই সংস্থার মালিকানার অংশীদার ছিলেন না। শুধুমাত্র কর্মী হিসেবেই এই অর্থ পেয়েছেন তাঁরা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া
এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিশেষ করে এক্স (আগের টুইটার)-এ। সেখানে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এক জন লেখেন, “এটাই তো সত্যিকারের ক্রিসমাস স্টোরি।” আর এক জন মন্তব্য করেন, “এমন নিখাদ উদারতা আজকাল খুবই বিরল।”
আর এক ইউজার লেখেন, “এই ধরনের পুঁজিবাদই আমাদের বেশি দরকার। এমন একজন বস, যিনি কর্মীদের শুধুই শ্রমিক হিসেবে নয়, পরিবার হিসেবে দেখেন। গ্রাহাম ওয়াকার শুধু একটা সংস্থা বিক্রি করেননি, ৫৪০ জন মানুষের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছেন। এটাই প্রকৃত নেতৃত্ব। মেরি ক্রিসমাস।” আরও এক জনের মন্তব্য, “এটা সত্যিই জীবন বদলে দেওয়ার মতো ঘটনা। এমন সিদ্ধান্তের প্রভাব বহু দশক ধরে থেকে যায়।”
ফাইবারবন্ডের পথচলা
ফাইবারবন্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রাহাম ওয়াকারের বাবা ক্লড ওয়াকার, ১৯৮২ সালে। ১৯৯৮ সালে সংস্থার কারখানা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায়। ব্যবসায় বড় ধাক্কা এলেও ক্লড ওয়াকার কর্মীদের বেতন দেওয়া বন্ধ করেননি।
পরবর্তীতে সংস্থা আবার ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু ফের এক সমস্যা আসায় সেই সময় শতাধিক কর্মীকে ছাঁটাই করতে হয়।
২০০০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে গ্রাহাম ওয়াকার তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে সংস্থার দায়িত্ব নেন। তখনও ব্যবসার অবস্থা খুব ভাল ছিল না। তবু কর্মীরা সংস্থার পাশে থেকেছেন। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। কর্মীদের উৎসাহ দিতে ওয়াকার বিভিন্ন নিরাপত্তা ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করলে গ্রুপ বোনাস চালু করেন।
পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত আসে, যখন সংস্থা ১৫০ মিলিয়ন ডলার ঝুঁকি নিয়ে ডেটা সেন্টারের জন্য মডিউলার পাওয়ার এনক্লোজার তৈরি শুরু করে। সেই সিদ্ধান্তই মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ফাইবারবন্ডের বিক্রি প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়ে যায় এবং বড় শিল্প সংস্থাগুলির নজরে আসে।