সন্তান হারানোর পর তাঁদের চারপাশে নেমে আসে শূন্যতা। দিন রাত প্রায় একরকম হয়ে যায়। দীপক দে বলেন, "ও চলে যাওয়ার পর জীবন থেমে গিয়েছিল। কিন্তু ভাবলাম, ওর স্মৃতিটাকে যদি কোনওভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তাহলে হয়তো কিছুটা শান্তি পাব।"

সুমন্ত দে'র বাবা-মা
শেষ আপডেট: 12 November 2025 12:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিরাটির এক শান্ত গলিতে দাঁড়িয়ে আছে দীপক ও সাধনা দে-র দু’তলা বাড়ি। বাড়ির নিচতলায় সাজানো এক ঘর- সারি সারি বইয়ের তাক, মাঝখানে ছোট্ট টেবিল আর কয়েকটা চেয়ার। দেওয়ালে এক তরুণের হাসিমাখা মুখ- সুমন্ত দে। যে মুখ একদিন ভরিয়ে রেখেছিল তাঁদের জীবন, আজ সেই মুখই তাঁদের প্রেরণার প্রতীক।
সুমন্ত ছিলেন দীপক ও সাধনা দে-র একমাত্র সন্তান। করোনার ভয়াবহ সময়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। অচেনা আতঙ্ক, হাসপাতালের দৌড়ঝাঁপ, ওষুধের অভাব, সেই সময়টা যেন দুঃস্বপ্ন। মা-বাবা প্রাণপণে ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবু শেষরক্ষা হয়নি। সেই শোকের ক্ষত আজও শুকোয়নি।
কান্না ভেজা চোখে সাধনা দেবী বলেন, "আমাদের ছেলের চিকিৎসার সময় অনেক আত্মীয়স্বজন নানা রকম ভুল পরামর্শ দিয়েছিল। আমরা কারও কথা অমান্য করতে পারিনি। আজও মনে হয়, একটু সচেতন হলে, একটু দ্রুত ব্যবস্থা নিলে হয়তো সুমন্তকে বাঁচানো যেত।"
সন্তান হারানোর পর তাঁদের চারপাশে নেমে আসে শূন্যতা। দিন রাত প্রায় একরকম হয়ে যায়। দীপক দে বলেন, "ও চলে যাওয়ার পর জীবন থেমে গিয়েছিল। কিন্তু ভাবলাম, ওর স্মৃতিটাকে যদি কোনওভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তাহলে হয়তো কিছুটা শান্তি পাব।"
সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘সুমন্ত স্মৃতি পাঠাগার’। বাড়ির নিচতলায় তৈরি করা হয় একটি পাঠাগার, যেখানে বইয়ের পাতায়, গল্পের ভাঁজে, বেঁচে আছে সুমন্ত।
প্রথম দিকে এলাকার কয়েকজন শিশু এসে বই পড়ত, ধীরে ধীরে সেই সংখ্যা বেড়ে যায়। আজ এই লাইব্রেরি স্থানীয় মানুষদের কাছে জ্ঞানের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন স্কুল পড়ুয়া, কলেজের ছাত্রছাত্রী, এমনকি প্রবীণরাও এসে বই পড়েন, আলাপ করেন, আলোচনা করেন।
সাধনা দেবী বলেন, "বাচ্চারা যখন হাসে, বই নিয়ে পড়ে, তখন মনে হয় সুমন্ত ওদের মধ্যেই আছে। ওর স্বপ্ন ছিল সমাজের জন্য কিছু করা। আজ আমরা সেটা ওর নামে করছি।"
লাইব্রেরির প্রতিটি তাক, প্রতিটি বই যেন এক নিঃশব্দ স্মৃতি বহন করে। কিন্তু সেই স্মৃতি আর কষ্টের নয়, বরং প্রেরণার। একটা পরিবার তাঁদের শোককে বদলে ফেলেছে সমাজের সম্পদে। দীপক দে আজ গর্বিত, যদিও চোখে জল জমে যায় তাঁরও, "ওর অনুপস্থিতি মেনে নেওয়া সহজ নয়। কিন্তু যখন এই লাইব্রেরিতে নতুন প্রজন্মের মুখে হাসি দেখি, তখন মনে হয়, সুমন্ত কোথাও না কোথাও আছে।"
বিরাটির এই লাইব্রেরি আজ কেবল একটি ঘর নয়, এটি এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক, এক জীবন্ত উদাহরণ যে মৃত্যু ভালবাসাকে হারাতে পারে না। একটি সন্তান হারিয়েও, সেই সন্তানের নামেই আজ জ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছেন বাবা-মা।
‘সুমন্ত স্মৃতি পাঠাগার’ আজ প্রমাণ করেছে, শোক থেকে জন্ম নিতে পারে আশার আলো, আর ভালোবাসা যখন অটুট থাকে, তখন মৃত্যু কেবল এক সাময়িক বিরতি মাত্র।