অনেক বাঙালির কাছেই জয়নগরের মোয়া, কমলালেবুর মতো শীতকালীন উৎসবের অঙ্গ হিসেবে যোগ হয়েছে কেক-এর নামও।

জন্মদিন বা অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠানে যে ক্রিম দেওয়া কেক কাটা হয়, ক্রিসমাস কেক একেবারেই তেমন নয়।
শেষ আপডেট: 25 December 2025 13:11
কেক ছাড়া ক্রিসমাস বা বড়দিন কল্পনা করা কঠিন। অনেক বাঙালির কাছেই জয়নগরের মোয়া, কমলালেবুর মতো শীতকালীন উৎসবের অঙ্গ হিসেবে যোগ হয়েছে কেক-এর নামও। শীতকালের পিকনিকে এই তিনটে খাবার মোটামুটি থাকেই। জন্মদিন বা অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠানে যে ক্রিম দেওয়া কেক কাটা হয়, ক্রিসমাস কেক একেবারেই তেমন নয়। এখানে ক্রিমের কোনও বালাই নেই। বিভিন্ন ধরনের ড্রাইফ্রুট, ময়দা আর চিনি মিশিয়েই তৈরি হয় ক্রিসমাসের বিশেষ কেক। যা ঠিকমতো রাখতে পারলে, অন্তত এক সপ্তাহ খাবার যোগ্য থাকে। আসলে এই কেক তৈরির পদ্ধতির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এর প্রচলনের ইতিহাস।
শোনা যায়, ক্রিসমাস কেকের জন্ম ১৬ শতকে। সেইসময় ইংল্যান্ডের ক্রিশ্চানরা জিশুর জন্মদিবস উদযাপনে বিশেষ নিয়ম পালন করত। এমনকী তাঁরা বড়দিনের আগের এক সপ্তাহ প্রায় উপোস থাকতেন। বেশ কয়েকদিন উপোস থাকার পর হঠাৎ করে খাওয়া আরম্ভ করলে বিপদ। তাই বড়দিনের সকালে তাঁরা উপোস ভাঙতেন পরিজ নামে বিশেষ এক খাবার খেয়ে। একেবারেই হালকা খাবার। যা তৈরি হত জব, মধু এবং গুড় ও ফল দিয়ে। ক্রমে সেই খাবারের সঙ্গে মিশতে থাকে বিভিন্ন ধরনের ড্রাইফ্রুট। সঙ্গে যোগ হয় আরও কিছু জিনিস। যা একইসঙ্গে পেটও ভরাত আবার শরীর খারাপও করত না। মনে করা হয়, এই পরিজ থেকেই আজকের ক্রিসমাস কেকের জন্ম। সেখানে ডিম, ময়দা সহ আরও অনেক কিছুই যোগ হয়েছে সময়ের সঙ্গে।

ক্রিসমাসে কেন কেক খাওয়া হয় এটি নিয়েও কৌতূহলের শেষ নেই। তবে এর সঠিক কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। জিশুর জন্মের সময় কিন্তু কেকের প্রচলন ছিল না। ‘দ্য অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি’ অনুযায়ী, কেক কথাটির খোঁজ মিলছে ১৩ শতকে। প্রাচীন নোরস বা স্ক্যান্ডেনেভিয়ান শব্দ ‘কাকা’ থেকেই নাকি এসেছে কেক কথাটি। তবে সেই কেকের থেকে আজকের কেক পুরোপুরি আলাদা। তখন কেক ছিল মূলত পাউরুটি। তার স্বাদ মিষ্টি করা হতো মধু দিয়ে। কখনও কখনও থাকত বাদাম ও কিসমিস, কারেন্টস, সিট্রনের মতো শুকনো ফল। মধ্যযুগে ইউরোপের বেকারিগুলিতে মাঝে মাঝে ফ্রুটকেক ও জিঞ্জার ব্রেড বানানো হতো। সেসব কেক কয়েক মাসেও নষ্ট হত না।
কেকের আদি উৎপত্তি প্রাচীন মিশর এবং গ্রিসে। যেখানে আধুনিক মান অনুসারে কেক ছিল প্রাথমিক। প্রাচীন মিশরীয়রা মধু, বাদাম এবং শুকনো ফল দিয়ে মিষ্টি রুটি তৈরি করত, যা কেকের প্রাথমিক রূপের মতো। গ্রিসে, "প্লাকাস" নামে একটি মিষ্টি তৈরি করা হতো, যা বাদাম, মধু এবং শস্য দিয়ে তৈরি বানানো হতো এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বা দেবতাদের কাছে উপহার হিসেবে দেওয়া হতো। এই প্রাথমিক কেকগুলি আজকের সংস্করণের তুলনায় ঘন এবং কম মিষ্টি ছিল, আমাদের পরিচিত তুলতুলে কেকের চেয়ে রুটির মতো।

আধুনিক কেকটি ১৮ এবং ১৯ শতাব্দীতে বেকিং প্রযুক্তি এবং উপকরণগুলির অগ্রগতির জন্য বিকশিত হয়েছিল। শিল্প বিপ্লবের সময় বেকিং পাউডার এবং আধুনিক ওভেনের আবিষ্কারের ফলে হালকা, তুলতুলে কেক এবং পরিশোধিত চিনির ব্যবহার আরও সহজলভ্য হয়ে ওঠে, যার ফলে সামঞ্জস্যপূর্ণ টেক্সচার সহ মিষ্টি কেক তৈরি হয়। এই সময়কালে, মাখন এবং চিনিতে ক্রিমিং করার মতো নতুন কৌশল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যা নরম কেকের জন্ম দেয়। কেকের স্বাদে ভ্যানিলা, চকোলেট এবং ফলের সঙ্গেও বৈচিত্র্য আনা হয়, যার ফলে ক্লাসিক স্পঞ্জ, চকোলেট এবং ফ্রুটকেকের মতো কালজয়ী বৈচিত্র্য তৈরি হয়।
কেকের বদল আসে উনিশ শতকে। জানা যায়, ১৮৯২-এ আবিষ্কার হয় ইলেক্ট্রনিক ওভেনে। আর ওই সময় থেকেই ধবধবে সাদা ময়দা ও বেকিং পাউডারের ব্যবহার হয়। চিনি আর চকোলেটের দাম অনেকটাই বেশি ছিল তখন। তাই দামি খাবার বা ধনীদের খাবার বলে মনে করা হতো।

কেরলের কান্নুর জেলার থালাসেরি শহরের একটি অনন্য স্বতন্ত্র্য রয়েছে। এই শহরকে কেরলবাসী 3C শহর বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। এখানে C- মানে হচ্ছে ক্রিকেট, সার্কাস এবং কেক। থালাসেরিতে ১৮৩০ সালে দেশের প্রথম ক্রিকেট ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হয়। ওয়েলিংটনের প্রথম ডিউক আর্থার ওয়েলেসলি ক্লাবটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই সময় ক্লাবটির পরিচয় ছিল তেলিচেরি ক্লাব নামে। শুধু ক্রিকেট ক্লাব নয়। মালাবার উপকূল বরাবর এই শহরটিতে ভারতের প্রাচীনতম সার্কাস স্কুলগুলির একটি ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জেমিনি শঙ্করন নামে বেশ কয়েকজন সার্কাস পারফরমার ছিলেন এখানে। পরবর্তীকালে তিনিই বিখ্যাত জেমিনি সার্কাস সংস্থার মালিক হয়েছিলেন।
বর্তমান মায়ানমারের আগের নাম ছিল বর্মা। সেখানে এক সময় থাকতেন মাম্বলি বাপু। মায়ানমারে থাকার সময় বেকারি শিল্পের দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তিনি। এরপর ১৮৮০ সালে নিজের শহর কেরলে থালাসেরিতে ফিরে আসেন এবং মাম্বলি একটি বিস্কুট কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বেকারিতে ৪০টির বেশি ধরনের বিস্কুট, রুটি তৈরি হতো।
১৮৮৩ সালে ক্রিসমাসের ঠিক কয়েকদিন আগে একজন ব্রিটিশ বাপুর কাছে এসেছিলেন ক্রিসমাসের কেক তৈরি করার আবেদন নিয়ে। কিন্তু কেক কীভাবে তৈরি করা হয়, তা জানতেন না বাপু। তখন ওই ব্রিটিশ ভদ্রলোক তাঁকে কেক তৈরির একটি রেসিপি দিয়েছিলেন।
কিন্তু কেক তৈরির বেশ কয়েকটি উপকরণ আনার জন্য বাপুকে থালাসেরি থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে ফরাসি উপনিবেশ মাহে যাওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তখন তিনি সেখানে না গিয়ে কাজু, আপেল এবং কলা দিয়ে তৈরি করেছিলেন ক্রিসমাসের কেক। সেই প্রথম ক্রিসমাস কেক তৈরি হয় ভারতে।