আমেরিকার পরে অ্যাটম বোমা, হাইড্রোজেন বোমা, রাসায়নিক বোমা থেকে জীবাণু অস্ত্র হাতে হাতে ঘুরলেও আরেকটি মহাযুদ্ধ আর শুরু হয়নি। অস্ত্র ও পেশিশক্তির জায়গা এখন নিয়েছে অর্থনৈতিক জবরদখল, অভিযান, ঋণ ও আর্থিক বা বাণিজ্য অবরোধ।

পরপর দুটি পরমাণু বোমায় বিধ্বস্ত জাপানি রাজতন্ত্র নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে মিত্রশক্তির সামনে।
শেষ আপডেট: 2 September 2025 17:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল ৮০ বছর আগে ২ সেপ্টেম্বরে। পরপর দুটি পরমাণু বোমায় বিধ্বস্ত জাপানি রাজতন্ত্র নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে মিত্রশক্তির সামনে। গোটা পশ্চিমী দুনিয়া আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠলেও সেই থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্ব রাজনৈতিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এক শীতল লড়াই। আমেরিকার পরে অ্যাটম বোমা, হাইড্রোজেন বোমা, রাসায়নিক বোমা থেকে জীবাণু অস্ত্র হাতে হাতে ঘুরলেও আরেকটি মহাযুদ্ধ আর শুরু হয়নি। অস্ত্র ও পেশিশক্তির জায়গা এখন নিয়েছে অর্থনৈতিক জবরদখল, অভিযান, ঋণ ও আর্থিক বা বাণিজ্য অবরোধ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও তারপর শুরু হয় কৃতিত্ব আদায়ের প্রচ্ছন্ন মন কষাকষি। প্রচার সর্বস্ব আমেরিকা শুরু থেকেই কৃতিত্বের পুঁজি ঘরে তোলে। তুলনায় অনেকটাই পিছনে পড়ে গিয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়া ও চিন। কারণ, মহাযুদ্ধের পরবর্তী ইউরোপ একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল ক্ষয়ক্ষতিতে। ইউরোপের খবরদারির জায়গা করে নেয় আমেরিকার মতো পুঁজিবাদী দেশ ও পাল্টা হিসেবে মাথাচাড়া দেয় সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা।
এখন জাপানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের লাভের গুড়ও ঘরে তুলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে কমিউনিস্ট চিন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলি যে প্রচেষ্টাকে নিন্দার আঙুল তুলে দেখানোর চেষ্টায় লেগেছে। বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি অনুষ্ঠানকে ঘিরে বুধবার চিন এক বিরাট আড়ম্বরপূর্ণ কুচকাওয়াজের আয়োজন করেছে। যেখানে উপস্থিত থাকবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন থেকে ২৬টি দেশের নেতারা।
এই অনুষ্ঠানের লক্ষ্য হল, জাঁকজমক ছাড়াও ওয়াশিংটনের প্রশাসনকে বর্তমানের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পরিবেশে যুদ্ধের ইতিহাসের নয়া পাঠ পড়ানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চিন ও রাশিয়া বিজয়ী দেশগুলির মধ্যে ছিল। মঙ্গলবারই রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে একথা বলেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। পুতিনকে শি বলেন, চিন ও রাশিয়া এই দুই দেশই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয়ের মহান দায়িত্ব পালন করেছিল। আর তারপরেই গঠিত রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ অর্জন করেছিল।
শুধু এখানেই শেষ নয়, চিনের অ্যাকাডেমি অফ হিস্ট্রির প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, চিনকে যুদ্ধে সাহায্য করার মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার নিজের স্বার্থ রক্ষা করা। সহযোগিতার জন্য ওরা তা করেনি। আরেকটি সরকারি সংস্থা রেড কালচার ইনস্টিটিউটের মন্তব্য, আমেরিকার সাহায্য ছাড়াই চিন এই যুদ্ধে জেতার অবস্থায় ছিল।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল প্রফেসর বাঙালি বংশোদ্ভূত রানা মিত্র (Rana Mitter) তাঁর বইতে লিখেছেন, দ্বিতীয় যুদ্ধে চিন ও আমেরিকা একে অপরের পরিপূরক ছিল। চিনের প্রতিরোধ ছাড়া এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় আমেরিকা শক্তিহীন ছিল। তেমনই মার্কিন অর্থসাহায্য এবং যুদ্ধ পরামর্শ ছাড়া চিনও এই যুদ্ধের শেষ করতে পারত না।
এই প্রেক্ষিতে চলতি বছরে আমেরিকা-চিন সম্পর্ক অত্যন্ত তিক্ত হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে। এই শত্রুতাই চিন আরও বেশি করে রাশিয়াকে কাছে টেনে ধরেছে। কারণ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়ার বিরোধিতা করে শত্রুদেশকে সব ধরনের সাহায্য করছেন ট্রাম্প। গত মে মাসে শি জিনপিং মস্কো গিয়েছিলেন, তো এখন পুতিন এসে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন বেজিংয়ের।
যুদ্ধে চিনের ভূমিকা ও ক্ষমতা প্রদর্শনে দেশাত্মবোধের সিনেমাও বাজারে ছেড়েছে তারা। এ বছরের অন্যতম ব্লকবাস্টার হিট ছবি ডেড টু রাইটস সিনেমায় ১৯৩৭ সালে জাপানি বাহিনীর হাতে চিনের নানজিংয়ে সাধারণ মানুষের গণহত্যার গল্পের বিভীষিকা নিয়ে প্লট তৈরি হয়েছে। এই সিনেমা দেখার পর ৯ বছরের এক বালকের প্রতিক্রিয়া হল বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে বলেছে জাপানিদের সে ঘেন্না করে। এই ছবিটি দেশাত্মবোধ গড় তুলতে চিনের স্কুলে স্কুলে দেখানো হয়েছে। শিশুর মতো বড়দের মনেও জাপানি সম্পর্কে তীব্র ঘৃণার পরিবেশ কৌশলে গড়ে তুলছে চিন। তাই এ ধরনের অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্যই হল, বিশ্বের সামনে চিনের প্রতিপত্তি হাজির করা। তারা চাইছে সামরিক শক্তি হিসেবে ক্ষমতা জাহির করতে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রসঙ্গে নিজেদের তৈরি বক্তব্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে। চিন নিজেকে সুবিচারের রক্ষক, বিজয়ী ও বিশ্ব নিয়ন্ত্রক হিসেবে জাহির করতে চায়, বলেছেন এশীয় অঞ্চলের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক চিন্তাশীল লেখক উইলিয়াম ইয়াং।