
শেষ আপডেট: 14 May 2022 08:52

রণদীপ সিদ্দিকি -
ছোটবেলায় ইস্কুল যাওয়ার পথে ছিল সেই বাড়িটা। যার দেওয়ালের গায়ে দেখা যেত, কীসের যেন সব গর্ত আর কালো কালো দাগ– বড় হয়ে জানতে পারা গিয়েছিল, গর্তগুলো আসলে বুলেটের দাগ। পাড়ার লোকে বলত, ওই বাড়িতে এক শীতের রাতে ডাকাত পড়েছিল। সে খুব ভয়াবহ ঘটনা! একসময় তাদের মফঃস্বলে লোকের মুখে মুখে ঘুরত সে ঘটনা। বাড়ির বড় ছেলেকে তাক করে বন্দুক ধরেছিল তারা। মা ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলেকে বাঁচাতে। সোজা গুলি লাগে তার বুকে। মায়ের আয়ু পেয়ে বেঁচে যায় ছেলে! আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে এই কাহিনি! কত বছর আগের সেই ঘটনা!
তার ভয় করত বাড়িটা দেখলে! আবার কৌতূহলও ছিল খুব। সেই তার প্রথম ভয়ের সঙ্গে মোলাকাত! ইস্কুল থেকে ফিরে একা একা খেলতে খেলতে বা রাতে মা পাশে এসে শোওয়ার আগে তার ভয় করত- তাদের বাড়িতেও যদি ডাকাত পড়ে? যদি মেরে ফেলে মাকে? মা ছাড়া বাঁচার কথা কি ভাবতে পারে কেউ? মাকে হারানোর আশঙ্কা থেকে তার রাতে ঘুম আসতে চাইত না। সেই যে বুলেট ও বুলেট-পরবর্তী আতঙ্ক তার পিছু নিল– আজও ছাড়ল না! বয়েস বাড়লে সেই ভয় ধীরে ধীরে জমাট বেঁধে গেল। আতঙ্কের সেই জমাট অনুভূতি- বুকের ভেতর একটা অন্ধকার পুকুরের মতো। একটা ছইওয়ালা কালো নৌকার মতো সেই ভয়ের ধরণ-ধারণ। সে, বড় হতে হতে এক সময় জেনে গেল, তার মাথার মধ্যে একটা ভয়ের নৌকার বাসা আছে। উথাল-পাথাল ভয় ছাড়া, অন্য সময়ে সে নৌকা ভাসে না। ভাসা মানে আসলে অবিরাম চলা– ভয় পাওয়া। নৌকা মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে। যখন সে চলতে শুরু করে, দাঁড়ের শব্দ হয় তার ভেতরে। যেন অনেক দূরের এক নদী, এই ঘর। এই শরীর যেন এক হারিয়ে যাওয়া গান। উত্থান হারানো এক অসহায় মানুষ সে। আর সেই শরীরের ওপারে এপারে নৌকা চলে। সে, সবটা বুঝতে পারে না। কেবল সেই দাঁড় বাওয়ার আওয়াজ মানে তার মাথা যন্ত্রণা– এটুকু বোঝে।
গত চার দিন সেই নৌকা ক্রমাগত ছুটেছে। সে উঠতে পারেনি একদম। শুয়েছিল, তবু ঘুম আসেনি। কেবল ছেঁড়া ছেঁড়া তন্দ্রা। আধো ঘুমের ঘোরে কত কী দেখে সে!- কারা যেন হইহই করে ঠাকুর নিয়ে আসে- রঙিন প্যান্ডেল- কাঁথাস্টিচের কাজ করা শাড়ি পরে মেয়েরা ধূপ জ্বালায়- এক উথাল-পাতাল নদীর ঘাটে শোয়ানো থাকে শবদেহের সারি- জলে প্রদীপ ভেসে যায়– খড়কুটো, ফুল, পাতা- বাতাসে কান্নার শব্দ পাক খেয়ে খেয়ে উঠে যায়– কালো কালো মেঘ সেখানে– ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে– হুইশলের শব্দ... সে শব্দ শুনতে পায় তখন। এবার সব অন্যরকম। এবার সে কিছু দেখেনি। শুধু তার চেতনা ছুটে গেছে। একটানা। তাই ক্লান্ত লাগছে খুব। থামতে পেরে সে চোখ খোলে আজ। ছাদ দেখতে পায়, চোখ খুলেই। সে তাকায়। বোঝে, আর একটা দিন এসেছে খানিক আগেই। সূর্যের আলোহীন একটা দিন। এরকম দিনে তার মাইগ্রেন বাড়ে। মাথা খুব ভার এখন। হজম হয় না খাবার! বমিও হয় মাঝে মাঝে। এখন সেই মাথা-ধরার প্রিলিউড সে টের পেয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। ভাল করে ঘুমায়নি বলে চোখ জ্বালা করছে। তবু সে বিছানা আঁকড়ে পড়ে ছিল। ঘামের গন্ধ, বাজে আবহাওয়া, গুমোট। কী করা যায়? আজ স্নান করা যাক- ভাবছিল সে । - যদি একটু ফ্রেশ লাগে!
আসলে মেঘ করে এলে, এমন ভেজা-ভেজা ভাব হয় চারিদিকে, আলাদা করে আর স্নানের দরকার হয় বলেই সে মনে করে না। আবার একথাও ঠিক, সে জল ভালবাসে খুব। জলের মধ্যে একরকম স্বচ্ছতা আছে। পবিত্র জল, তাকে বহুবার আত্মহত্যা থেকে ফিরিয়ে এনেছে। সেই কোন ছোট থাকতে সে সাঁতার শিখেছে!
জলের সুর তার মুখস্থ। বিষাদ দিনে সে যে জল থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে, তা একরকম অভিমান থেকেই তো। জলের সামান্য নীচে সবুজ অন্ধকারও তার পরিচিত। সে দেখেছে জলের ভেতরের শান্তি। সেই ক্লাস থ্রি-তে পড়ার সময়, একবার পুকুরে ডুবে গিয়েছিল। ডুবে যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পরে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে প্রতিবেশীরা। পেটে চাপ দিয়ে বার করা হয় গিলে ফেলা জল। আজও সেই শীতল, সবুজ অভিজ্ঞতা তাকে শান্ত করে রাখে।
সে নিজে কাউকে বলেনি, তবু বাড়ির লোক তার জলের প্রতি টানের কথা জেনে গেছে। মা বলেছে সবাইকে। কোনও মাকে আলাদা করে বলতে হয় না কিছু! বিষাদ, অসুখের মতো ঘিরে রাখে যখন, তার ঘুম হয় না। বাড়ি তো অনেক দূরের কথা– ঘরের চৌকাঠ পার হতে অব্দি ভয় হয়। সে খাটে বসে থাকে সমস্ত দিন। এই ছোট্ট চৌকোনা ঘর, লম্বা দুটো জানলা, সাদা দরজা- এই তার গুহা। খিদে অনুভব করে না বলে খায়ও না তেমন কিছু। ইচ্ছে করে না। বসা হয় না গান নিয়ে। খোলে না ফেসবুক।
সারাক্ষণ তিথি আর তিথি– কেবল তিথিকে মনে পড়ে। কোথায় পাওয়া যাবে তাকে? আর কি আদৌ ফিরে পাবে সে তিথিকে? ভাবতে ভাবতে লম্বা একটা জার্নি হয় তার– নদীর জন্ম থেকে মোহানায় চলে যাওয়া যেন! ক্লান্ত লাগে– মনে প্রশ্ন জাগে। আচ্ছা, ‘পাওয়া’ কাকে বলে? শরীরে থাকে পাওয়া? কোথায় রাখা যায় তাকে? ‘পাওয়া’ বড্ড অল্প সময়ের ব্যাপার। আসল তো ‘রাখা’। রাখতে পারলে তবেই তো থাকে। তিথিকে সে রাখতে পারেনি। থাকেনি সে মেয়ে।
-রণো... ও রণো ! ওঠ, বাবা! মুখখানা দেখা একবার।
দরজায় ছায়া পড়ল। মা ডাকছে। ডাকতে ডাকতে চলে এসেছে তার ঘরে। সকালের চা ফেরত নিয়ে গেছে হরি। এতক্ষণে রান্না-খাওয়া ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ততা কাটার পর মায়ের তার দিকে টনক নড়েছে। সে জানে, রোজকার মতো বাড়ি এখন ফাঁকা। বাবাই চলে গেছে ইউনিভার্সিটিতে। ভাই ইস্কুলে। বাড়িতে সে, মা আর হরি। আর মালতি, হরির বউ।
হরি তাদের পুরোনো লোক। ঠাকুরদা ওকে নিয়ে এসেছিলেন। বছর বারোর একটা অনাথ বাচ্চা, ঠাকুরদার ইস্কুলে স্পোর্টস-এর মাঠে এসে বসেছিল। বাচ্চাদের টিফিন খাওয়া দেখে দেখে ঠোঁট চেটেছে সারাদিন! শেষকালে দুপুর নাগাদ, সে ভাত চায়, ঠাকুরদার কাছে। ঠাকুরদা জেরা করে জানতে পারেন বাংলাদেশে ওর বাড়ি। নাম হরি মণ্ডল। বাবা-মা নেই। কাকার কাছে থাকত। কাকিমা মুখনাড়া ছাড়া ভাত বেড়ে দেয়নি কখনও। কাকা কাজ করত ইণ্ডিয়ায়। এবার কাজে আসার সময় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল ভাইপোকে। দজ্জাল বউয়ের হাতে থেকে বাঁচানোর জন্য। প্রথম দুদিন কলকাতা দেখিয়ে নিয়ে, মণিপুরে আসে দুজনে। পরশু রাত থেকে কাকা উধাও। কান্নাকাটির পর, এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতে রেলস্টেশনের পাশের ইস্কুলে খেলা হচ্ছে দেখে খাবারের আশায় উপস্থিত হয়। খিদে পেয়েছে বেজায়। কাকা চলে যাওয়ার পরের দুরাত ভাত জোটেনি। রাতে রেলস্টেশনে ঘুমিয়েছে। চায়ের দোকানে খাবার চেয়েছিল। দোকানি এঁটো চায়ের গেলাস মাজিয়ে পাঁউরুটি আর চা দিয়েছিল। খেটে খাও – নীতিতে।
সব বৃত্তান্ত শুনে ঠাকুরদা ওকে বাড়ি নিয়ে আসেন, ‘চল ব্যাটা, আমাদের সঙ্গে থাকবি চল’। এখানকার প্রাইমারি ইস্কুলে ভর্তিও করে দেন পরের বছর। প্রথমটায় খুব কান্নাকাটি করত সে বাড়ির জন্যে। ধীরে ধীরে মন বসে গেল হরির। বাবাইয়ের সঙ্গে খেলা করত। ঠাম্মার পায়ে পায়ে ঘুরত। ঠাম্মাও ওকে ভালবাসতেন খুব! আহা! মা-বাপহারা ছেলে! ভারি মায়া পরে গিয়েছিল গোড়া থেকেই!
পড়াশুনোয় সে ছেলের মন ছিল না। বরং তার অনেক বেশি পছন্দ ছিল রাজদাদার শাকরেদগিরি করা। রাজদাদার শিষ্য হয়ে সেই থেকেই তার পেছন পেছন ঘুরে বেড়াত হরি। পড়াশোনা করতে ইচ্ছে করত না তার একেবারেই। ঠাকুর্দার বকাবকিও তাকে সিধে করতে পারেনি। ফলে, অনেক কষ্টে ক্লাশ এইটের বেড়া টপকে ইস্কুলে ইতি দেয় হরি। ঠাকুরদাই ওকে বুদ্ধি দেন কাজে লেগে যাওয়ার। ও সাইকেল সারাইয়ের দোকান দেয় বাজারে। দোকান দেওয়ার কিছু দিন পরে বিয়েও দেন ওকে ঠাম্মা। মালতি, ওর বউ। পাশের গাঁয়ের মেয়ে। ক্লাশ ফোর পাস। মালতী একটু দজ্জাল গোছের হলেও হরি ভারি নিরীহ মানুষ।
খুব আনন্দ করেছিল তারা হরির বিয়েতে। সাইকেল-রিক্সা করে বরযাত্রী গিয়েছিল দুই ভাই, পাজামা-পাঞ্জাবি পরে। ঝাল দেওয়া মাংস খেয়েছিল হুশহাস করে। মালতীকে নিয়ে এবাড়িতেই ওঠে হরি। নীচের তলার ঘরে ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন ঠাকুরদা। আজও সেই বন্দোবস্তই কায়েম আছে। হরি আর মালতীর ছেলে-মেয়ে হয়নি বলে, তাদের দুই ভাইকে খুব আঁকড়ে রাখে। তাছাড়া দুজনের বয়েসও তো বসে নেই। ওরা ছাড়া, এ বাড়ি অচল। হরি তাকে খুব ভালোবাসে। সারাদিনে অনেকবার ডাক-খোঁজ করে।
'বড়দাদা, কোথায় গেলে!' ওদের তারা দুই ভাই, নাম ধরেই ডাকে। ছোটবেলা থেকে ঠাম্মাকে দেখে দেখে এই অভ্যাস হয়ে গেছে। মা একেবারেই পছন্দ করত না নাম ধরে ডাকা। কিন্তু অনেক রাগারাগি করেও স্বভাব পাল্টাতে পারেনি। এখন ওই নামই চালু আছে। হরির বউকে ঠাম্মা ‘বউ’ বলে ডাকতেন। তারা দুই ভাইও তাকে এখনও ‘বউ’ বলে ডাকে। শুধু রাজর্ষি বলেন না। তিনি বলেন, হরির বউকে আমার ‘বউ’ বলে ডাকাটা খানিক অকওয়ার্ড হয়ে যাবে না? এই নিয়ে খুব হাসাহাসিও হয়েছে ঘরে!
এখন বাড়ির বাতাসে ভাতের গন্ধ ছড়িয়ে আছে!
সিংদেও পরিবারকে খাদ্যের দিক দিয়ে বিচার করলে, ভাত-প্রধান বলা যায়। এ বাড়ির লোকেরা ভাত ভালোবাসে। সারাদিনে দুবার, কখনও-বা তিনবারও ভাত হয় মায়ের কিচেনে। ভাতই বাড়ির বাসিন্দাদের প্রধান খাবার! সকালের রোদ আর ভাতের সুবাস একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে এ বাড়িতে। গোবিন্দভোগ চালের ভাত, আলুসেদ্ধ আর বাড়িতে বানানো ঘি খেয়ে বাবাই আর ভাই বের হয়। সে তো আজকাল ঘরেই থাকে বেশিরভাগ সময়। খুব কম বাইরে যায়। হরির বউ রাঁধে সকালের ভাত। তবে ওই ভাতটাই শুধু ও করে। দুপুরে রান্না করে রাখা হয় দুবেলার একসঙ্গে। সেসব খাওয়া হয় রাতে। চার জনে মিলে। মা দুপুরেই রান্না সেরে নেয়। নারকেল দেওয়া ভাজা মুগডাল, সুক্তো, পাটপাতা বড়ার সব্জি, পোস্ত দিয়ে মাছ, বড়ি দিয়ে লাউঘণ্ট, ধোকার ডালনা, পুঁটিমাছের টক– এসব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে না রাঁধলে বাবাইয়ের আবার মুখে রোচে না। তাদের দুই ভাইয়েরও একই ব্যাপার। খুব ছোট থেকেই তারা সবরকম মাছ খেতে ভালবাসে। মা বলে, 'আমার দুটো ছেলেই আসলে বেড়ালছানা। মাছ ছাড়া চলে না।' এজন্য মায়ের চেয়ে, বাবাইয়ের অবদান বেশি। জন্মসূত্রে বাঙালি না হলেও বাবার জিভ ষোলআনা বাঙালি। অবশ্য বাবাই যে বাংলাদেশে জন্মাননি, তা বোধহয় তিনি নিজেও ভুলে গেছেন। কেবল নাম সই করার সময়টুকু ছাড়া তারা সব্বাই ভুলে যায়, এই পরিবারটি প্রধান বাঙালি নন।
ছবি: সৌজন্য চক্রবর্তী