মশলা আর মসলিনের খোঁজে ইউরোপ থেকে ১৪৯৮ সালে ভারতে আসার পথ আবিষ্কার করেছিলেন পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা।

বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের উপাস্য তিনি। বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মের প্রবর্তক।
শেষ আপডেট: 24 December 2025 14:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মশলা আর মসলিনের খোঁজে ইউরোপ থেকে ১৪৯৮ সালে ভারতে আসার পথ আবিষ্কার করেছিলেন পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা। এরপর দলে দলে ইউরোপীয়রা এই উপমহাদেশে আসতে শুরু করে। তাদের সঙ্গে ভারতে আসে খ্রিস্ট ধর্মও। বাংলায় 'জিশু খ্রিস্ট' (Jesus Christ) নামটিও প্রথম ব্যবহার হয় পর্তুগিজদের মাধ্যমে। প্রথম দিকের ধর্মপ্রচারক ও স্থানীয় খ্রিস্টানরাই এই নামটির প্রচলন করেন, যা পরে ধর্মীয় গ্রন্থ অনুবাদ ও প্রচারে ব্যবহৃত হয়। তাই এককভাবে প্রথম কোনও ব্যক্তি নির্দিষ্ট করা কঠিন।
১৫০০ শতকের মাঝামাঝি পর্তুগিজরা বাংলায় (হুগলির সপ্তগ্রাম, বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম) বসতি স্থাপন করলে খ্রিস্টধর্মের সূচনা হয়। জেসাস ক্রাইস্ট (Jesus Christ) নামটি আসলে জিশু (Jesus) এবং ক্রাইস্ট (Christ) এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। যেখানে ক্রাইস্ট শব্দের অর্থ 'অভিষিক্ত' বা মসিহা (Messiah) এবং এটি এসেছে গ্রিক শব্দ 'Christos' থেকে। যিনি ঈশ্বরের দ্বারা অভিষেকের মাধ্যমে মসিহা বা ত্রাণকর্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি ঈশ্বরের পুত্র এবং মানবজাতির পরিত্রাতা।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের উপাস্য তিনি। বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মের প্রবর্তক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের সাহিত্য, সঙ্গীত ও চিত্রশিল্পকে প্রভাবিত করে এসেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ‘ব্লু আইড বয়’। কোথাও তাঁর পরিচয় ‘জিসাস’, কোথাও ‘ইসাস’, ‘জিশু’ বা ‘জোসুয়া’ নামে পরিচিত। আবার খোদ বাইবেলের একাধিক সংস্করণে, বিশেষত নিউ টেস্টামেন্টে তাঁকে ডাকা হয়েছে ‘হোশিয়া’ নামে। কিন্তু কোনটি প্রকৃত নাম তাঁর?

খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের একাংশের মতে, খ্রিস্টের আসল নাম হল ‘জোশুয়া’ (Joshua)। বিশেষ করে মেসিয়ানিক ইহুদিরা এই বিশেষ তত্ত্ব বা দর্শনে বিশ্বাসী। ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে দেখতে গেলে ‘জিসাস’ বা ‘জেসাস’ কথাটির উৎস হল হিব্রু শব্দ ‘জোশুয়া’। যার অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘দ্য সন অফ নান’ অর্থাৎ সন্ন্যাসিনীর সন্তান। আবার ‘জোশুয়া’ বলতে ‘সন অফ জোসেফ’ বা জোসেফের সন্তানও বোঝায়। ‘ইজরায়েলের মহান নেতা’ ও ‘মুক্তির পথপ্রদর্শক’-এর অর্থও হিব্রু ভাষায় ‘জোশুয়া’। বাইবেলেও উল্লিখিত রয়েছে ‘জোশুয়া সাকসিডেড মোজেস’। অর্থাৎ, মোজেসের উত্তরসূরি যিশু। নিউ টেস্টামেন্টের কিছু জায়গায় ‘জোশুয়া’-কে লেখা হয়েছে ‘হোশেয়া’ (Hoshua) হিসাবেও। এক্ষেত্রেও অর্থ একই। তবে হিব্রু ভাষায় ‘Jehoshua’ শব্দের বিবর্তনই এই তারতম্যের কারণ। অন্যদিকে ‘জেসাস’ শব্দটি আদতে গ্রিক শব্দ। গ্রিক ভাষায় এই কথাটির অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘সন অ্যান্ড সার্ভেন্ট অফ গড’। অর্থাৎ ঈশ্বরের সন্তান।
‘জিসাস’ কথাটি ব্যবহার করেছিল গ্রিকরা। গ্রিক দেবতা ‘জিউস’-এর প্রভাব চাপিয়ে দেওয়ার জন্য এই নামকরণ নয়। আবার পরবর্তীতে ‘জিসাস’ বা ‘জেসাস’ থেকে ‘ইসাস’ কিংবা বাঙালির মুখে উচ্চারিত ‘জিশু’ এসেছে স্থানভিত্তিক উচ্চারণের ভিন্নতায়। 'বাংলাদেশে খ্রিস্টমণ্ডলীর ইতিহাস' বইতে ফাদার মাইকেল ডি'রোজারিও লিখেছেন, ১৫০০ সাল থেকে বিভিন্ন যাজক সম্প্রদায়- ফ্রান্সিকান, ডমিনিকান, অগাস্টিনিয়ান প্রভৃতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পর্তুগাল থেকে ভারতে এসে পর্তুগিজ-শাসিত সমুদ্রোপকূলীয় জেলাগুলোতে গির্জা নির্মাণ করতে লাগলেন।

১৫১৭ সাল থেকেই পর্তুগিজরা নিয়মিতভাবে জলপথে বাংলাদেশে যাতায়াত শুরু করে। ১৫৩৭ সালে তারা চট্টগ্রাম এবং হুগলির কাছে সাতগাঁয়ে (সপ্তগ্রাম) উপনিবেশ স্থাপন করে। জুলিয়ানো পেরেরা নামের একজন ফাদার ছিলেন সাতগাঁয়ের (হুগলির কাছে) গির্জার দায়িত্বে। ১৫৭৭ সালে মুঘল সম্রাট আকবর পর্তুগিজদের তৎকালীন বঙ্গদেশে স্থায়ী বসতি স্থাপন ও গির্জা নির্মাণের অনুমতি দেন। পর্তুগীজ বসবাসকারীরাই হলেন বাংলার প্রথম খ্রিস্টান, দেশীয় খ্রিস্টানরা হলেন তাঁদের বংশধর। পরবর্তীতে খ্রিস্ট ধর্মবিশ্বাসের বিস্তার লাভের মাধ্যমে খ্রিস্টান জনগণের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।