এক সময়ে কেবল কল্পবিজ্ঞানের গল্পেই শোনা যেত এ সব! তবে তা আদ্যিকালের কথা। নইলে বুদ্ধিও যে একদিন কৃত্রিম হবে কেই বা ভাবতে পেরেছিল!

ছবি: সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 14 October 2025 10:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক সময়ে কেবল কল্পবিজ্ঞানের গল্পেই শোনা যেত এ সব! তবে তা আদ্যিকালের কথা। নইলে বুদ্ধিও যে একদিন কৃত্রিম হবে কেই বা ভাবতে পেরেছিল! তেমনই বছর কয়েকের মধ্যে পাড়ার মুরগি-খাসির দোকানকে বিপন্ন করে বাজারে আসতে পারে ল্যাব গ্রোন মিট (Lab grown meat)। অর্থাৎ গবেষণাগারে তৈরি মাংস। ঠিক যেমন এখন ল্যাব গ্রোন হিরের চল হয়েছে বাজারে। দুর্গাপুজোয় শ্রীভূমির দেবীমূর্তিও সাজানো হয়েছিল ল্যাবে তৈরি হিরেতে।
বস্তুত ল্যাব গ্রোন মিটের ধারনাটা এসেছে দুটি চাহিদা থেকে। এক, দুনিয়ার এত মানুষের প্রোটিনের জোগান দেওয়া এবং দুই, পশুকে হত্যা না করে কীভাবে সেই চাহিদা মেটানো যায়। ল্যাব গ্রোন মিট কোনও কৃত্রিম মাংস নয়। ল্যাবরেটরিতে প্রাণীর কোষ থেকে তৈরি হচ্ছে আসল মাংস। এবং ভবিষ্যতের এই খাদ্য বিপ্লবেই নেতৃত্ব দিতে চাইছে ভারত।
সদ্য বিশ্ব খাদ্য মেলার তথা (World Food India 2025) চতুর্থ সংস্করণের আয়োজন হয়েছিল দিল্লিতে। সেখানে অনেকেরই চোখ গিয়ে পড়ে ছোট্ট একটি স্টলে। সেখানেই ভিড় জমে যায়। কারণ, সেখানে প্রদর্শিত হচ্ছিল ‘ল্যাব গ্রোন মিট’ বা ল্যাবে তৈরি মাংস।
এই প্রযুক্তিতে প্রাণীর শরীর থেকে কোষ সংগ্রহ করে বিশেষ পুষ্টি মাধ্যমের মধ্যে রেখে তা বাড়ানো হয়। সেই কোষ থেকেই তৈরি হয় চিকেন ব্রেস্ট, মাছ বা অন্যান্য মাংসজাত পণ্য। এটি ‘প্ল্যান্ট-বেসড মিট’-এর থেকেও আলাদা—কারণ এখানে ব্যবহৃত হয় আসল প্রাণী কোষ।
এ বছর অগাস্টে মুম্বইয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটি বড় কুক-অফ আয়োজন করা হয়। তাতে অংশ নেয় দেশের শীর্ষ হসপিটালিটি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। তারা ল্যাবে তৈরি চিকেন দিয়ে বানায় টাকো, বার্গার থেকে শুরু করে কোঙ্কনি ও গোয়ান পদ। এই উদ্যোগের নেপথ্যে ছিলেন বায়োক্রাফট ফুডসের কর্ণধার কমলনয়ন টিবরেওয়াল।
তাঁর কথায়, “এই কুক-অফই ছিল আমাদের মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত। এখানে শেফ কমিউনিটির সঙ্গে আমাদের সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছে।” কোম্পানিটি এখন হোটেল ও রেস্তোরাঁর জন্য চিকেন ব্রেস্ট তৈরি করছে—যেটি মাত্র চার দিনে উৎপাদন সম্ভব। দামও রাখা হবে বাজার দরের কাছাকাছি—প্রতি কেজি ৩০০-৩৫০ টাকা।
এ ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদী সরকারও বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের বায়ো ইকনমির লক্ষ্য হল ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আয়তনে পৌঁছনো। তার মধ্যেই একটা বিশেষ বিষয় হল ‘স্মার্ট প্রোটিন’। যার মধ্যে রয়েছে এই ল্যাব গ্রোন মিট।
বায়োক্রাফ্ট ফুডস (Biokraft Foods) ইতিমধ্যেই তাদের তৈরি চিকেন ব্রেস্ট নিয়ে ‘টেস্টিং’ ও কুক-অফ আয়োজন করেছে। আবার সরকারের বায়োটেকনোলজি দফতরও নতুন নীতিমালা তৈরি করে বিভিন্ন সংস্থা ও গবেষকদের এই খাতে অর্থ সাহায্য দিচ্ছে।
ডিবিটির সচিব রাজেশ এস গোখলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “এই নতুন খাদ্য যুগে গবেষণা, উদ্ভাবন ও উৎপাদন—সব ক্ষেত্রের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য। স্টার্টআপ, বড় কোম্পানি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান—সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।”
ল্যাব মাংস তৈরিতে একটি বড় নৈতিক বাধা ছিল প্রাণীজ রক্ত থেকে তৈরি ফেটাল বোভাইন সেরাম (Fetal Bovine Serum) ব্যবহারের বিষয়টি। এই সমস্যার সমাধান করেছে ক্লিয়ার মিট( Clear Meat)। তারা তৈরি করেছে ক্লিয়ার এক্সনাইন (ClearX9), এটি একটি উদ্ভিদ নির্ভর গ্রোথ মিডিয়া। এতে উৎপাদন খরচও কমছে প্রায় ৬০ শতাংশ। এই মিডিয়া এখন শুধু ভারত নয়, নিউজিল্যান্ড থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত বিদেশের আটটি সংস্থা ব্যবহার করছে।
কমপাউন্ড লাইভস্টক ফিড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্তাদের বক্তব্য, “ভারতে এখনো অধিকাংশ মানুষ হাট-বাজার থেকে মাংস কিনে খান। তাই ল্যাব মাংস আপাতত উচ্চ আয়ের গ্রাহকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।” তবু তিনি স্বীকার করেন, কম খরচে ও সঠিক দামে এই প্রযুক্তি ছড়াতে পারলে তা এক বিপ্লব আনতে পারে।
বর্তমানে ভারতীয় বাজারে ল্যাব গ্রোন মাংসের কোনো পণ্য এখনও অনুমোদিত নয়। এফএসএসওআই(FSSAI) এ বিষয়টিকে ‘নন স্পেসিফায়েড ফুড’ হিসেবে পর্যালোচনা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মকানুন মেনে ১.৫ থেকে ২ বছরের মধ্যে এই পণ্য বাজারে আসতে পারে।
তবে এ বছর জুলাই পর্যন্ত ল্যাব গ্রোন মাংস বিক্রির অনুমতি মিলেছে সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায়। আপসাইড ফুড, গুড মিটের-মতো সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পণ্যের জন্য অনুমোদন পেয়েছে। আরও দশটি দেশ অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
এ দেশে সরকার ও একাধিক স্টার্টআপ একসাথে কাজ করছে এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করে তুলতে। কম খরচে উৎপাদন, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও সরকারের সহায়তা ভারতের পক্ষে এই ক্ষেত্রে ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে।
টিবরেওয়াল বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু মাংস বিক্রি নয়, গোটা সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণ করা। আমরা চাই ভারত হোক বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুড টেক ডেভেলপার।”
এক কথায়, ল্যাবে তৈরি মাংস আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নয়—এটি এখন বাস্তব, আর ভারত চাইছে এই খাদ্য বিপ্লবের অন্যতম চালক হতে।