
শেষ আপডেট: 16 May 2020 10:26
সেদিন রাত সাড়ে দশটা নাগাদ হঠাৎ করে মন ভীষণ ছটফট করে উঠল। শান্ত হতে গীতবিতান খুলে বসলাম। ভাবলাম, বই খুলে যে গানটা প্রথম চোখে পড়বে সেটিই হবে দেবেশকাকুর গান— এই মুহূর্তের গান। এই খেলাটা প্রায়ই চলত মনে মনে। যখন ‘বল্মীক’-এ ওঁর সঙ্গে গান নিয়ে বসতাম। ‘বল্মীক’ ওঁর বাড়ির নাম। ডাক্তারি করতে করতে হারমোনিয়াম টেনে বসে পড়ে গান শোনাতে হত। কী গাই কী গাই। গীতবিতান খুলে যা চোখে পড়বে তা নিয়েই আজ গায়ন আর গানের পাঠ হবে আমাদের। ঠিক সেইমতো কাল রাতে প্রথমেই চোখে পড়ল ‘আকাশ হতে খসল তারা’। আমি চমকে উঠলাম।
‘আকাশ হতে খসল তারা আঁধার রাতে পথহারা
প্রভাত তারে খুঁজতে যাবে— ধরার ধুলায় খুঁজে পাবে
তৃণে তৃণে শিশিরধারা।
দুখের পথে গেল চলে— নিবল আলো, মরল জ্বলে
রবির আলো নেমে এসে মিলিয়ে নেবে ভালোবেসে
দুঃখ তখন হবে সারা।’
এমন কেন হল? শঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল। তারপরই ফোন পেলাম, দশটা পঞ্চাশে তিনি চলে গেলেন।
বিগত কয়েক বছরে আমার দিনযাপনের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন দেবেশ রায়— বাংলা সাহিত্যের এক নক্ষত্র। কিন্তু আমার সঙ্গে নিত্য আনাগোনা চলত রবীন্দ্রনাথের সুর ও বাণীর বুনোটে বোনা এক অন্য দেবেশ রায়ের— যাঁর চোখ দিয়ে আমি রবীন্দ্রনাথের মতো সূর্যের নাগাল পাই।
সঙ্গীতগুরু কাকলি রায়ের চলে যাওয়ায় আমার টুকরো টুকরো আমিকে মানিয়ে-গুছিয়ে নতুন গুরুর কাছে হাজির হয়েছিলাম এক শুক্রবারের সকালে। সেখানে সেই বাতায়ন, আকাশ, খোলা হাওয়ায় সেই হারমোনিয়াম, সেই গীতবিতানেই গাওয়া শুরু হল। এই গুরু সুরের গুরু নন। তিনি কাব্যের গুরু, ভাবের গুরু, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ এক বিদগ্ধ চিন্তাশীল অনেক উঁচু দরের শ্রোতা, যাঁর মন্ত্রে গীতবিতানের গানগুলো বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসত চোখের সামনে। সব অনিশ্চয়তা কেটে গিয়ে ফুলের মতো ফুটে উঠত এক একটি গান।
গান নিয়ে বসলে দীর্ঘ সময় কেটে যেত। কত গল্প যে চলত সঙ্গে সঙ্গে। সকালে হাসপাতাল যাওয়ার আগে ওঁর কাছে ঘুরে যেতাম সপ্তায় একবার। ছাড়তে চাইতেন না। হাসপাতাল পৌঁছতে দেরি হয়ে যেত। কিন্তু দূর দিয়ে হেঁটে চলা একটা গানকে নিমেষে নিকটে এনে দিতেন। ওঁর ভাবনার সেই মণিমুক্তো নিয়ে আহ্লাদে বেরিয়ে আসতাম ‘বল্মীক’ থেকে। গান নতুনভাবে উন্মোচিত হত। বারবার বলতেন গীতবিতান পাঠের গুরুত্বের কথা। গীতবিতান শুধু গাইবার বই নয়, পাঠ করাও জরুরি। খাটের পাশে গীতবিতান তাঁর সবসময়ের সঙ্গী ছিল। বলতেন, “এমন সুর দিয়ে তৈরি একা মানুষ গীতবিতানের বাইরে পৃথিবীতেই কোথাও নেই।”
এমনিভাবেই ‘গান্ধার’-এর অনুষ্ঠানের আগে তিনি আমাদের তৈরি করতেন। স্নেহে ও শাসনে— অনুভবের গান তৈরি করার ওপর জোর দিতেন। অনুষ্ঠানে ওঁর নিজের বক্তব্যের সঙ্গে গাইবার জন্য আমায় নিয়ে যেতেন। কত সময় আমাদের বাড়িতে এসেও গান তৈরি করে দিয়েছেন। সুর-তাল-লয়ের পাশাপাশি ভাবানুষঙ্গ যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়নরীতির অন্তর্গত সেটা বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর পাশে বসে রবীন্দ্রনাথের গানের গভীরতার যথার্থ রূপদান— কণ্ঠে সেই ব্যাপ্তির প্রকাশ এবং প্রতিষ্ঠা করার আকর্ষণ আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। ছুটে ছুটে যেতাম ওঁর কাছে। যখন যে গান যেভাবে চাইতেন, ঠিক না গাওয়া অবধি ছাড়তেন না। বারবার গাইতে হত। সাহিত্যিক দেবেশ রায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীতে এমন নিত্য ওঠাবসার ছবি হয়তো সবার জানা নেই। তাঁর দীর্ঘদিনের ঘরকন্না ছিল কাকলি রায়ের সঙ্গে। যিনি অনায়াস জাদুতে এক একটি গানের মূল ভাবনা সহজেই কণ্ঠে প্রকাশ করে ফেলতেন।
এমনই একটি অনুষ্ঠানে ‘সার্থক জনম’ গাইয়েছিলেন আমায়। তার আগে তিন মাস ধরে আমরা ওই গানটার সার্থক রূপ দেবার চর্চা করছিলাম। সেই গান তুলতে গিয়ে একটা গল্প শুনেছিলাম।
শান্তিনিকেতনে ‘আনন্দধারা’-য় গেছেন দু’জন মানুষ। দেবেশ রায় ও কাকলি রায়। দেখা করবেন ঐশ্বরিক কণ্ঠমাধুর্যের অধিকারিণীর সঙ্গে। তিনি কাকলিদিরও গুরু। এলেন তিনি বাইরে। বাদশাহি মোহর। দেবেশ রায় তাঁকে অনুরোধ জানালেন ‘সার্থক জনম’ গানটি শোনানোর জন্য।
মোহরদি বললেন, “ওটা সুচিত্রার গান।”
দেবেশ রায় বললেন, “আপনারাই এই ভাগাভাগি করেছেন। এটা কণিকার গান, ওটা সুচিত্রার গান— আসলে এ সবই তো একজনেরই— রবীন্দ্রনাথের গান। আপনার গলার যে দরদ— আপনি অন্তরের বেদনাটা আরও গভীর থেকে চেপে দিয়ে যেভাবে সুরে ফুটিয়ে তোলেন সেভাবেই আমি শুনতে চাই।”
তিনি চুপ করে শুনলেন। তারপর উঠে ভেতরে চলে গেলেন। দেবেশ ও কাকলি বাইরের ঘরে বসে। ফিরে এলেন বেশ খানিক পর। আঁচলটা গায়ে সামনের দিকে এনে জড়ানো। গানটা যেন অভ্যাস করে এলেন ভেতর থেকে। বললেন, “এমন করে আমাকে আগে কেউ বলেননি। গান এভাবে বিশ্লেষণও করেননি। দেবেশের মতো শ্রোতা পাওয়া দুষ্কর।”
তিনি গাইলেন। ওই ঐশ্বর্যমণ্ডিত গলায় ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে/সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে।’ দ্বিতীয় ‘সার্থক’-এ সুর ওপর দিকে উঠছে কিন্তু গলাটা চেপে দিয়ে তিনি অন্তর্নিহিত বেদনা টেনে আনলেন।
গান শেষে তিনজনেরই চোখে জল। এমন গভীর থেকে উঠে আসা মোহরদির সেই গান— রবীন্দ্রনাথের গভীর উপলব্ধি— পরাধীন অসহায় দেশমায়ের জন্য কোমল অনুভূতি— চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ল।
দেবেশকাকু আমায় গানটি বোঝালেন এমনি করে— “গানটি মূলত একটি শব্দেরই গান। ‘সার্থক’। আর কোনও বাণী ছাড়া শুধু ‘সার্থক’ বললেই গানটির অর্থ প্রকাশ করা যায়। বোঝানোর জন্য বাকি বাণীগুলো আসছে। গানটির মূল বক্তব্য ‘সার্থক’। প্রথম ‘সার্থক’-টি স্পষ্ট — গর্ববোধের সার্থক। ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’। এটা সর্বজনীন। দ্বিতীয় ‘সার্থক’-টি পারসোনালাইজ হয়েছে— ‘মাগো তোমায় ভালোবেসে’। তাই দ্বিতীয় ‘সার্থক’-এ কোনও জোর বা গর্বভাব প্রকাশ পাবে না। ওটা অনেক গভীর উপলব্ধির। সা... ধা (কোমল) সুর উঠছে। কিন্তু গলাটা চেপে যাবে। সেটা সুচিত্রাদি গেয়েছেন খোলা গলায় ওপরে তুলে— সেটাই চেপে, ভরপুর আবেগে মোহরদির মতো গাইতে হবে দ্বিতীয় ‘সার্থক’। প্রথম ‘সার্থক’-ই গানের মূল বক্তব্য। ‘সার্থক’ বলার পর তাই থামতে হবে। একেবারে থামা। শ্রোতা মনে করবেন এখানেই গানের শেষ বুঝি— গায়ক বাণী ভুলে থেমে গেলেন না তো? সেই ভাবনাটুকুর উৎস থেকেই শুরু হবে ‘জনম আমার’ — ফ্র্যাকশন অব সেকেন্ডের বিরতি দিয়ে।”
এমন গভীর উপলব্ধিই ছিল দেবেশ রায়ের শিক্ষা। গানের ভেতর থেকে গান জাগিয়ে তুলবার গায়কি।
যখন-তখন গান গাইবার বা ভাবনার নির্দেশ আসত। একবার স্পিতি বেড়াতে গেছি, গাড়িতে তখন, ওঁর তলব এল ফোনে— ‘‘হাওয়া যেমন পাতায় পাতায় গানটির প্রথম চরণটি যেন কী?’’
“আজ যেমন করে গাইছে আকাশ।”
“গানটা পাঠাবেন আমায়? খুব দরকার।”
মোহরদির গলার সেই গান পাঠিয়ে দিলাম ইন্টারনেটে। তিনিও তখন তিতিরের সঙ্গে ঘুরছেন কল্পা-কিন্নর। কলকাতায় ফিরে পেলাম ‘হাওয়া যেমন’-এর প্রথম কিস্তির লেখাটা।
সেই মানুষের গৃহবন্দি একাকিত্ব আর সইল না এই লকডাউনে। মানুষ ভালবাসতেন। সকলকে নিয়ে থাকতে চাইতেন সবসময়। তাঁকে একা রেখে আমরাও স্বস্তিতে ছিলাম না। সবসময় মনে হত ছুটে যাই। ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার ছুতোয় লকডাউনের শুরুতে ছুটেও গেছিলাম একবার, আমি ও আমার স্বামী সুমন, সেও ডাক্তার। তারপর যেতে সাহস হত না। যদি আমাদের রোগী-ঘাঁটা শরীর থেকে কোনও ছোঁয়া চলে যায় ওঁর অশীতিপর শরীরে। সইবেন কী করে! ছোঁয়া বাঁচাতেই দূরত্ব এল। সেই ফাঁকেই চলে গেলেন ধরাছোঁয়ার ওপারে।
প্রায় রোজই হোয়াটসঅ্যাপে লিখতেন। বলতেন, “আসবেন একদিন, কতদিন আপনাদের তিনজনকে একসাথে দেখিনি, সুমনের ছবি দেখিনি কতদিন। গান ও গায়ন নিয়ে বসাও হয়নি কতকাল।”
শারীরিক অসুবিধার কথা কিছু জানাননি তিন দিন আগেও। শুধু একাকিত্বের অসহায়তা ছিল আকণ্ঠ। প্রায়ই জানতে চাইতেন, “কোনও কি আশা আছে?” এ মারণরোগ কি কমতে পারে এই নিয়ে সংশয় ও হতাশা প্রকাশ করতেন। একদিন লিখলেন— “সন্ধে ৬.৩০ থেকে ৮.৩০— এই সময়টা যদি আমরা কোনও গান নিয়ে গল্প করতে পারি তা হলে মনটা হয়তো ভাল লাগতে পারে। দু’টি ঘণ্টা গান সহ কথা বললে গানের সুর ও কথা আমার শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে।”
চেষ্টা করতাম ফোনে মাঝে মাঝে গান শোনাতে। সবসময় পেরে উঠতাম না কাজের ভিড়ে। আমি, আমার কন্যা দু’জনেই। মেয়ের গান শুনে একদিন খুব খুশি হলেন। ভিডিও কল করেও কথা বলেছিলাম দু-একবার। ‘আমার আর হবে না দেরি’ গানটি শুনতে চেয়েছিলেন।
মঙ্গলবার যখন দেখতে গেলাম, বাইরের ঘরে এসে বসে কথা বললেন। বললেন, “আমার টাইম ওরিয়েন্টেশনটা কেমন পাল্টে যাচ্ছে, দিন-রাত তফাত করতে পারছি না।” বোন চলে গিয়েছেন সপ্তাখানেক আগে। কী সাংঘাতিক মানসিক যন্ত্রণায় ছিলেন।
সুমনের নেশা ফটোগ্রাফি। সুমনের ছবি দেখতে খুব ভালবাসতেন। আমাদের সঙ্গে এসে থাকতে চাইতেন। সেদিনও বললেন, “আমাকে কি নিয়ে যাবেন?” বাড়িতে এলে গানে-গল্পে-ছবিতে আমাদের সময় নিমেষে উধাও হয়ে যেত। কী অসম্ভব স্নেহ পেয়েছি, তার কোনও মাপজোক হয় না। ছোট চেহারার দীর্ঘ মাপের মানুষ।
স্নেহের হাত মাথায় রাখলে আপনিই মন শান্ত হয়ে যেত। বলতাম, “আপনি গানের ভেতর দিয়ে কীভাবে পথ হাঁটেন?” এত গভীরভাবে রবীন্দ্রনাথের গানে ডুব দেওয়ার পাঠ শিখেছি তাঁর কাছেই। দু’দিন পরপর লিখতাম, “আপনি ভাল থাকবেন, তবেই আমরা ঠিক থাকব।” শুনলেন না। চলে গেলেন— বাঁধনছেঁড়ার মহোৎসবে। আমার অপূরণীয় ক্ষতি করে দিয়ে।
কর্মজগৎ, সংসার, সব ব্যস্ততা সামলে ওঁর কাছে গিয়ে অভাবনীয় শান্তি আর আনন্দ পেয়েছি। সেই তিনি আগুনে প্রবেশ করছেন— আমি অবাক হয়ে চেয়ে আছি রতনবাবু ঘাটে। ভাবছি, এই মানুষটা— এই এত বড় মানুষটাকে এত নিবিড় করে পেয়েছিলাম— এ কি সত্যি! এত ভাগ্যও আমার ছিল!
লেখক রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, পেশায় চিকিৎসক।