দ্য ওয়াল ব্যুরো: কিছু বাচ্চা সকলের মধ্যে থেকেও ভীষণই একা। তারা সমবয়সিদের সঙ্গে মিশতে পারে না, চোখে চোখ রাখতে পারে না কথা বলার সময়ে। একা একা থাকতে পছন্দ করে। বারবার একই শব্দ উচ্চারণ করে তারা। নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। অঙ্গভঙ্গি এবং সঠিক ভাবে কথা বলে চাহিদাটুকুও বলতে পারে না। গন্ধ, স্বাদ এবং শব্দ সম্পর্কে বাকিদের থেকে অনেক বেশি স্পর্শকাতর হয় এরা, পড়া মুখস্থ করতে বা মনে রাখতেও পারে না। ডাক্তারি পরিভাষায় এই শিশুরাই ‘অটিস্টিক’।
২রা এপ্রিল বিশ্ব জুড়ে অটিজ়ম সচেতনতা দিবস পালন করা হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জ ২০০৭ সালের ২ এপ্রিল অটিজ়মে আক্রান্ত শিশু ও বয়স্কদের জীবনযাত্রার মানে উন্নতির সাহায্যের জন্য ‘বিশ্ব অটিজ়ম সচেতনতা দিবস’ হিসেবে পালনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর পর থেকে প্রতি বছরই এই দিনটি পালন করা হচ্ছে।
২০০৭ থেকেই ওয়েস্ট বেঙ্গল অটিজ়ম সোসাইটির সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে যিনি রয়েছেন, সেই ইন্দ্রাণী বসু বলছেন “এই সমস্যায় যারা আছেন, তাঁদের কমিউনিকেশনের সমস্যা হয়। তাঁরা কখনওই পারেন না বাকিদের সাথে অ্যাডজাস্ট করতে। আসলে ওঁদের একটা আলাদা জগত থাকে। বাকি যাঁরা মনে করছেন এঁরা স্বাভাবিক নন, তাঁরা কিন্তু ভুল। এঁদের সাথে টেনে-হিঁচড়ে, জোর করে স্বাভাবিক করার চেষ্টাটা আসলে অনেক বেশি ক্ষতি করে। আমাদের সব সময় পাশে থাকতে হবে, ওঁদের সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে। ”
“অটিজ়ম পার্ভেসিভ ডেভেলপমেন্ট ডিসঅর্ডারের মধ্যে থাকা একটা ডিসঅর্ডার। অটিজ়মে আক্রান্ত যে কোনও শিশুকে জীবনের প্রথম তিন বছরের মধ্যে দেখেই আপনি বুঝতে পারবেন। ওদের যে কোনও সোশ্যাল গ্যাদারিঙে সমস্যা হয়, ওরা কথা বলতে চায় না সহজে। আমাদের যদি কখনও চিন বা রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে হঠাৎ একা একা ছেড়ে দেওয়া হয়, আমাদের যতটা অসহায় লাগে, ওদেরও তাই হয়। সে কারণেই তাদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলতে হবে। নইলে ক্ষতি সার্বিক ভাবে সমাজেরই। কারণ তারা যে আইকিউ লেভেলের দিক থেকে জ়িরো এটা বলা যায় না। তবে বয়স অনুযয়ী কম বিকাশ হয় বুদ্ধির। তাই শরীরটা বেড়ে গেলেও অপরিণত আচরণ করে। তা বলে ওদেরকে মেরে বকে ‘স্বাভাবিক’ করতেই হবে এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। ”—বলছেন বিশিষ্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দিনাজ জিজিবয়।
এখনও পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা অটিজ়মের সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেননি। তবে, প্রেগনেন্ট মহিলা রিবেলা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে, অর্থাৎ গুটিবসন্ত, জলবসন্তে আক্রান্ত হলে সন্তান অটিস্টিক হতে পারে। এ সময়ে তিনি মদ, তামাক, সিগারেট, হেরোইন, কোকেনের নেশা করলে, অনেক দিন ধরে হাই ডোজ়ের কোনও ওষুধ খেলে, রক্তের প্লাজ়মা ইনফেকশন হলে বা তাঁর হেপাটাইটিস বি, সিফিলিস হলে শিশুটি অটিস্টিক হতে পারে। এ ছাড়াও শিশুর জন্মের পর মাথায় মারাত্মক ভাবে আঘাত পেলে বা সুস্থ শিশু জন্মের পর পর কোনও কারণে কানে না শুনলে বা কম শুনলে এবং তাড়াতাড়ি এর চিকিৎসা না হলে, শিশুর বিকাশে ব্যাঘাতের ফলে অটিজ়ম হতে পারে। শিশুকে অতিমাত্রায় ঝাঁকুনির ফলেও তার অটিজ়ম হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করেন, জেনেটিক, নন-জেনেটিক ও পরিবেশগত প্রভাব একসঙ্গেই অটিজ়মের জন্য দায়ী। শিশুর বেড়ে ওঠার প্রথম পর্যায়েই এটির সূচনা হয়। এখনও পর্যন্ত, এই সমস্যা থাকলে পুরোপুরি সেরে ওঠা সম্ভব-- এ কথা বলছেন না কোনও বিশেষজ্ঞই। তবে তাঁদের পাশে থাকতে হবে সব সময়ে। তবেই আমরা তাঁদের নিয়ে এগিয়ে চলতে পারব।
অটিজ়মে আক্রান্তরা যেহেতু বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে খানিক পিছিয়ে থাকে, তাই এদের প্রতি অতিমাত্রায় যত্নশীল হতে হবে। তাদের সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলতে হবে, খেলাধুলোর সুষ্ঠু পরিবেশ করে দিতে হবে, বাইরের প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের জন্য আলাদা স্কুলের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের মতামতের মূল্যায়ন করতে হবে।