নেতাজির পরিকল্পনা দাঁড়িয়ে ছিল শৃঙ্খলা (Discipline), ছলনা (Deception) আর নিখুঁত সময়জ্ঞানের (Timing) ওপর। ১৯৩৯ সাল থেকেই পালানোর প্রস্তুতি চলছিল।

তখনই জানা গেল—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নেই। ছবি এআই দিয়ে নির্মিত।
শেষ আপডেট: 23 January 2026 10:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতার (Calcutta) এলগিন রোডের (Elgin Road) এক বাড়ির নির্জন ঘরে, টানা পর্দার আড়ালে, বাঘের চামড়ার ওপর পদ্মাসনে বসে ধ্যান করছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর ওপর ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের (British Intelligence) নজর ছিল চিলের মতো। একমুখ দাড়ি, চণ্ডীপাঠ (Chandi Scripture) চলছিল, যোগাভ্যাস (Yoga Practice) করছিলেন। দিনে একবার মাত্র খেতেন—দুধ আর ফল। খাবারটা নিঃশব্দে পর্দার আড়ালে রেখে যেতেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র। তিনিই ছিলেন একমাত্র মানুষ, যাঁর কাছে যাওয়ার অনুমতি ছিল।
এক সকালে দেখা গেল, খাবার অক্ষত। অবশেষে পর্দা উঠল গোপনীয়তার। আর তখনই জানা গেল—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji Subhas Chandra Bose) নেই। কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (Special Branch) রিপোর্টে লেখা হল—তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। রেখে গেছেন গরম কাপড়, কলম, এমনকী জুতোও। শুরু হয়ে গেছে ভারতের স্বাধীনতার (Indian Independence) পথে তাঁর মহাযাত্রা। ইতিহাসে যা পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘নেতাজির গ্রেট এস্কেপ’ (Great Escape) নামে।
১৯৪১ সালের ১৭ জানুয়ারি, রাত ১টা ৩০ মিনিটে, নিজের ৪৪তম জন্মদিনের ঠিক আগে, ভ্রাতুষ্পুত্র শিশিরকুমার বসুর (Sisir Kumar Bose) সঙ্গে বাড়ি ছাড়েন নেতাজি। শিশির তাঁকে জার্মান ওয়ান্ডারার গাড়িতে (German Wanderer Sedan) করে নিয়ে যান বিহারের গোমো (Gomoh)—আজকের ঝাড়খণ্ডে (Jharkhand) অবস্থিত একটি ছোট রেলস্টেশন। নেতাজি নিজে একে বলেছিলেন, “নতুন ভারত গঠনের পথে অগ্রযাত্রা (Great Advance towards a New India), পালানো নয়।” ব্রিটিশ প্রশাসন তখন কার্যত হতবাক। দেশদ্রোহের (Sedition Trial) মামলা চলাকালীন এমন এক জাতীয় নেতার এভাবে হাতছাড়া হওয়া ছিল তাদের কাছে চরম অপমান।
নেতাজি যে ট্রেনে উঠেছিলেন, সেটি ছিল ভারতের প্রথম মেল/এক্সপ্রেস ট্রেন (First Mail/Express Train)—১ আপ হাওড়া–দিল্লি ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে মেল (1 UP Howrah–Delhi Mail)। সেই ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন এক ‘মহম্মদ জিয়াউদ্দিন’ (Mohd Ziauddin)—পাঠানি কোট, পাজামা, চশমা পরা এক সাধারণ মানুষ। কেউ বুঝতেই পারেনি, এই মানুষটিই আসলে নেতাজি। এই যাত্রাই ছিল আরও বড় এক আন্তর্জাতিক অভিযানের শুরু—যার পরিণতিতে গড়ে ওঠে আজাদ হিন্দ ফৌজ (Indian National Army)।
শুরুতে এই ট্রেন চলত হাওড়া (Howrah) থেকে দিল্লি (Delhi)। পরে কালকা (Kalka) রেলপথে যুক্ত হওয়ায় নাম হয় কালকা মেল (Howrah–Delhi Kalka Mail)। একসময় ব্রিটিশ শাসকেরা কলকাতা থেকে শিমলা (Shimla)—গ্রীষ্মকালীন রাজধানীতে যেতে এই ট্রেনেই যাতায়াত করতেন।ন২০২১ সালে, নেতাজির ১২৫-তম জন্মবার্ষিকীতে, এই ট্রেনের নাম বদলে রাখা হয় নেতাজি এক্সপ্রেস (Netaji Express)। আগামী এপ্রিল মাসে, এই কালকা মেল পূর্ণ করবে টানা ১৬০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন যাত্রা (160 Years of Continuous Run)।
গোমো ছাড়ার পর নেতাজি চড়েন ফ্রন্টিয়ার মেল (Frontier Mail), গন্তব্য পেশোয়ার (Peshawar)। ২৬ জানুয়ারি, যখন তিনি সম্ভবত ব্রিটিশ ভারতের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন, তখনই প্রথম বিশ্ব জানতে পারে—নেতাজি নিখোঁজ। দশ দিনের মধ্যে তিনি পৌঁছে যান কাবুলে (Kabul)। ফরওয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) নেতাদের সহায়তায় মধ্য এশিয়ার সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলি (Soviet Central Asia) পেরিয়ে মার্চ ১৯৪১-এ যান মস্কো (Moscow)। এক মাস পর বার্লিন (Berlin)। সেখান থেকেই আন্তর্জাতিক স্তরে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন জোরদার করেন তিনি।
১৯৪১ সালের শুরুতে নেতাজি ছিলেন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা (Politically Cornered)। কংগ্রেস (Indian National Congress) ব্রিটিশদের পাশে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (World War II) সৈন্য পাঠাতে রাজি হয়েছিল। কংগ্রেস সভাপতির পদত্যাগ, ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন, আর আপসহীন মনোভাব তাঁকে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের প্রধান লক্ষ্য বানিয়ে তোলে। ইতিহাসবিদ পিটার ওয়ার্ড ফে (Peter Ward Fay) তাঁর The Forgotten Army বইয়ে লেখেন, অনশন (Hunger Strike) শুরু করার পর ব্রিটিশরা ভয় পেয়ে তাঁকে এলগিন রোডের বাড়িতে নজরবন্দি করে রাখে। কিন্তু সেই নজরদারি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
নেতাজির পরিকল্পনা দাঁড়িয়ে ছিল শৃঙ্খলা (Discipline), ছলনা (Deception) আর নিখুঁত সময়জ্ঞানের (Timing) ওপর। ১৯৩৯ সাল থেকেই পালানোর প্রস্তুতি চলছিল। ভ্রাতুষ্পুত্র অশোকনাথ বসু (Asoke Nath Bose) লেখেন, নেতাজির বাঁ কান সংলগ্ন তিল (Mole) অস্ত্রোপচার করে তুলে ফেলা হয়, যাতে শনাক্ত করা না যায়। পাঠানি পোশাক, ফেজ টুপি (Fez Cap)—সবই ছিল পরিকল্পনার অংশ।
কলকাতা থেকে গোমো—প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ। ঠান্ডা, অন্ধকার, টানটান উত্তেজনা। ধানবাদে (Dhanbad) অশোকনাথ বসুর বাড়িতে নেতাজি পৌঁছান ‘মহম্মদ জিয়াউদ্দিন’ পরিচয়ে—এক বিমা কোম্পানির ট্রাভেলিং ইন্সপেক্টর (Travelling Inspector) হিসেবে। সারাদিন নিখুঁত অভিনয়। ইংরেজিতে কথা, চা, বিশ্রাম। সন্ধ্যায় বিদায়। তারপর অন্ধকার রাস্তায় ফের গাড়ি। গোমো স্টেশন। কালকা মেল। ইতিহাস এক নিজস্ব ছন্দে এগিয়ে গেল।
আসানসোল (Asansol) বা ধানবাদ—বড় শহর, বেশি পুলিশ। গোমো ছোট, কম নজরদারি। সেখান থেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রাণরেখা রেলপথ (Railway Lifeline of Empire) ব্যবহার করে বেরিয়ে গেলেন সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষটি।
১৮৬৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে (East Indian Railway) চালু করেছিল এই ট্রেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার বহু আগেই। রাজ বদলেছে, রাজধানী বদলেছে, সরকার বদলেছে—কিন্তু ট্রেনটি চলেছে। আজ ১৫৯ বছরের এই ট্রেন বয়ে নিয়ে কয়েকশো কোটি অফিসযাত্রী, সৈনিক, পরিবারকে। আর সঙ্গে চলেছে তার ইতিহাস। রাজধানী, শতাব্দী, দুরন্ত, এখন স্লিপার বন্দে ভারত (Vande Bharat)—সবের ভিড়ে আজও নিজের জায়গা ধরে রেখেছে কালকা মেল। একদিন এই ট্রেনই চুপিচুপি নিয়ে গিয়েছিল এক মানুষকে—যিনি ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন।