নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন, আজ, শুক্রবার মুক্তি পেল বর্ডার ২ (Border 2)। ছবির মুক্তিকে ঘিরে উন্মাদনার অন্যতম বড় কারণ দিলজিৎ দোসাঞ্জ (Diljit Dosanjh)। যিনি পরমবীর চক্র প্রাপক (Param Vir Chakra awardee) নির্মলজিৎ সিং শেখোঁর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

নির্মলজিৎ সিং শেখোঁ (বাঁদিকে ফাইল ছবি) ও দিলজিৎ দোসাঞ্জ (Diljit Dosanjh)।
শেষ আপডেট: 23 January 2026 15:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন, আজ, শুক্রবার মুক্তি পেল বর্ডার ২ (Border 2)। ছবির মুক্তিকে ঘিরে উন্মাদনার অন্যতম বড় কারণ দিলজিৎ দোসাঞ্জ (Diljit Dosanjh)। যিনি পরমবীর চক্র প্রাপক (Param Vir Chakra awardee) নির্মলজিৎ সিং শেখোঁর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ছবির সঙ্গে নিজের যাত্রা নিয়ে দিলজিৎ শেয়ার করেছেন এক আবেগঘন বার্তা। তিনি বলেন, ভারতীয় বায়ুসেনার (Indian Air Force) একমাত্র পরমবীর চক্র প্রাপক নির্মলজিৎ সিং শেখোঁর চরিত্রে অভিনয় করতে পারা তাঁর কাছে চরম সম্মান ও গর্বের বিষয়। এই চরিত্র তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রদ্ধার জায়গা হয়ে থাকবে।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। সকাল প্রায় ৮টা। শীতের কুয়াশা শ্রীনগরের উপর এমনভাবে ছড়িয়ে ছিল, যেন কোনও অজানা মুখোশ আকাশকে ঢেকে রেখেছে। ঠিক তখনই শ্রীনগর বিমানটিতে বেজে ওঠে বিপদঘণ্টি। সেই সকালে ছ’টি F-86 সাবর (F-86 Sabre) যুদ্ধবিমান ঢুকে পড়ে ভারতীয় আকাশসীমায়। প্রতিটি বিমানে বোঝাই বোমা। নেতৃত্বে ছিলেন উইং কমান্ডার শরবত আলি চাঙ্গাজি (Wing Commander Sharbat Ali Changazi)। লক্ষ্য— শ্রীনগর বিমানঘাঁটি দখল ও ধ্বংস করা। মিশন— রানওয়ে ধ্বংস করে এই সেক্টরে ভারতের বিমান অভিযানকে সম্পূর্ণ অচল করে দেওয়া।
সাইরেন বাজতেই ফ্লাইং অফিসার নির্মলজিৎ সিং শেখোঁ (Flying Officer Nirmaljit Singh Sekhon) দৌড়ে পৌঁছে যান রানওয়েতে। ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁর ফোল্যান্ড জিন্যাটে (Folland Gnat)— ছোট, চটপটে এই যুদ্ধবিমানকে ভারতীয় পাইলটরা ডাকতেন ‘সাবর স্লেয়ার’ নামে। তাঁর সামনে ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বি এস ঘুম্মান (Flight Lieutenant BS Ghumman), দুই জিন্যাটের ফর্মেশনের লিডার। ঘুম্মান ওড়ার সময় সাবরগুলি ইতিমধ্যেই রানওয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। চারদিকে ধোঁয়া, বিস্ফোরণ আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে শেখোঁর টেক-অফ প্রায় ২০ সেকেন্ড দেরি হয়ে যায়— যা পরে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ২০ সেকেন্ড হয়ে ওঠে।
দুই জিন্যাট দ্রুত আকাশে উঠে যায়। কিন্তু ওই সামান্য দেরির কারণে ঘুম্মান হারিয়ে ফেলেন তাঁর উইংম্যানকে। নীচে ধোঁয়ার ভিতরেও শেখোঁ উড়ে চলেন একাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ঘিরে যান ছ’টি সাবরের দ্বারা। আর সেই মুহূর্তেই তৈরি হতে চলেছিল ভারতীয় সামরিক ইতিহাসের এক অমর অধ্যায়।
শ্রীনগরের আকাশে সাইরেন বাজার বহু আগেই, পাঞ্জাবের ধুলোমাটির মধ্যেই লেখা হয়ে গিয়েছিল শেখোঁর জীবনের গতিপথ। ১৯৪৫ সালের ১৭ জুলাই পাঞ্জাবের ইসেওয়াল (Isewal) গ্রামে জন্ম তাঁর। বড় হন হলওয়ারা বিমানঘাঁটিতে (Halwara Air Force Base)। যেখানে তাঁর বাবা কর্মরত ছিলেন। অন্য শিশুরা মাঠে খেললেও শেখোঁর শৈশব কেটেছে আকাশের দিকে তাকিয়ে, যুদ্ধবিমানের গর্জনকে জীবনের সুরে বেঁধে নিয়ে। ১৯৬২ সালে তিনি আগ্রার দয়ালবাগ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (Dayalbagh Engineering College) ভর্তি হন। কিন্তু পড়াশোনার মাঝপথেই ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে যোগ দেন ভারতীয় বায়ুসেনায়। ১৯৬৭ সালের ৪ জুন তিনি ‘উইংস’ পান এবং পাইলট অফিসার হিসেবে কাজে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালের অক্টোবরেই তাঁর পোস্টিং হয় ১৮ নম্বর স্কোয়াড্রনে— বিখ্যাত ‘ফ্লাইং বুলেটস’ (Flying Bullets)-এ। ১৯৭১ সালের শীতে, ইসেওয়ালের সেই ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র তখন একেবারে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এক যোদ্ধা। শ্রীনগরের হিমশীতল হ্যাঙ্গারে বসে তিনি অপেক্ষা করছিলেন সেই বিপদঘণ্টির, যা তাঁকে অমরত্ব দিয়ে গিয়েছে।
শ্রীনগরের প্রতিরক্ষা ছিল এক ভয়ংকর জুয়া। ১৯৪৮ সালের এক আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী এই উপত্যকা ছিল ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’—অর্থাৎ এখানে স্থায়ীভাবে কোনও এয়ার ডিফেন্স বিমান মোতায়েন রাখা যাবে না। দীর্ঘ অস্থিরতার পর যখন যুদ্ধ শুরু হল, তখন ‘ফ্লাইং বুলেটস’-কে পাঠানো হল এমন এক ময়দানে, যার জন্য তারা আদৌ প্রস্তুত ছিল না। পিরপাঞ্জাল রেঞ্জের (Pir Panjal range) খাঁজকাটা পাহাড়, অচেনা ভূপ্রকৃতি, আর শ্রীনগরের পাতলা, হিমেল বাতাস— সবকিছুই ছিল তাঁদের জন্য নতুন ও বিপজ্জনক।
সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ পেশোয়ারে (Peshawar) ঘাঁটি করা ২৬ নম্বর স্কোয়াড্রনকে (No. 26 Squadron) নির্দেশ দেওয়া হয় শ্রীনগর এয়ারফিল্ডে হামলার। ৫০০ পাউন্ড বোমায় সজ্জিত ছ’টি সাবরের এই দলটি এলাকার ভূগোল ভালভাবেই জানত। তাদের ধারণা ছিল, এটা হবে আর পাঁচটা অভিযানের মতোই— একটা সহজ, ঝুঁকিহীন, নির্বিঘ্ন লক্ষ্যভেদ। তারা জানত না, সেই সকালে শ্রীনগরের আকাশে দাঁড়িয়ে আছেন একজন ভারতীয় পাইলট— যাঁর নাম অচিরেই হয়ে উঠবে সাহস, আত্মত্যাগ আর অসম লড়াইয়ের চিরন্তন প্রতীক।
সেকেন্ড জিন্যাট নিয়ে টেক-অফের জন্য দৌড়চ্ছিলেন শেখোঁ, ঠিক সেই মুহূর্তে যখন প্রথম বোমাগুলি আছড়ে পড়ছে রানওয়েতে। বলা হয়, সামনে থাকা বিমানটির ওড়ার ফলে উঠতে থাকা ধুলোয় তাঁর টেক-অফ প্রায় কয়েক সেকেন্ড পিছিয়ে যায়। কিন্তু দেরি করলেন না শেখোঁ। বোমা ফেলেই ফের ফর্মেশন গুছিয়ে নেওয়া প্রথম জোড়া সাবরকে লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। তবে উইংম্যানের পিছনে লুকিয়ে থাকা আক্রমণকারীকে দ্রুত টের পেয়ে যান পাকিস্তানি পাইলট শরবত আলি চাঙ্গাজি। রেডিওতে চিৎকার করে ওঠেন তিনি— “Gnat behind, all punch tanks!”
মুহূর্তের মধ্যেই ছ’টি নিশানা তৈরি হয়। বোমাবর্ষণ আর অপেক্ষা করবে না। শুরু হয়ে গেছে আসল যুদ্ধ— যাকে সামরিক ভাষায় বলে ডগফাইট। ঠিক তখনই নীচের উপত্যকা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। ধুলো আর ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যায়। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ইতিহাসবিদ কাইজার তুফাইল লিখেছেন, এই লড়াই দ্রুত রূপ নেয় একেবারে ক্লাসিক ‘টেল চেজ’-এ— একটি সাবরের পেছনে একটি জিন্যাট। আর সেই বিমানের পেছনে আরেকটি সাবর। সেকেন্ডে সেকেন্ডে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। সেখন কন্ট্রোলারদের রেডিওতে বলেছিলেন, “আমি একজনের পিছনে ঢুকে পড়েছি, কিন্তু আরেকজন আমার উপর অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে।”
এটা ছিল কৌশলগতভাবে প্রায় অসম্ভব এক পরিস্থিতি। শেখোঁ কার্যত স্যান্ডউইচড। সামনে এক সাবর তাঁর নিশানায়, আর পেছনে আরেক সাবর একেবারে তাঁর লেজে লক করে বসে আছে। পাহাড়ে ঘেরা সংকীর্ণ উপত্যকায়, চারদিকে ধোঁয়া আর গোলাগুলির মধ্যে, পালানোর কোনও রাস্তাই নেই। তিনি আত্মরক্ষা করছিলেন না। তিনি আক্রমণ করছিলেন। ছ’জনের বিরুদ্ধে একজন।
শেষ মুহূর্তে ঠিক কী ঘটেছিল, আজ আর নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারে না। কিন্তু যা জানা যায়, তা হল— পাকিস্তানি বিমানগুলি শেষ পর্যন্ত আক্রমণ বাতিল করে ঘাঁটিতে ফিরে যায়। ভারতীয় বায়ুসেনা শেখোঁকে মরণোত্তর পরমবীর চক্র প্রদান করে। ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্ব সম্মান। আজও তিনি একমাত্র ভারতীয় বায়ুসেনা অফিসার, যিনি এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। সরকারি সম্মানপত্রে বলা হয়েছে, তিনি একা ছ’টি শত্রু বিমানকে মোকাবিলা করেন, দু’টি নামান, আরও কয়েকটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেন শ্রীনগর বিমানঘাঁটি রক্ষা করতে গিয়ে।
তবে তুফাইলের বর্ণনায় ভিন্ন এক তথ্য উঠে আসে। তাঁর মতে, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সালিম বেগ মির্জা তাঁর ‘পিপার’ দিয়ে জিন্যাটকে লক করে ফেলেন। খুব ছোট, কিন্তু নিখুঁত এক নিশানাভেদ। শেখোঁর বিমানটি ধোঁয়া আর ধুলোর ভিতর দিয়ে পাক খেতে খেতে নীচে নামতে থাকে। শেখোঁ কি শেষ মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন? তিনি কি বিমান থেকে বেরতে পেরেছিলেন? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবেই বিমানের সঙ্গে নীচে নেমে যান? এই প্রশ্নগুলির উত্তর ইতিহাসের অন্ধকারেই রয়ে গেছে।
যা নিশ্চিতভাবে জানা যায়— শেখোঁর বিমান শ্রীনগরের কাছেই ভেঙে পড়ে। ফ্লাইং অফিসার নির্মলজিৎ সিং শেখোঁ আর ফিরে আসেননি। তুফাইলের মতে, ছ’টি সাবরই ঘাঁটিতে ফিরে গিয়েছিল। কোনও বিমান হারায়নি পাকিস্তান। কিন্তু মিশন বাতিল হয়েছিল। তবে দুই পক্ষই একটি বিষয়ে একমত— একজন পাইলট। ছ’জন প্রতিপক্ষ। ধোঁয়া, বিস্ফোরণ আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে এক মরিয়া লড়াই। একটি সম্পূর্ণ মিশন ভেস্তে যায়। এক তরুণ অফিসার আত্মবলিদান দেন।
শেষ লড়াইয়ের সময় শেখোঁর বয়স ছিল মাত্র চব্বিশ বছর। আজও তিনি ভারতীয় বায়ুসেনার এক “নিখোঁজ” নায়ক। দুর্ঘটনার পরের সপ্তাহগুলিতে এবং তার পরের কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত তল্লাশি অভিযান চালানো হলেও, বদগাঁওয়ের কাছাকাছি দুর্গম জঙ্গল আর খাদে আজও পাওয়া যায়নি তাঁর বিমানের ধ্বংসাবশেষ কিংবা তাঁর দেহাবশেষ। সামরিক ঐতিহ্যে তাই তাঁকে প্রায়ই বলা হয়, তিনি এখনও টহলেই আছেন— শ্রীনগর উপত্যকার এক চিরস্থায়ী প্রহরী।
চেতন আনন্দ তাঁর ছবি হিন্দুস্তান কি কসম-এ এই ডগফাইটকে রূপ দিয়েছিলেন পর্দায়। আর ২০২৬ সালের সিনেমার প্রেক্ষাপটে Border 2 ছবির মাধ্যমে শেখোঁর কাহিনি নতুন করে ফিরে এসেছে জনমানসে। ছবিতে দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত চরিত্রটি অনুপ্রাণিত এই পরমবীর যোদ্ধার জীবন থেকেই। একজন মানুষ। একটাই আকাশ। আর এক অসম সাহসী লড়াই, যা আজও ভারতের সামরিক ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে আছে।