শক্তিগড়ে গেলেই ল্যাংচা খাওয়া যেন রীতি। কিন্তু এই জনপ্রিয় মিষ্টির নাম ‘ল্যাংচা’ হল কীভাবে?

ল্যাংচা
শেষ আপডেট: 7 January 2026 15:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতাকে মিষ্টির রাজধানী বললে ভুল কিছু হবে না। রসগোল্লা, সন্দেশ-শহর নিজের গৌরব নিজেই বয়ে বেড়ায়। কিন্তু বঙ্গের মিষ্টির খ্যাতি যে শুধু কলকাতার কাঁধেই নেই, সেটা বুঝতে গেলে একবার কলকাতা থেকে দুর্গাপুর (Durgapur) যাওয়ার পথে হাইওয়ে-তে নামতে হবে। আর নামলেই নামে আসতে বাধ্য গরম তেলে ভাজা, চিনির রসে ডোবা ল্যাংচার গন্ধ। জায়গাটার নাম শক্তিগড় (Shaktigarh)। এখন অনেকের কাছে সেটাই আসল পরিচয়।
পূর্ব বর্ধমান (East Burdwan) জেলার ছোট্ট এই জনপদে থামা আজ আর নিছক খাওয়ার প্রয়োজন নয়, রীতিমতো এক প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে চলা অভ্যাস। খিদে লাগুক বা না লাগুক, শক্তিগড়ে গাড়ি থামবেই। বাবার সঙ্গে ছোটবেলায় যাঁরা এখানে এসেছেন, তাঁরাও আজ নিজের সন্তানকে নিয়ে মিষ্টি খেয়ে যান। যেন এক অলিখিত নিয়ম-বর্ধমান পার হওয়া যাবে না, গাড়ির মেঝেতে রস চুঁইয়ে পড়া কার্ডবোর্ডের বাক্স না থাকলে।
বহির্বঙ্গের অনেকের চোখে ল্যাংচা মানে বড়সড় গুলাব জামুন (Gulab Jamun)। কিন্তু তফাতটা বুঝতে গেলে এক কামড় দিতেই হবে। গুলাব জামুন যেখানে নরম তুলতুলে, ল্যাংচা সেখানে শক্তপোক্ত। রংটা গাঢ়-প্রায় পোড়া খয়েরি। খোয়া (Khoya) বেশি ভেজে বানানো হয় বলে তার ঘনত্ব আলাদা। লম্বাটে, প্রায় নলাকার গড়ন-কখনও বুড়ো আঙুলের মতো, কখনও আবার একেবারে হাতভর্তি।
এই ল্যাংচার গল্প কিন্তু শুধু শক্তিগড়েই থেমে নেই। ইতিহাসের খোঁজ মেলে নদিয়ার (Nadia) কৃষ্ণনগরে (Krishnanagar)। বাঙালি লেখক নরায়ণ সান্যাল (Narayan Sanyal) তাঁর ‘রূপমঞ্জরী’ (Roopmanjari) গ্রন্থে লিখেছিলেন, উনিশ শতকের শেষভাগে কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের (Krishnachandra Ray) অন্তঃসত্ত্বা কন্যার ল্যাংচা-খিদেই এই মিষ্টির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বর্ধমানের এক মিষ্টিওয়ালার বানানো কালচে, রসে ভেজা সেই মিষ্টি খেয়ে রাজকন্যার অরুচি কাটে। মিষ্টিওয়ালার পা একটু খোঁড়া ছিল—সেই থেকেই নাম ল্যাংচা। পরে রাজানুগ্রহে ওই মিষ্টিকার শক্তিগড়ে থিতু হন।
সময় বদলেছে, রাস্তা বদলেছে। পুরনো গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (Grand Trunk Road) ছেড়ে এখন এনএইচ-১৯ (NH-19)। শক্তিগড়ের দোকানগুলোও সরে গিয়েছে আমড়া (Amrah) গ্রামের দিকে। মাত্র আড়াইশো মিটার রাস্তার দু’ধারে আজ প্রায় তিরিশটি দোকান—ল্যাংচা ঘর, ল্যাংচা ভবন, ল্যাংচা মহল। নাম আলাদা, কিন্তু ডাক একটাই।
এই ছবি শুধু বাংলার নয়। ওড়িশার (Odisha) পাহালায় (Pahala) ছেনা পোড়া (Chhena Poda), সেলেপুরে (Salepur) রসগোল্লা, তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) পালানি (Palani) রাস্তায় পঞ্চামৃতম (Panchamirtham)—একটি মিষ্টি, একটি রাস্তা, আর যাত্রার সঙ্গে জুড়ে থাকা এক অদ্ভুত টান। শক্তিগড়ের ল্যাংচাও তেমনই।