
শেষ আপডেট: 25 December 2020 02:10
ইতিহাস বলছে, ১৭৪২ সালে মহিষাদলের রানি জানকী দেবী বর্গি হানা ও জলদস্যুদের হাত থেকে রাজত্ব বাঁচানোর জন্য গোয়া থেকে ১২ জন অসমসাহসি ও শক্তিশালী পর্তুগিজ সৈন্যের গোলন্দাজ বাহিনী মহিষাদলে নিয়ে আসেন। মহিষাদলের গেঁওখালিতে মীরপুর গ্রামে বসবাস শুরু করেন ওই সৈন্যরা। সেই থেকেই মীরপুরে পর্তুগিজ কলোনি তৈরি হয়। ওই সৈন্যদের জলপথে লড়াইয়ের বিশেষ অভিজ্ঞতা থাকায় বর্গি-হানার হাত থেকে রেহাই পায় মহিষাদল। এর পুরস্কারও মেলে হাতেনাতে। রানি জানকী হুগলি–হলদি–রূপনারায়ণ নদীর মিলনস্থলের কাছে গেঁওখালির ওই মীরপুরে, অনেকটা নিষ্কর জমি উপহার দেন পর্তুগিজদের। সেই থেকেই মীরপুর হয়ে ওঠে পাকাপাকি ভাবে পর্তুগিজদের গ্রাম।
তার পরে সময় গড়িয়েছে। জল বয়ে গেছে রূপনারায়ণ দিয়ে। ১২ জন সৈন্যের দল বংশবৃদ্ধি করেছেন ক্রমে। সঙ্গী হিসেবে অবশ্য স্থানীয় মেয়েদেরই বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা। কারণ কোনও সৈন্যই পরিবার নিয়ে আসেননি যুদ্ধ করতে। রানি জানকী দেবীর জমিজমা ছেড়ে ফিরেও যাননি তাঁরা। শোনা যায়, ১২ জন সৈন্য ১২টি পৃথক পদবীর মানুষ ছিলেন। রোজারিও, নুনিশ, গোমেজ, পেড্রা, টেসরা, লোবো, রথা, ডি'ক্রুজ প্রমুখ। তাঁদের বিয়ে করে ধর্মান্তরিত হন বাঙালি মেয়েরা। নামও বদলে যায় তাঁদের।
বংশ পরম্পরায় সেই রক্তই বহন করে আসছেন মীরপুরের মানুষ। তবে সে রক্তে ক্রমেই মিশেছে বাঙালিয়ানা। ভাষা বদলেছে ধীরে ধীরে। চোখের মণির রং নীল থেকে কালোর দিকে পৌঁছেছে। রান্নাঘরের সুস্বাদু সব পর্তুগিজ পদ বদলে গেছে বাঙালি মাছ-ভাতে। পেটানো চেহারাতে জুড়ে গিয়েছে বাঙালি ভুঁড়ির ছোঁয়া। তুলসীতলা আর মাতা মেরির থান পাশাপাশি গড়ে উঠেছে গেরস্থের উঠোনে। বহু বছর একসঙ্গে থাকার পরে হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষকেই বিয়ে করেছেন এঁরা। গৃহবধূরা কপালে সিঁদুর, পরনে শাড়ি, হাতে শাঁখা-পলা পরে চার্চে গিয়ে প্রার্থনা করেন। কিন্তু পর্তুগিজদের এই গ্রাম এখনও লোকমুখে পরিচিত 'ফিরিঙ্গি পাড়া' বলে।
সবই গেছে। আছে কেবল আবেগটুকু। তাই তো আজও পর্তুগালের খেলা হলে সারা রাত জেগে টিভিতে চোখ ঠেকিয়ে বসে থাকেন গ্রামের আবালবৃদ্ধবণিতা। পর্তুগাল জিতলে মাংস ভাত হয় ঘরে ঘরে, হারলে হাঁড়ি চড়ে না।
এ সবের মাঝে আসে বড়দিন, আসে ইস্টার। সব ভুলে সারা গ্রাম মেতে ওঠে উৎসবে। সাজানো হয় চার্চগুলি। প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয় সবাই মিলে। কেক-মাংসের আয়োজন কবেই বদলে গেছে বাঙালি পোলাও-কালিয়ায়। তাই পেট ভরে খান সকলে। ২৫ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি চলে মেলা। বাংলা গানের আসর বসে সেখানে। খোল-কর্তাল বাজিয়ে গাওয়া হয় খ্রিস্ট-কীর্তন।
গ্রামের এক মধ্যবয়সি বাসিন্দা স্বপন তেসরা বলছিলেন, "আমার বাবার চোখের মণি নীল ছিল। আমারটা আর হল না। ভাষাটাও জানি না। ওটা জানলে অন্তত নিজেকে দাবি করতে পারতাম পর্তুগিজ বংশের সন্তান বলে। এখন শুধু জানি, আমার গায়ে রয়েছে ওই রক্ত। প্রমাণ বলতে কিছুই নেই। আমরা এখন পুরোদস্তুর ভারতীয়ই। কিন্তু শেকড়ের কথা মনে হলেই হুহু করে ওঠে মনটা!"
দেখুন কী বলছেন সে গ্রামের মানুষজন।
https://www.youtube.com/watch?v=-7M_943UjMg&feature=youtu.be
অ্যাকাউন্ট্যান্সি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র জিমি তেসরা বলে, "এখন খেলার সঙ্গেই আমাদের আবেগটা জুড়ে আছে। তার বাইরে, কেউ বলে না দিলে আমরা আমাদের ইতিহাস হয়তো জানতেও পারতাম না। রয়ে গেছে শুধু পদবীগুলো। পর্তুগিজের মানুষের সঙ্গে ফেসবুকে একবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম আমরা। কিন্তু ওঁরাও তেমন গুরুত্ব দেননি। আমরা হয়তো বোঝাতেই পারিনি, কোন দিক থেকে আমরা পর্তুগালের সঙ্গে যুক্ত।"
হেমন্তের বেলা গড়িয়ে যায়। অন্ধকার নেমে আসে গ্রামের মেঠো পথঘাটে। জাতিসত্ত্বায় ভারতীয়, সংস্কৃতিতে বাঙালি, অথচ আবেগে পর্তুগিজ একটা গ্রামে জেগে ওঠে ঝিঁঝির দল। রোজারিও, ডি'ক্রুজ, তেসরা পরিবারগুলি চার্চের ঘণ্টায় খুঁজে নেয় নিজেদের পরিচয়।