
শেষ আপডেট: 26 August 2022 15:22
তিব্বতের পশ্চিম প্রান্তে, গ্যাংডিস পর্বতশ্রেণীর বুকে, অতিকায় পিরামিডের মত দাঁড়িয়ে আছে মাউন্ট কৈলাস (২২০২৮ ফুট) বা গাং রিনপোচে (Mount Kailash)। গ্রানাইট ও চুনাপাথরে তৈরি যে পর্বতের পাদদেশে শুয়ে আছে রাক্ষসতাল হ্রদ ও মানস সরোবর। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বী মানুষদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এই কৈলাস পর্বত (Mount Kailash)।
হিন্দুরা মনে করেন, কৈলাস পর্বতের শৃঙ্গ হল দেবাদিদেব মহাদেবের নিভৃত আবাস। যেখানে বসে সৃষ্টি, ধ্বংস, সংহার ও প্রলয় নিয়ন্ত্রণ করেন নীলকণ্ঠ। বৌদ্ধদের কাছে কৈলাস পর্বত হল সৃষ্টির প্রাণকেন্দ্র। বজ্রায়ণ শাখার বৌদ্ধরা মনে করেন, কৈলাসের শৃঙ্গে ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন ধ্যানের দেবতা হেরুকা চক্রসাম্ভারা। তিব্বতের বন ধর্মের অনুসারীরা মনে করেন, কৈলাস শৃঙ্গ তাঁদের আকাশ দেবতা সিপাইমেনের আবাস। জৈন ধর্মের অনুসারীদের কাছেও পবিত্র এই শৃঙ্গ (Mount Kailash)। কারণ প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব নির্বাণ লাভ করেছিলেন এই কৈলাস পর্বতেই।

কৈলাসের মত রহস্যময় পর্বত সারা পৃথিবীতেই আর একটিও নেই। কারণ পর্বতকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে আবর্তিত হয়ে চলেছে রহস্যের কুয়াশা। এমন কিছু বিস্ময়কর ঘটনার উল্লেখ করেন, স্থানীয় মানুষ ও তীর্থযাত্রীরা, বুদ্ধিতে যেগুলির ব্যাখ্যা মেলে না। তাঁরা বলেন, দিনের বিভিন্ন সময় নাকি রঙ পালটায় কৈলাস পর্বত। একই সঙ্গে বদলে যায় কৈলাসের ভূ-প্রকৃতি। কৈলাসের আঙিনায় পৌঁছে যাওয়া মানুষের শরীরে দ্রুত ফুটে ওঠে বার্ধক্যের ছাপ। অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে নখ ও চুল।
রহস্য গভীর করে তোলে কৈলাস পর্বতের গায়ে বরফ ও পাথরের মেলবন্ধনে তৈরি হওয়া পবিত্র 'স্বস্তিকা' এবং 'ওঁ' চিহ্ন। গুগল আর্থের তোলা একটি ছবিকে নিয়ে উত্তাল হয় বিশ্ব। যে ছবিতে দেখা যায় কৈলাশ পর্বতের একটি বিশেষ জায়গায়, আলো ও ছায়া সৃষ্টি করে হাস্যরত শিবের মুখাবয়ব।

রাশিয়ার চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডঃ আর্নেস্ট মুল্ডাশেভ, ১৯৯৯ সালে এক বিশাল দল নিয়ে এসেছিলেন কৈলাসে। দলটিতে ছিলেন ইতিহাসবিদ, পদার্থবিদ ও ভূতত্ববিদেরা। দলটি মাসের পর মাস কাটিয়েছিল কৈলাসে। কথা বলেছিল অসংখ্য তীর্থযাত্রী, হিন্দু ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সঙ্গে। কৈলাসে থাকাকালীন কিছু অস্বাভাবিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল দলটি। দেশে ফিরে ডঃ মুল্ডাশেভ জানিয়েছিলেন, রাতের অন্ধকারে পাল্টে যায় কৈলাস। হাড় হিম করা আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে কৈলাস পর্বতের দিক থেকে।
এক রাতে তাঁরা বিশাল এক পাথর খসে পড়ার অদ্ভুত আওয়াজ পেয়েছিলেন। দলের প্রত্যেকে নিশ্চিত ছিলেন ওই আওয়াজ কৈলাস পর্বতের ঢাল বেয়ে নেমে আসা কোনও পাথরের আওয়াজ নয়। কারণ আওয়াজটা আসছিল কৈলাস পর্বতের ভেতর থেকে। তাঁদের মনে হয়েছিল কৈলাস পর্বতের ভেতরটি ফাঁপা।

মাসের পর মাস অনুসন্ধান চালিয়ে ডঃ মুল্ডাশেভ এসেছিলেন এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্তে। তিনি বলেছিলেন, কৈলাস কোনও প্রাকৃতিক পর্বত নয়। কৈলাস পর্বত হল মানুষের তৈরি করা প্রথম পিরামিড। তাঁর মনে হয়েছিল, কৈলাস পর্বতের ভেতরে থাকতে পারে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মহাপুরুষদের গোপন নগররাষ্ট্র 'জ্ঞানগঞ্জ' বা 'শাম্ভালা'। যদিও ডঃ মুল্ডাশেভের এই সিদ্ধান্তগুলিকে এক বাক্যে খারিজ করে দিয়েছিলেন বিশ্বের বেশিরভাগ বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ ও ভূতত্ববিদেরা।
রহস্যের মায়াজাল আবর্তিত হয়ে চলেছে কৈলাস পর্বতের শৃঙ্গ আরোহণকে ঘিরেও। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত পরিচিত ও বিখ্যাত পর্বতশৃঙ্গে মানুষের ইচ্ছাশক্তির বিজয়কেতন উড়লেও, আজ অবধি কৈলাস শৃঙ্গে পা রাখতে পারেনি কোনও মানুষ। অথচ পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গগুলির থেকে কৈলাস শৃঙ্গের উচ্চতা অনেক কম। বেশ কয়েকবার কৈলাস শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা করাও হয়েছিল। তবুও আসেনি সাফল্য। যদিও বজ্রায়ণ শাখার বৌদ্ধদের লোকগাথা শোনায় একজন মানুষের কাহিনি। যিনি পা রেখেছিলেন কৈলাস শৃঙ্গে। তবে তিনি কোনও সাধারণ মানুষ ছিলেন না এবং এ ব্যাপারে ইতিহাসের কাছে কোনও প্রামাণ্য তথ্য নেই।

একাদশ শতাব্দীতে, পশ্চিম তিব্বতের (Tibet) এক ধনী পরিবারে জন্মেছিলেন জেতসুন মিলারেপা (১০৫২-১১৩৫ খ্রিস্টাব্দ)। বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছিলেন কাকা ও কাকিমা। মিলারেপার বুকে জ্বলছিল বদলার আগুন। কাকা কাকিমাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য মিলারেপা চলে গিয়েছিলেন তন্ত্র মন্ত্র ও কালা জাদু শিখতে। সে সব ভয়ঙ্কর শিক্ষা পরখ করার জন্য হত্যা করেছিলেন বহু মানুষকে। কিন্তু একসময় মিলারেপার মধ্যে এসেছিল তীব্র অনুশোচনা। দীক্ষা নিয়েছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের কাইগু শাখার সিদ্ধা মারপা লোতসাওয়ার কাছে। প্রভু বুদ্ধের আলোয় আলোকিত মিলারেপা হয়ে উঠেছিলেন তিব্বতের ইতিহাসের অন্যতম সিদ্ধপুরুষ।

তিব্বত তখন চলছিল 'বন' ধর্মের সিদ্ধপুরুষ নারো বনচুঙের কথায়। পবিত্র মানস সরোবরের অধিকার নিয়ে তুমুল বাকবিতণ্ডা শুরু হয়েছিল বৌদ্ধ ও বন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে। মিলারেপা ও বনচুঙের মধ্যে শুরু হয়েছিল কালা জাদুর লড়াই। যিনি জিতবেন তিনিই পাবেন মানস সরোবরের অধিকার। কিন্তু কেউ কাউকে হারাতে পারেননি। তখন ঠিক হয়েছিল, যিনি আগে কৈলাস শৃঙ্গে পা রাখবেন তাঁর দখলে থাকবে মানস সরোবর।
মিলারেপা ও বনচুঙ পৌঁছে গিয়েছিলেন কৈলাস পর্বতের পাদদেশে। নিজের সুদৃশ্য জয়ঢাকের ওপর বসে পড়েছিলেন বনচুঙ। কৈলাস শৃঙ্গের দিকে উড়ে গিয়েছিল জয়ঢাক। তখনও ধ্যানমগ্ন হয়ে বসেছিলেন মিলারেপা। একসময় বনচুঙ পৌঁছে গিয়েছিলেন শৃঙ্গের কাছাকাছি। ঠিক তখনই চোখ খুলেছিলেন মিলারেপা। কৈলাস শৃঙ্গের চূড়া ঘিরে রাখা কালো মেঘে ফাটল দেখা দিয়েছিল। সূর্যের এক অস্বাভাবিক উজ্জ্বল রশ্মি এসে পড়েছিল মিলারেপার শরীরে। সেই সূর্যরশ্মিটি ধরে বনচুঙের অনেক আগেই মিলারেপা পৌঁছে গিয়েছিলেন কৈলাস শৃঙ্গে। নিয়েছিলেন মানস সরোবরের দখল। তবে শৃঙ্গ থেকে নেমে এসে মিলারেপা বলেছিলেন, কেউ যেন কোনওদিন এই শৃঙ্গে আরোহণের চেষ্টা না করে। কারণ কৈলাস শৃঙ্গে বিশ্রাম নিচ্ছেন স্বয়ং ভগবান।

হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মে কৈলাস শৃঙ্গে পা রাখা নিষিদ্ধ। কারণ কৈলাস শৃঙ্গে পা রাখার অর্থ, কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসকে পদদলিত করা। তবুও কিছু মানুষের গগনচুম্বী অহঙ্কারকে আটকানো সম্ভব হয়নি। তাই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কয়েকজন ইউরোপীয় পর্বতারোহী বিক্ষিপ্তভাবে কৈলাস শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা করেছিলেন। শিখরের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিল তাঁদের, কিন্তু কেউ ফিরে আসেননি। তাই জানা যায়নি, তাঁরা কারা এবং তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল।
কৈলাশ শৃঙ্গে প্রথম প্রথাগত অভিযান চালানোর কথা ভেবেছিলেন, আলমোড়ার ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনার ও পর্বতারোহী হাগ রাটলেজ। এই দামাল ব্রিটিশ অফিসারটি, ১৯২১ সালে আল্পসে নিয়েছিলেন পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ। তিন তিনবার নন্দাদেবী শৃঙ্গে আরোহণের চেষ্টা চালিয়েছিলেন, বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে। এভারেস্ট অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ১৯৩৩ ও ৩৬ সালে।

একটি সরকারি কাজে, ১৯২৬ সালের জুলাই মাসে, রাটলেজ গিয়েছিলেন তিব্বতে। গার্তোকের প্রশাসক (গারপোন) অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় কৈলাস পরিক্রমা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রাটলেজ। স্ত্রী ডরোথি ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল আর.সি উইলসনের সাথে করেছিলেন কৈলাস পরিক্রমা। একেবারে কাছ থেকে কৈলাস পর্বতকে দেখে মুগ্ধ রাটলেজ ও উইলসন নিয়েছিলেন শিখরে ওঠার সিদ্ধান্ত। অভিযানের জন্য বেছে নিয়েছিলেন অভিজ্ঞ শেরপা সাতানকে। শৃঙ্গের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কৈলাস পর্বতের উত্তরের ঢালকে। পথ যদিও ভয়ঙ্কর, তবুও জোরকদমে চলছিল প্রস্তুতি পর্ব। কিন্তু হঠাৎই রাটলেজকে তলব করা হয়েছিল আলমোড়াতে। স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে ফেরার পথ ধরেছিলেন রাটলেজ।
কৈলাসে থেকে গিয়েছিলেন কর্নেল উইলসন ও শেরপা সাতান। খুঁজে নিয়েছিলেন কৈলাস শৃঙ্গে ওঠার নতুন পথ। যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে, এক রোদ ঝলমলে সকালে, কৈলাস পর্বতের উওর-পূর্ব গিরিশিরা দিয়ে শিখরের দিকে এগিয়ে চলেছিলেন তাঁরা। পৌঁছেও গিয়েছিলেন গিরিশিরাটির মাঝামাঝি অংশে। কিন্তু গিরিশিরার ওপর থাকা একটি বড় বোল্ডারের কাছে পৌঁছনোর পরেই বদলে গিয়েছিল আবহাওয়া।
ঘন অন্ধকার ঘিরে ফেলেছিল কর্নেল উইলসন ও শেরপা সাতানকে। উন্মত্ত বাতাস বাজপাখির মত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দুই আরোহীর ওপর। বাতাসের ঝাপটায় কয়েক হাজার ফুট নিচে ছিটকে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। অনেক কষ্টে প্রাণ বাঁচিয়ে নিচে নেমে এসেছিলেন দুই আরোহী। এর পরেও তাঁরা বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলেন শিখরে ওঠার। কিন্তু সেই বিশেষ বোল্ডারটির কাছে আসা মাত্রই বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন তাঁরা। কখনও প্রবল তুষারপাত, কখনও ঘন কালো মেঘ, কখনও ঝোড়ো বাতাস ফিরিয়ে দিয়েছিল তাঁদের। রহস্যময় স্থানটি পার হওয়ার সব চেষ্টা বিফলে গিয়েছিল। অগত্যা হাল ছেড়ে দিয়ে ভারতে ফিরে এসেছিলেন উইলসন।

রাটলেজ ও উইলসনের কৈলাস অভিযানের দশ বছর পর, ১৯৩৬ সালে কৈলাস শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা করেছিলেন অস্ট্রিয়ার পর্বতারোহী হারবার্ট টিচি। তবে তিনি কৈলাস আরোহণের উদ্দেশ্য নিয়ে তিব্বতে আসেননি। টিচি এসেছিলেন নীলকঙ্কর হিমলের গুরলা মান্ধাতা (২৫২৪৩ ফুট) শৃঙ্গ আরোহণ করতে। তার আগে কম উচ্চতার কৈলাস শৃঙ্গ আরোহণ করে গা ঘামিয়ে নেবেন ভেবেছিলেন।
কৈলাস অভিযানে সঙ্গী হওয়ার জন্য টিচি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন গার্তোকের তরুণ শাসককেও। কৈলাসের শৃঙ্গের দিকে তাকিয়ে গারপোন বলেছিলেন," একমাত্র পাপমুক্ত মানুষই পা রাখতে পারবেন কৈলাস শৃঙ্গে। তাই আমি নিজেও যাব না, আপনাকেও যেতে বারণ করব। কারণ ফলাফলটা বীভৎস হতে পারে।" অজানা এক আতঙ্কে শিউরে উঠেছিলেন টিচি। বাতিল করেছিলেন কৈলাশ অভিযানের সিদ্ধান্ত।

নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগ। পর্বতারোহণ জগতে তখন আলোড়ন তুলেছিলেন ইতালির পর্বতারোহী রেইনহোল্ট মেসনার। পৃথিবীর চোদ্দটি উচ্চতম শৃঙ্গের মধ্যেই বারোটিই তিনি আরোহণ করে ফেলেছিলেন। বাকি ছিল মাকালু ও লোৎসে। যা তিনি পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৮৬ সালে আরোহণ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এহেন প্রবাদপ্রতিম পর্বতারোহী মেসনারকে কৈলাস শৃঙ্গে আরোহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল চিন। তিব্বতের মানুষদের ধর্মীয় ভাবনায় হয়ত আঘাত করার উদ্দেশ্য ছিল চিনের। কারণ তখন প্রায় তলানিতে এসে পৌঁছেছিল চিন ও তিব্বতের সম্পর্ক।
মেসনার আগেই দু'বার কৈলাস পরিক্রমা করেছিলেন। বুঝেছিলেন চারটি ধর্মের মানুষদের কাছে কৈলাস ঈশ্বরের প্রতিরূপ। তাই চিনের আমন্ত্রণকে পত্রপাঠ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন দার্শনিক পর্বতারোহী মেসনার। চিনের দূতকে বলেছিলেন, পৃথিবীতে কৈলাসের থেকে কঠিন পর্বত শৃঙ্গ অনেক আছে। তিনি সেই সব শৃঙ্গে আরোহণ করতে চান।

জাপান ও চিনের ১৭ জন বিজ্ঞানীকে, ১৯৯১ সালে, এক বৈজ্ঞানিক অভিযানের আড়ালে কৈলাস আরোহণ করতে পাঠিয়েছিল চিন। পুরো দলটি অবিশ্বাস্যভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল এক ভয়ঙ্কর তুষারধসের অতর্কিত আঘাতে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরেও শিক্ষা নেয়নি চিন। ২০০১ সালে কৈলাস শৃঙ্গ আরোহণ করার অনুমতি দিয়েছিল, স্পেনের একটি দলকে। প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কিংবদন্তি মেসনার। স্পেনের দলটির উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, "তোমরা হয়ত এই পর্বত শৃঙ্গে পা রাখতে পারবে। কিন্তু মানুষের মনকে জয় করতে পারবে না। তাই বাহাদুরি দেখাতে হলে আরও কঠিন শৃঙ্গ আরোহণ করে দেখাও। কারণ কৈলাস উঁচুও নয় এবং কঠিনও নয়।"
মেসনারের বক্তব্য দাবানল হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল বিশ্বের কোণে কোণে। উঠেছিল প্রতিবাদের ঝড়। অভিযান বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল স্পেনের দলটি। প্রবল জনরোষ ও আন্তর্জাতিক চাপের সামনে পিছু হটেছিল চিন সরকার। পর্বতারোহীদের জন্য আইন করে বন্ধ করে দিয়েছিল কৈলাসের দরজা। কৈলাস হয়ে গিয়েছিল পৃথিবীর একমাত্র পর্বত, যার শৃঙ্গে আর কোনওদিনও পা রাখা যাবে না।

কৈলাস শৃঙ্গ আরোহণের উদ্দেশ্যে যে অভিযানগুলি চালানো হয়েছিল, সেগুলি সফল হয়নি কেন? পরিক্রমা পথের মালবাহক ও গাইডেরা শোনান নানান কাহিনি। যে কাহিনিগুলির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাঁরা বলেন চারজন ইউরোপীয় বিজ্ঞানীর কথা। বারণ করা সত্ত্বেও তাঁরা কৈলাস শিখরে পৌঁছতে চেয়েছিলেন। গিরিপথ ধরে কিছুটা উঠেই নেমে এসেছিলেন। ফিরে আসার কারণ না জানিয়ে, ফিরে গিয়েছিলেন দেশে। চারজনের মধ্যে দু'জন বিজ্ঞানী প্রাণ হারিয়েছিলেন অজানা কোনও কারণে। মাত্র দুই বছরের মধ্যে।
শোনা যায় সাইবেরিয়ার একদল পর্বতারোহীর কথা। তাঁরাও উত্তর-পূর্ব গিরিশিরা ধরে উঠতে শুরু করেছিলেন। একটি বিশেষ জায়গা পার হওয়ার পর, হঠাৎই তাঁদের বয়স বেড়ে যেতে শুরু করেছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সাদা হয়ে গিয়েছিল চুল ও দাড়ি। নরম হয়ে গিয়েছিল শরীরের পেশি। ভয় পেয়ে তাঁরাও নেমে এসেছিলেন দ্রুত। দেশে ফিরে মারা গিয়েছিলেন এক পর্বতারোহী। আশি বছরের বৃদ্ধের মত নাকি দেখতে হয়ে গিয়েছিল আঠাশ বছরের যুবকটিকে।

গাইড ও মালবাহকেরা বলেন, কৈলাস পর্বতের গায়ে পা রাখা মাত্র, শুরু হয় নানান অস্বাভাবিক কাণ্ড কারখানা। এক নিমেষে পালটে যায় সামনের পথ। হঠাৎ দেখা দেয় তুষার ফাটল, খাড়া দেওয়াল বা মিশকালো গিরিখাত। আগে থেকে যেগুলি চোখে ধরা পড়ে না। তাই সঠিক পথে পা বাড়িয়েও বার বার ভূল পথ ধরতে দেখা গিয়েছে পর্বতারোহীদের। যে পথ তাঁদের নিয়ে গিয়েছে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে।
বিজ্ঞানীরা বলেন, এই সব কাহিনিগুলি কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মভীরু তিব্বতিদের কল্পনার ফসল। কেউ বলেন, এই কাহিনিগুলি আসলে কৈলাশকে পবিত্র রাখার মরিয়া প্রচেষ্টা। তবে একটি প্রশ্নের উত্তর তাঁরা দিতে পারেন না। ২০০১ সালের আগে পৃথিবীর সমস্ত উচ্চতম শৃঙ্গগুলিতে পা রেখেছে মানুষ। কিন্তু বার বার চেষ্টা করা সত্ত্বেও, কেন কোনও মানুষের পক্ষে কৈলাস শৃঙ্গ আরোহণ করা সম্ভব হয়নি? মেলেনি উত্তর, তাই কৈলাস পর্বত আজও এক রহস্যময় কুহেলিকা। যে কুহেলিকা শত শত বছর ধরে আকর্ষণ করেছে মানবজাতিকে। কিন্তু নিজেকে উন্মোচিত করেনি।