কলকাতায় রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের প্রবল বিরোধিতার মুখেও দমেননি স্বামী বিবেকানন্দ। মাদ্রাজের প্রিয় শিষ্যের সহায়তায় শিকাগো পৌঁছে বিশ্বমঞ্চে ভারতের আধ্যাত্মিক কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন তিনি।

স্বামী বিবেকানন্দ
শেষ আপডেট: 12 January 2026 12:33
নরেন্দ্রনাথ দত্তের সন্ন্যাস নেওয়ার বিষয়ে সে যুগে জলঘোলা হয়েছিল বিরাট। কায়স্থ-সন্তানের সন্ন্যাসী হওয়াকে কলকাতার গোঁড়া রক্ষণশীল সমাজ যেমন ভালচোখে দেখেনি, তেমনই তাঁর কলকাতার সনাতনী এবং বাংলার সাধুসমাজও নাখুশ ছিল। ১৮৮১ সালে নরেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে রামকৃষ্ণ পরমহংসের পরিচয় হয় এবং ধীরে ধীরে তাঁর একনিষ্ঠ শিষ্য হয়ে ওঠেন। ‘নরেন্দ্রনাথ’ থেকে ‘স্বামীজি’ হয়ে ওঠা আসলে এক অর্থে বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের পালাবদলও বটে।
ইতিহাস বলছে, ১৮৮৮-১৮৯৩ সাল পর্যন্ত স্বামী বিবেকানন্দ ভারতব্যাপী রামকৃষ্ণের উপদেশ ও বাণী ছড়িয়ে দেন। সেই সূত্রেই পৌঁছন মাদ্রাজে। কথায় আছে, সবটাই আগে থেকে লেখা থাকে। মাদ্রাজ থেকেই যে তাঁর শিকাগো যাত্রা শুরু হবে, তা হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না।
স্বামী বিবেকানন্দ যখন মাদ্রাজে পৌঁছন তখন সেখানকার একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক আলাসিংগা পেরুমল হিন্দু ধর্ম প্রচারে ব্যস্ত। অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এই মানুষের সঙ্গে স্বামীজির দেখা হয়। মাদ্রাজে স্বামীজির বক্তৃতার আয়োজন করেছিলেন তিনি। মাত্র ৩০ বছর বয়সি একজন ধর্ম প্রচার করছেন, তাঁর কথা শুনতে মুখিয়ে রয়েছে লোকজন, এটা দেখে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সেই মানুষকে, যাকে আলাসিংগা বেশ কিছুদিন ধরে খুঁজছিলেন।
আলাসিংগা আসলে হিন্দু ধর্মের একজন কাউকে চাইছিলেন যিনি শিকাগোয় গিয়ে বক্তৃতা দেবেন। মাদ্রাজে হিন্দু সমাজের মানুষদের একাধিকবার বললেও কেউ যেতে রাজি হননি। কাউকে তিনি বোঝাতেই পারেননি বক্তৃতার গুরুত্ব। কিন্তু স্বামীজি বুঝেছিলেন। রাজি হয়েছিলেন যেতে। স্বামীজির মধ্যে সেই যোগ্যতাও দেখেছিলেন আলাসিংগা। তাই তিনি শুধুমাত্র স্বামীজিকে শিকাগো যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এমন নয়। বরং প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন। প্রথমবারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিন্তু দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় সাফল্য আসে। বহু মানুষ আর্থিক সাহায্য করেন। তার মধ্যে মাইসোরের মহারাজ, হায়দরাবাদের নবাবরাও ছিলেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দর প্রতি আলাসিংগার ভক্তি এতটাই বেড়ে গিয়েছিল, যে তিনি নিজে স্বামীজির মালপত্র বয়ে আমেরিকাগামী জাহাজে তুলে দেন।

এক বাঙালি যখন বিদেশ জয় করতে যাচ্ছেন তখন কলকাতার গর্ব হওয়া তো দূর, এখানকার বাঙালিরা, রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের লোকজন এর বিরোধিতা করতে শুরু করেন। স্বামীজি সেই সময় সারা বিশ্বে ভারতের নাম উজ্জ্বল করছেন। অন্য ধর্মের সমালোচনা না করে হিন্দুধর্মকে প্রতিষ্ঠার জন্য বক্তব্য রাখছেন, বিশেষ রামকৃষ্ণ মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন দিকে দিকে। বিদেশিরা তাঁর বক্তৃতা শোনার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন।
তখন আমাদের কলকাতার সমাজ স্বামীজির বিরুদ্ধে বিরূপ আলোচনায় সরব। চারিদিকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে 'হিন্দুর পক্ষে সমুদ্রযাত্রা যখন নিষেধ তখন স্বামীজি গেলেন কী করে? এ যে হিন্দু ধর্মের আপমান!' কয়েক জন তো এই মর্মে সরব হলেন- 'আমেরিকা ঠাণ্ডা দেশ, সাহেবদের দেশ। সেখানে ইজের পরতে হয়। স্বামীজি সন্ন্যাসী, গায়ে গেরুয়া বস্ত্র। তিনি কী করে ইজের পরবেন?'
যদিও এই তুচ্ছ বিতর্কেকে কোনওদিনই খুব একটা পাত্তা দেননি বিবেকানন্দ। কিন্তু যখন আমেরিকায় পৌঁছলেন তিনি, তখন একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হন। তাঁর কাছে যা চেক ছিল তা হারিয়ে ফেলেন। যেটুকু টাকা নগদ হিসেবে ছিল, তাও ফুরিয়ে আসতে থাকে। এদিকে শিকাগোতে শীত শুরু হয়ে গিয়েছিল। অথচ তাঁর কাছে শীতের পোশাক বা গায়ে দেওয়ার মতো তেমন কিছু ছিল না। একদিন রাতে তিনি কোথাও থাকতে না পেরে রেল স্টেশনে শোওয়ার কথা ভেবেছিলেন। চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু ভারতের মতো আমেরিকায় সে নিয়ম তখন ছিল না। ফলে তিনি একটি খালি বাক্সের মধ্যে সারা রাত কাটান।

এখানেই সমস্যার শেষ নয়। স্বামীজি হঠাৎ জানতে পেরেছিলেন, তিনি সম্মেলনে যোগ দিতে পারবেন না, কারণ তাঁর রেজিস্ট্রেশন শেষ হয়ে গিয়েছিল সম্মেলনের তিন সপ্তাহ আগে। এই দুর্যোগের সময় তিনি কিছুটা হতাশ হয়ে আলাসিংগার কাছে একটি চিঠি লেখেন।
আলাসিংগা তৎক্ষণাৎ কিছু টাকা পাঠিয়ে দেন। এর মধ্যে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইট স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে দেখা করেন এবং তিনি তাঁকে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করেন। অধ্যাপক রাইট স্বামীজিকে বলেছিলেন, 'আপনার যোগ্যতা জানতে চাওয়া, সূর্যের কাছে তার আলো দেখানোর অধিকার জানতে চাওয়ার মতো।' তিনি সম্মেলনের চেয়ারম্যানকে চিঠি লেখেন এবং বলেন, 'এখানে একজন ব্যক্তি আছেন, যিনি আমাদের এখানকার সকল পণ্ডিতের চেয়ে বেশি জ্ঞানী।' অধ্যাপক রাইটই এরপর বাকি দায়িত্ব নেন ও অর্থ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বন্দোবস্ত স্বামীজিকে করে দেন।
১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, শিকাগোতে বিশ্ব ধর্ম সম্মেলন শুরু হয়। প্রথম দিনেই, অন্যান্য বক্তাদের পর, স্বামী বিবেকানন্দকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য বলা হয়। তিনি যখন 'সিস্টার্স অ্যান্ড ব্রাদার্স অফ আমেরিকা' বলে বক্তৃতা শুরু করেন, তখন সেখানে উপস্থিত সাত হাজার শ্রোতা দাঁড়িয়ে পড়েন। সম্মান জানান। এই পাঁচটি শব্দই ইতিহাস সৃষ্টি করে। তাঁর বক্তৃতা এতই অসাধারণ ছিল যে, এক রাতের মধ্যে তিনি শিকাগো শহরে জনপ্রিয় হন।

সম্মেলনে তিনি আরও পাঁচটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। শিকাগো ধর্ম সম্মেলন শেষে একটি ষোলোশ পৃষ্ঠার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, যার শুরুতেই নাম ছিল স্বামীজির। লেখা হয়েছিল, 'স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতা এবং পশ্চিম বিশ্বের কাছে তাঁর জ্ঞান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে, তিনি সত্যিই বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত।'
এই সম্মেলন থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর, তা নানা দেশে পরে ছড়িয়ে পড়ে। আমেরিকা ও ইউরোপের একাধিক দেশে স্বামীজি বক্তৃতা দেন। যে মাদ্রাজ থেকে শিকাগো যাত্রা শুরু হয়েছিল, ১৮৯৭ সালে সেখানেই ফিরে আসেন। পথে ঘাটে, অলিগলিতে লোকজন তাঁরে সংবর্ধনা জানান, শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দেন। গোটা দক্ষিণ ভারতে তিনি 'ভগবান' হয়ে ওঠেন। এখনও বাড়িতে বাড়িতে তিনি পূজিত হন।

নরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার গল্পটাও এখানেই নিহিত রয়েছে। এই শিকাগো যাত্রার জন্য তাঁকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন রাজপুতানার ক্ষেত্রী রাজা অজিত সিং। তিনিই স্বামীজিকে স্বামী বিবেকানন্দের নামটি দিয়েছিলেন। বিখ্যাত ফরাসি লেখক রোমাঁ রোল্যাঁন্ডও তাঁর বই 'দ্য লাইফ অফ বিবেকানন্দ অ্যান্ড দ্য ইউনিভার্সাল গসপেল'-এ এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তাঁর লেখা অনুযায়ী, ১৮৯১ সালে শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম সংসদে যাওয়ার জন্য স্বামীজি শুধুমাত্র রাজার পরামর্শে এই নামটি গ্রহণ করেছিলেন।
শিকাগো, স্বামী বিবেকাননন্দ ও তাঁর যাত্রা পথে যিনি নেপথ্য নায়কের মতো থেকে গেছেন, তিনি হলেন আলাসিংগা পেরুমল। স্বামীজি যাঁকে তাঁর প্রিয় শিষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বার বার। বিবেকানন্দ একাধিকবার বলেছেন, 'দুনিয়ায় খুব কম মানুষ আছেন, যাঁরা আলাসিংগার মতো অকৃপণ, কঠোর পরিশ্রমী, এবং আত্মনিবেদিত। ওঁর প্রতি আমার ঋণ কখনও শোধ করতে পারব না।'
