হাওড়া ব্রিজের (Howrah Bridge) একটা দুর্ঘটনা তাঁর জীবনকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। গোপাল সাহা (Gopal Saha) অবশ্য ভাগ্যের দোহাই দিয়ে নিজের জীবনকে থামিয়ে দেননি।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস।
শেষ আপডেট: 24 June 2025 08:29
এভাবেও লড়াই করে জীবনে ফেরা যায় (Battle of Life)!
হাওড়া ব্রিজের (Howrah Bridge) একটা দুর্ঘটনা তাঁর জীবনকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। গোপাল সাহা (Gopal Saha) অবশ্য ভাগ্যের দোহাই দিয়ে নিজের জীবনকে থামিয়ে দেননি। অন্যের করুণার পাত্র হয়ে বাঁচার বদলে এক হাতেই যুঝছেন জীবন-যুদ্ধ।
গড়িয়া-বাগবাজার রুটের (Garia-Baghbazar) বাসে যাঁরা নিয়মিত চড়েন তাঁরা ভাল করে জানেন, রাতের বেলা বাইপাসে উঠলে এই রুটের বাস ক্ষেত্র বিশেষে কেমন বেপরোয়া গতিতে চলে। যে রুটের বাসে ভাল করে না ধরে দাঁড়ালে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, সেই রুটের বাসেই কিনা এক হাতে কন্ডাক্টরি (Bus Contactor) করেন মধ্য পঞ্চাশের গোপালবাবু!
এক হাতে! কারণ, ১৯৮৯ এর এক অভিশপ্ত সকালের বাস দুর্ঘটনা তাঁর জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে বাম হাত। হাসপাতাল ঘুরে মাঝের কিছুদিন বিশ্রাম, তারপরে নিজের ও পরিবারের জঠর জ্বালা মেটাতে সেই বাসই তাঁর অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সংস্থান।
সোমবার রাত সওয়া ন'টা। রুবির বাসে দেখা হল গোপালবাবুর সঙ্গে। এক হাতে কন্ডাক্টরির ফাঁকেই ফিরেছিলেন অতীত যন্ত্রণার স্মৃতিতে। বলছিলেন, "সালটা ১৯৮৯। তখন বেকবাগান-হাওড়া রুটের বাসের কন্ডাক্টরি করতাম। দুটো বাসের রেষারষি হল। এক মহিলাকে বাঁচাতে গিয়ে হাওড়া ব্রিজে অন্য বাসের ধাক্কায় আমার একটা হাতই বাদ চলে গেল।"
রাতে টেলিফোনে গোপালবাবুর ছেলে, পেশায় বাস চালক আকাশ বলছিলেন, আমরা তিন ভাই, দুই বোন। বাবার যখন দুর্ঘটনাটা হয় তখন আমার বয়স মাত্র দেড় বছর। শুনেছি, অপারেশন করে বাবার হাতটা বাঁচানো যেত। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তারদের ভুলে বাবার বাম হাতটাই বাদ চলে গেল!"
পুরনো সে কথায় অবশ্য বিশেষ ফিরতে চান না গোপাল সাহা। বলছিলেন 'ভাগ্য বা অন্যকে দোষারোপ করে কী হবে! নিজের লড়াইটা তো নিজেকেই লড়তে হবে। পেটের জ্বালা তো আর বুঝবে না আমি শারীরিকভাবে সক্ষম না অক্ষম!"
আদি বাড়ি পাক সার্কাসে। তবে অনেক আগেই পৈত্রিক ভিটে ছেড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এখন থাকেন মুকুন্দপুরের দাসপাড়ার ভাড়া বাড়িতে। বাগবাজার-গড়িয়া রুটে সপ্তাহে ৬ দিন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা ডিউটি। মাঝে খাওয়া, বিশ্রামের জন্য কিছু সময় বরাদ্দ। সপ্তাহ শেষে একদিন বাড়ি যান। সরকারি সাহায্য বলতে, এক হাজার টাকার ভাতা!
বলছিলেন, "আজকের দিনে ওই হাজার টাকায় কী বা হয়।" তাই নিজের পেটের ভাত জোগাড় করতে সেই বাসেই ফিরেছেন, যে বাস তাঁর জীবন থেকে একটা হাতই কেড়ে নিয়েছে!
টেলিফোনে ছোট ছেলে আকাশ বলছিলেন, "আমরা বড় হওয়ার পর বাবাকে অনেকবার বারণ করেছি, বলেছি, আর বাসের কন্ডাক্টরি করতে হবে না। উনি শোনেনি, ওনার সাফ কথা, 'জীবন আমার, আমার লড়াইটা আমাকেই লড়তে দে'।"
এত মনের জোর পান কোথা থেকে? এক হাতে বাসের কন্ডাক্টরি সামলাতে সামলাতে নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব আসে, "জীবনের চেয়ে বড় শিক্ষক আর কেউ নেই। চারিদিকে দেখতে পাই, কী নেই, তার পিছনে মানুষ দৌড়ায়। আমি দেখি, আমার কাছে কী আছে। কীভাবে সেটাকে কাজে লাগানো যায়, তার ওপর কাজ করলেই দেখবেন অন্যের ভরসায় বাঁচতে হবে না।"
সহযাত্রীদের কেউ কেউ আর্থিক সাহায্য করেন। এক ডেইলি প্যাসেঞ্জারের কথায়, "পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, প্রেম ভেঙে যাওয়া, চাকরি না পাওয়া, দাম্পত্য কলহ-হাজারও কারণে সমাজে আত্মহত্যা যখন রোজকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন গোপাল সাহার মতো মানুষগুলো জীবন যুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় অনুপ্রেরণা।"
বাস থেকে নামার সময় পিছন থেকে অনুরোধ এল, "এমন কিছু লিখবেন না, যাতে আমার ক্ষতি হয়ে যায়। আমি গরিব মানুষ। হাত নেই তো কী হয়েছে, খেটে খাই! সরকারি সাহায্য না পেলেও আমাকে খেটেই খেতে হবে।"