১ জানুয়ারি কাতারে কাতারে মানুষ ভিড় জমান দক্ষিণেশ্বর (Dakshineswar), কাশীপুর উদ্যানবাটীতে (Kashipur Udyanbati)।

কাশীপুর উদ্যানবাটিতে রামকৃষ্ণ জীবনের শেষ দিনগুলি অতিবাহিত করেছিলেন।
শেষ আপডেট: 31 December 2025 15:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কল্পতরু সেই বৃক্ষ, যার কাছে ভালো-খারাপ, যা চাওয়া যায়, তা-ই মিলবে। স্বামী ব্রহ্মানন্দের কথায়, ‘দেবত্ব চাইলে দেবত্ব, পশুত্ব চাইলে পশুত্ব।’ আর এখানেই কল্পতরু উৎসবের দর্শন নিহিত রয়েছে। ১ জানুয়ারি কাতারে কাতারে মানুষ ভিড় জমান দক্ষিণেশ্বর (Dakshineswar), কাশীপুর উদ্যানবাটীতে (Kashipur Udyanbati)। বছরের প্রথমদিনে দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর দর্শন তো বটেই, সঙ্গে এই দিনের আরও একটি গুরুত্ব রয়েছে রামকৃষ্ণ ভাবাশ্রিত ভক্তদের মধ্যে। কারণ, এদিন পালিত হয় কল্পতরু উৎসব (Kalpataru Utsav)।
কাশীপুর উদ্যানবাটিতে রামকৃষ্ণ জীবনের শেষ দিনগুলি অতিবাহিত করেছিলেন। রামকৃষ্ণ অনুগামীরা এই উৎসবকে "ঠাকুরের বিশেষ উৎসব"গুলির অন্যতম উৎসব হিসেবে গণ্য করেন। ১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রথম কল্পতরু উৎসবের দিনটি রামকৃষ্ণ ও তাঁর অনুগামীদের জীবনে ছিল এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। রামকৃষ্ণ সেই সময়ে দুরারোগ্য গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থারও যথেষ্ট অবনতি হয়েছিল। উত্তর কলকাতার কাশীপুর অঞ্চলের একটি বাগানবাড়িতে চিকিৎসার সুবিধার জন্য তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ১ জানুয়ারি একটু সুস্থ বোধ করায় তিনি বাগানে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন।
তাঁকে ঘিরে ছিলেন গৃহীভক্তরা। সেখানেই উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরের অন্যতম শিষ্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ। নাট্যকার রামকৃষ্ণের উদ্দেশে বলেন, “তুমি আর কেউ নও, নররূপধারী পূর্ণব্রহ্ম ভগবান। আমার মতো পাপীতাপীদের মুক্তির জন্য নেমে এসেছ।” এই কথার প্রত্যুত্তর করলেন ঠাকুর। বললেন, “এ আর তোমাদের কী বলিব? তোমাদের চৈতন্য হউক” এদিন ভক্তদের চৈতন্যদান করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। এরপরই সমাধিস্থ হয়ে যান ঠাকুর। তাঁর প্রত্যেক শিষ্যকে স্পর্শ করেন। রামকৃষ্ণ-অনুগামীদের মতে, তাঁর স্পর্শে সেদিন প্রত্যেকের অদ্ভুত কিছু আধ্যাত্মিক অনুভূতি হয়েছিল। তাঁর গৃহীভক্তরা ঠাকুরের শরণে ধন্য হন। তাঁর এক গৃহী ভক্তের কথায়, ঠাকুর তাঁদের চৈতন্যদান করামাত্রই প্রত্যেকের মনেই ইচ্ছাপূরণের এক অত্যাশ্চর্য প্রতিফলন ঘটতে থাকে।
রামকৃষ্ণের অন্যতম শিষ্য রামচন্দ্র দত্ত ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, সেইদিন রামকৃষ্ণ পরমহংস হিন্দু পুরাণে বর্ণিত কল্পতরুতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনিই এই দিনটিকে কল্পতরু দিবস নাম দিয়েছিলেন, যা পরে কল্পতরু উৎসব নামে পালিত হতে শুরু করে। এক গৃহী ভক্তের কথায়, ঠাকুর তাঁদের চৈতন্যদান করামাত্রই প্রত্যেকের মনেই ইচ্ছাপূরণের এক অত্যাশ্চর্য প্রতিফলন ঘটতে থাকে। সেদিন ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হওয়ার পরই ভক্তরা বলতে থাকেন ‘ওরে, কে কোথায় আছিস? শিগগির ছুটে আয়! ঠাকুর আজ ‘কল্পতরু’ হয়েছেন।’ উল্লেখ্য, এই দিন রামকৃষ্ণের গৃহী শিষ্যরাই তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সন্ন্যাসী শিষ্যেরা সেই দিন তাঁর কাছে ছিলেন না।
হরিবংশ পুরাণে উল্লেখ রয়েছে কল্পতরু বৃক্ষের কথা। শোনা যায় যে দেবতা ও অসুরদের সমুদ্র মন্থনের সময়ে একটি বৃক্ষ উঠে এসেছিল। এটি অমৃত, লক্ষ্মী, ঐরাবত ইত্যাদির সঙ্গে সমুদ্র মন্থনে উঠে আসে। নাম পারিজাত বৃক্ষ। পরবর্তীকালে দেবরাজ ইন্দ্রর নন্দন কাননে এই পারিজাত বৃক্ষ স্থান পায়। স্ত্রী সত্যভামার আবদারে কৃষ্ণ পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলেন এই বৃক্ষকে। এই বৃক্ষকে কল্পতরু বলা হয়, কারণ এই বৃক্ষের কাছে যা চাওয়া হয় তাই পাওয়া যায়।