.webp)
শেষ আপডেট: 16 January 2024 14:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পৌষ শেষের হিমেল হাওয়াকে ফাঁকি দেওয়া পার্ক স্ট্রিটের অক্সফোর্ড বুকস্টোরে পাঠ করছিলেন শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়—"কোন সুদূর অতীত থেকে কার কথা মনে পড়ল? কে যেন বসত এভাবে? ত্রিভুবনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার দায় তোমার ওপর বর্তেছে প্রথম থেকেই, জানো নিশ্চয়ই? নিমগাছের দিকে তাকিয়ে কথা বলে বাবু। তাই জীবনের প্রতি বাঁকে একবার তোমাকে ছুঁয়ে যেতে চাই, যাতে আমার গল্পও লেখা থাকে তোমার বাকলের ফুটিফাটা দাগে।..."
নতুন লেখক উজ্জ্বল সিনহার প্রথম উপন্যাস, প্রথম দু'মলাটে বাঁধা লেখা—"উজানযাত্রা", ছিল তারই প্রকাশ। উপস্থিত ছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর মতো বিশিষ্টজন।
প্রথম উপন্যাসের প্রকাশে এত নক্ষত্রের উপস্থিতি এবং দর্শকাসনেও ততটাই সাড়া, প্রকাশক দে'জ পাবলিশিং-এর সুধাংশু দে-র কথায়, এমনটা খুব বেশি হয় না। উজ্জ্বলবাবু সত্যিই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। অবশ্য প্রচেত গুপ্তর সরস টিপ্পনী, "সাহিত্য, শিল্প আর প্রেমে প্রথম বলে যে কিছু হয় না... এই বইটি পড়ে আমি আবার উপলব্ধি করেছি।"
শ্রীজাত পাঠ করলেন উপন্যাসের অংশবিশেষ। গ্রাম, মফস্বলের গাছগাছালির ছায়াঘেরা গল্পের পাতা ওল্টানোর খেই হারিয়ে ফেলে যে কাহিনী পৌঁছে যায় নিউ ইয়র্কে। হাডসনের খাঁড়ি কেটে পৃথিবী শাসন করা দোর্দণ্ডপ্রতাপ ম্যানহাটন থেকে লং আইল্যান্ড উঠে আসে নায়ক বাবুর গল্পে। মফস্বলের সঙ্গে বিশ্বায়নের পরশ মিলেমিশে কোলাজের মত তৈরি করেছে এই কাহিনীর নায়ককে। "বাবু" কোনও আলাদা সত্তা নয়। সে রয়েছে স্রষ্টার "আমি"-র আড়ালে। যে "আমি"-র সন্ধানে মহাসাগরের গণ্ডিতে মিশে গিয়েছে বাড়ির নিমগাছ।
প্রচেত গুপ্ত ঠিক সেই কথাটাই বললেন। "এটি একটি চেনা এবং অচেনা জীবনের দলিল। যে জীবন ডুবে যায় ভেসে উঠবে বলে, ভেসেও ওঠে ডোবার আয়োজনে। এই জীবনের এক হাতে চক, এক হাতে ডাস্টার।"
আবার আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রীজাতবাবুর পাঠাংশের বিপ্রতীপে তুলে ধরলেন মফস্বলের প্রাতিস্বিকতা। শেলডন পোলকের সাংস্কৃতিক "কসমোপলিস"-এর ধারণাকে উল্লেখ করেন তিনি, যার সারকথা—সংস্কৃত সাহিত্যের সব চরিত্রই যেন এক, তাতে অঞ্চল প্রবেশ করে না। তারা সর্বত্র সদৃশ, তাদের কোনও আঞ্চলিক বা ভাষা বা অন্য কোনও বৈচিত্র্য নেই। আঞ্চলিক ভাষাগুলো এই সাংগঠনিক সাদৃশ্যকেই ভাঙতে চেয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যেও আঞ্চলিকতা শুরুতে প্রাসঙ্গিক হতে পারেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে যেন এই আঞ্চলিকতার পরিচিতি প্রথমবার তীব্রভাবে নিজেদের জানান দেয়। বঙ্কিমচন্দ্র বা রবীন্দ্রনাথের পরে এই ধারাকে সামগ্রিকভাবে নেতৃত্ব দেন তারাশঙ্কর (রাঢ়বঙ্গে) বা সতীনাথ ভাদুড়ি (বাংলার উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে) বা অদ্বৈত মল্লবর্মন (পূর্ববঙ্গে)। স্বাধীনতা ও দেশভাগ পরবর্তী উদবাস্তুদের কথায় এই আঞ্চলিকতার আভাস খানিক সরে যায়, যেখানে আঞ্চলিকতার জায়গা নেয় দেশভাগ পরবর্তী নগরজীবন। উজ্জ্বলবাবুর উপন্যাসের মফস্বল তার সার্বিকতায় ভাস্বর, সেখানে দেশভাগ নেই, পূর্ববঙ্গ নেই, তার চরিত্র স্বতন্ত্র, কলকাতার প্রায় উপকন্ঠে হুগলিতে তার অবস্থান। কলকাতা অনাঘ্রাত নয়, কলকাতা নাগালের মধ্যে। বিভূতিভূষণের অপুর মতো বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী নগরায়ণ দেখে বিস্মিত হওয়ার উপায় এই উপন্যাসের চরিত্রের নেই। উজ্জ্বলবাবু সাবলীলভাবে এই দ্বন্দ্বকে পেরিয়ে এসেছেন।
এই উপন্যাস, ব্রাত্য বসুর কথায়, প্রকৃতই "আত্মজৈবনিক"। তুলনা করলেন "কেয়া পাতার নৌকো" বা "নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে"-র মত কালজয়ী সৃষ্টির সঙ্গে। উত্তর বিশ্বায়ন যুগে একজন চরিত্র যেন বৈশ্বিকতার জলে ডুবে তার পরিবেশের প্রেক্ষিতে তার "আমি"-কেই বাতিল করে দিতে চায়।
বিশ্বায়নকে আসলে আমরা কেউই অস্বীকার করতে পারি না। আমরা চাই, প্রাক-বিশ্বায়ন কালের কোনও সত্তা আমাদের স্মৃতির ধুলোপড়া ঘরে পড়ে থাকলে মাঝেমধ্যে ঝেড়েমুছে তাকে দেখতে, কখনো তার কাছে ফিরতে। কিন্তু ফেরাটা সবসময় হয় না৷ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সার্থকভাবে যাকে বলেন, "ডুবে যাওয়া আমাদের জীবনে বারবার ঘটে। ডুব আমাদের আছে। কিন্তু আমাদের বরাত ভাল, ভেসে ওঠাও আছে।" তাঁর কথায়, একটু হিসেবনিকেশ করে, প্ল্যান করে বাড়ি বা কারখানা তৈরি হতে পারে, কিন্তু একটা উপন্যাস তৈরি হতে পারে না। "জীবনে কখনো এমন হয়, যেখানে ঘটনা ঘটে যায়, কিন্তু আমি তার নিয়ামক নই।" আমরা সবাই চাই, সৌন্দর্যকে পেতে, কিন্তু সৌন্দর্য সব সময় আমাদের ধরা দেয় না। জীবনযাপন তো একটা অবগাহনের মত। সেই অবগাহনের কথাই ঘুরেফিরে আসে এই উপন্যাসে।
সন্ধ্যার এই অনুষ্ঠান আলোকিত করে ছিলেন বহু বিশিষ্টজন। ছিলেন লেখক উজ্জ্বলবাবু সপরিবারে, সস্ত্রীক, সপুত্রক এবং ছিলেন তাঁর মা, যাকে এই উপন্যাস শ্রদ্ধার সঙ্গে নিবেদন করেছেন তিনি। হয়ত উপন্যাসের আত্মজৈবনিকতার পরশে আমাদের এইটুকুই স্বস্তি জোগায় যে, বাবুর উজানযাত্রার সাক্ষী হতে আজ স্রষ্টা নিজেও এসে পড়েছেন তাঁর আপন উজান স্রোতে। বয়সের অঙ্ককে ষাটে পৌঁছে দিয়ে তিনি পা রাখলেন তাঁর নতুনত্বে, ঔপন্যাসিক পরিচয়ে৷