এই ভারতে, যেখানে ভাল মানের শিক্ষা এখনও অনেকের কাছে কেবলই এক বিলাসিতা, সেখানে আদিত্য কুমারের মতো মানুষরা এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন।

আদিত্য কুমার
শেষ আপডেট: 5 September 2025 11:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পায়ে পায়ে হেঁটে চলা জীবন, হাজার হাজার মাইল পাড়ি দেওয়া এক ইস্পাত-দৃঢ় সংকল্প। সাইকেলের (Cycle) প্যাডেলে ভর করে এক সাধকের এগিয়ে চলা, যার এক হাতে শিক্ষালয়ের মশাল, আরেক হাতে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এক অদম্য লড়াইয়ের সঙ্কেত। তিনি আর কেউ নন, তিনি আদিত্য কুমার (Aditya Kumar)। অনেকে যাঁকে ভালোবেসে ডাকে ‘সাইকেলওয়ালা গুরুজি’ (Cyclewala Guruji) নামে। তাঁর এই নিঃস্বার্থ প্রয়াস আজ শুধু ভারত নয়, সারা বিশ্বের কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শিশুদের কাছে তিনি এক মসীহা হয়ে উঠেছেন।
আমাদের এই ভারতে (India), যেখানে ভাল মানের শিক্ষা (Education) এখনও অনেকের কাছে কেবলই এক বিলাসিতা, সেখানে আদিত্য কুমারের মতো মানুষরা এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। তাঁর প্রতিটি যাত্রার শেষেই জন্ম নেয় নতুন একটি পাঠশালা। তাঁর সাইকেল যেখানে থমকে দাঁড়ায়, সেখানেই রচিত হয় এক নতুন অধ্যায়। তাঁর লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী - দেশের এক কোটি নিরক্ষর শিশুকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়া।
আদিত্য কুমারের কথায়, "আমার বাবা ছিলেন একজন শ্রমিক। আমাদের ঘরে দারিদ্র্য ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কলেজের দিনগুলিতে বুঝতে পারি, ভাল মানের শিক্ষা অর্জন করা কতটা কঠিন। সেই সময় নিজের খরচ চালানোর জন্য টিউশন (Tution) শুরু করি। তখন আমার কাছে শুধু আমার ছাত্রছাত্রীরাই নয়, কিছু গরিব শিশুও পড়তে আসত, কারণ তাদের পড়ার আগ্রহ থাকলেও সামর্থ্য ছিল না। আমি তাদের দুঃখটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম, কারণ আমিও একই জায়গা থেকে উঠে এসেছি। তখনই ঠিক করি, আমি বিনা পারিশ্রমিকে তাদের পড়াব। এভাবেই সবটা শুরু।"
উত্তর প্রদেশের (Uttar Pradesh) ফারুখাবাদে জন্ম নেওয়া আদিত্যর শৈশব কেটেছে চরম আর্থিক অনটনে। বহু রাত তাঁকে অভুক্ত অবস্থায় কাটাতে হয়েছে। ১৯৯৫ সালে বিএসসি শেষ করার পর পরিবারের সকলে চেয়েছিল তিনি যেন একটা ভাল সরকারি চাকরি করেন, বিয়ে করে থিতু হন। কিন্তু তাঁর মন অন্য পথে হাঁটছিল। এই নিয়ে পরিবারের সঙ্গে চলতে থাকে নিত্যদিনের সংঘাত।
বড় ভাই চাকরি করে দেওয়ার কথা বললেও আদিত্য রাজি হননি। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছিল যে, একসময় তিনি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। লখনউয়ে এসে রেল স্টেশনে রাত্রিবাস শুরু করেন এবং সেখানেই আশপাশের বস্তির ছেলেমেয়েদের পড়ানো (Teaching) শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর ক্লাসে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। একসময় তার এই নিঃস্বার্থ কাজ মানুষের চোখে পড়ে এবং তারা এগিয়ে এসে তাকে সাহায্য করে। কেউ তাকে একটি সাইকেল উপহার দেয়, আর এভাবেই তিনি ‘সাইকেলওয়ালা গুরুজি’ হয়ে ওঠেন।
শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁকে 'ন্যাশনাল হিরো অ্যাওয়ার্ড' (National Hero Award) দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে গুগল তাঁকে ভারতের 'নম্বর ১ টিচার' (Number One Teacher) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাঁর এক প্রিয় স্লোগান ছিল, 'আও ভারত শাতচার বানায়ে', যা তাঁকে সারা ভারত-ভ্রমণের অনুপ্রেরণা জোগায়। এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি প্রায় ৪ লক্ষ ক্লাস পরিচালনা করেছেন।
শিক্ষাই মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি। বিশ্বের প্রতিটি ইতিবাচক পরিবর্তনের মূলে রয়েছে শিক্ষা। সাইকেলে চেপে জীবনের 'জিরো পয়েন্ট' পর্যন্ত যাওয়ার গল্প শুধু একটা ভ্রমণ নয়, এ যেন জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালানোর এক অদম্য বাসনা। শিক্ষক আদিত্য কুমার (Teacher Aditya Kumar) প্রমাণ করেছেন, যখন মন থেকে কিছু করার সংকল্প নেওয়া হয়, তখন কোনও বাধাই আর বাধা থাকে না। তাঁর মতো মানুষরা কেবল কিছু শিশুকে পড়ান না, তারা ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করেন। এক একজন আদিত্য কুমার এক একটি আশার আলো হয়ে দেশের অন্ধকার দূর করেন।