বৎসলা, মধ্যপ্রদেশের পান্না টাইগার রিজার্ভের হাতি। ১০০ পেরিয়েছিল অনেকদিন আগে। অসুস্থ ছিল শেষ কয়েকদিন ধরে। মঙ্গলবার তার মৃত্যু হয়।
_0.jpeg.webp)
বৎসলা (ছবি সৌজন্যে- টুইটার)
শেষ আপডেট: 11 July 2025 18:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অন্য হাতির বাচ্চাদের সামলাত মায়ের মতো। কড়া পাহারায় রাখত সকলকে। কিছু হলেই ছুটে যেত, ঘুরতে ফিরতে আদর করতে ভুলত না। বয়সের ভারে চলাফেরার সমস্যা তাকে আটকে রাখতে পারেনি এক জায়গায়। বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা, মাহুতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এদিক ওদিক করা, এই ছিল বৎসলার জীবন।
বৎসলা, মধ্যপ্রদেশের পান্না টাইগার রিজার্ভের হাতি। ১০০ পেরিয়েছিল অনেকদিন আগে। অসুস্থ ছিল শেষ কয়েকদিন ধরে। মঙ্গলবার তার মৃত্যু হয়। বিশ্বে জীবিত হাতিদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ছিল সে। মঙ্গলবার দুপুর দেড়টা নাগাদ মধ্যপ্রদেশের হিনাউটা এলিফ্যান্ট ক্যাম্পে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। খবর জানায় টাইগার রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ।
হাতি দেখলেই থরহরি কম্প অবস্থা হয় আট থেকে আশি সকলের। হাতির মেজাজ সামলাতে মাহুতেরাও অনেক সময় হার মানে। সামনে এলেই দে ছুট। কিন্তু বৎসলার ক্ষেত্রে বিষয়টা ছিল আলাদা। কেউ ভয় তো পেতেনই না উল্টে তাকে দেখার জন্য ভিড় জমত রোজ। কাছে গেলে মাথা নেড়ে এগিয়ে এসে আদর নিত। চোখের করুণ দৃষ্টি আর মুখের শান্ত ভাব দেখলে কেউ আদর না করেও থাকতে পারতেন না।
জঙ্গলে হস্তিশাবকের আগমন হলেই ডাক পড়ত। গিয়ে মায়ের মতো আগলে রাখত সবাইকে। অনেকে তাই 'দাই মা' বলে ডাকত তাকে। দাই মা-ই বটে। চোখে ছানি পড়ায় সমস্যা, চলাফেরায় অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও একদম পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখত নিজের সংসারকে।
Vatsala, the world’s oldest known Asiatic elephant, who lived an extraordinary 109 years, passed away on July 8, 2025.pic.twitter.com/zkeWbSYs8R
— Massimo (@Rainmaker1973) July 10, 2025
রেঞ্জার আরপি অর্গারিয়া বৎসলা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। বলেন, 'ওকে দেখে কষ্ট হচ্ছিল খুব। আমাদের কাঁদিয়ে বিদায় নিল।' বনসংরক্ষক তথা ফিল্ড ডিরেক্টর অঞ্জনা সুচিতা তিরকি এবং উপ-পরিচালক মোহিত সুধ বৎসলাকে মঙ্গলবার শ্রদ্ধা জানান শেষবারের মতো। তিরকি বলেন, 'বৎসলা যে ক্যাম্পকে নিজের ঘর বানিয়েছিল, সেখানেই তাকে সম্মানের সঙ্গে দাহ করা হয়েছে।'
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই অসুস্থ ছিল সে। বয়সের কারণে বহু বছর আগে থেকেই তাকে আর কোনও দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়নি। অভিজ্ঞ মাহুত ও পশু চিকিৎসকদের নজরে রাখা হয়েছিল। কয়েকদিন আগে একটি নর্দমায় পড়ে গিয়ে আঘাত পায়। তৎক্ষণাৎ শুরু হয় চিকিৎসা, চালু হয় স্পেশাল ফল-মূল ও খিচুড়ির ডায়েট। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।
পান্নার লোকজন বলছেন, বৎসলার জীবন ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেওয়ার মতো। ১৯৭১ সালে যখন তাকে হোশঙ্গাবাদের বোড়ি স্যাংচুয়ারিতে নিয়ে যাওয়া হয়, তখনই তার বয়স ছিল আনুমানিক ৫০ বছর। দেখে বোঝা দায়। ১৯৯৩ সালে আনা হয় পান্না টাইগার রিজার্ভে। তারও আগে তাকে উদ্ধার করা হয়েছিল কেরলের নীলাম্বুর জঙ্গল থেকে।

<strong>পান্নায় বৎসলা</strong>
বন আধিকারিক ও বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, বৎসলার বয়স ১০০ ছাড়ালেও জন্ম সংক্রান্ত সরকারি নথি না থাকায় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম তোলা যায়নি। এমনকি কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে তাঁর বয়স যাচাইয়ের প্রস্তাবও সফল হয়নি। বিশেষজ্ঞ রাজেশ দীক্ষিত বলেন, 'ভীষণ ফাঁকা লাগছে। ওর অসাধারণ চরিত্র ছিল। অন্য হাতির বাচ্চাদের নিজের সন্তানের মতো আদর করত। যাঁরা বৎসলাকে দেখেছেন, জানেন, এমন হাতি বিরল। আফসোস, ওর নাম গিনেস বুকে তোলা গেল না।'
বৎসলা আক্রমণ করত না সে অর্থে কাউকে। একই ক্যাম্পে থাকা পুরুষ হাতি রাম বাহাদুরের সঙ্গে ছিল তিক্ত সম্পর্ক। ২০০৩ সালে রাম বাহাদুর ওর উপর হামলা চালায়, বৎসলার শরীরে পড়ে ২০০টির বেশি সেলাই। ২০০৮ সালেও আরেকবার হামলা করে সে। একজন মাহুতকেও প্রাণে মেরে ফেলে। তারপর সরিয়ে একা রাখা হয় তাকে। এতকিছুর পরও বৎসলা কোনওদিন পাল্টা আক্রমণ করেনি।
তাই বৎসলার মৃত্যুতে কাঁদছেন পান্না টাইগার রিজার্ভের সমস্ত কর্মী। বনকর্মীদের একটাই কথা, ওর জায়গা কোনও দিন কেউ নিতে পারবে না।