
শেষ আপডেট: 22 April 2021 06:33
টার্ডিগ্রেড[/caption]
১৭৭৩ সালে এই ক্ষুদ্র জীবটি আবিষ্কার করেছিলেন জার্মান জীববিজ্ঞানী জোহান গোয়েজ। ১৭৭৭ সালে প্রাণীটিকে 'টার্ডিগ্রেড' নামটি দিয়েছিলেন ইতালীয় বিজ্ঞানী ল্যাজারো স্পালাঞ্জান। বিজ্ঞানী ল্যাজারো দেখেছিলেন প্রাণীটি অত্যন্ত স্লথগতিতে চলা ফেরা করে। তাই ল্যাটিন শব্দ 'টার্ডিগ্রাডা' ভেঙে প্রাণীটির নাম দিয়েছিলেন 'টার্ডিগ্রেড'। 'টার্ডিগ্রাডা' শব্দটির অর্থ হলো ‘যে ধীরে ধীরে পা ফেলে’। এছাড়া, দেখতে মোটাসোটা হওয়ার জন্য 'জলের ভাল্লুক' নামেও পরিচিত 'টার্ডিগ্রেড।
পৃথিবীর অতি প্রাচীন জীবগুলির মধ্যে অন্যতম হলো এই টার্ডিগ্রেড। এমনই ভয়ঙ্কর চেহারা, দেখলেই গা শিউরে উঠবে। আধ মিলিমিটার লম্বা দেহে আছে আটটি পা। প্রত্যেক পায়ের নীচে আছে নখওয়ালা থাবা। ভয়াবহ মুখটির সামনে আছে গোলাকার একটি চাকতি। যার সাহায্যে জলে মিশে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি দ্রব্য শুষে নেয়। এদের দেখলে মনে হয় পতঙ্গের লার্ভা জাতীয় কোনও প্রাণী। কিন্তু এদের সঙ্গে অঙ্গুরীমাল পর্বের প্রাণী, অর্থাৎ কেঁচো জাতীয় প্রাণীদের মিল বেশি। সাধারণত এরা জলে ভেসে থাকে। কখনও জলজ উদ্ভিদকে আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকে।
[caption id="attachment_218481" align="aligncenter" width="621"]
থাবায় আছে নখ।[/caption]
কয়েক বছর আগে, 'পিএলওএস- বায়োলজি' নামে একটি বিখ্যাত বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নালে, টার্ডিগ্রেড প্রাণীটির ডিএনএ সংক্রান্ত একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, আধ মিলিমিটারেরও কম লম্বা টার্ডিগ্রেড, অসহ্য গরম ও দুঃসহ ঠান্ডা দিব্যি সহ্য করে নিতে পারে। অর্থাৎ তুষারাচ্ছাদিত এলাকাতেও বাঁচতে পারে, আবার আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি এলাকাতেও বাঁচতে পারে। উচ্চচাপ যুক্ত পরিবেশ ও চাপশূন্য পরিবেশেও বাঁচতে পারে।
টার্ডিগ্রেড বায়ুশূন্য পরিবেশে থাকতে পারে। টিকে থাকতে পারে মহাশূন্যেও। এমনকি টার্ডিগ্রেড সইতে পারে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তাও। খাবার না খেয়ে টার্ডিগ্রেড বেঁচে থাকতে পারে প্রায় ৩০ বছর। বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, খাবার না পেলে টার্ডিগ্রেডের শরীরের আভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপের অধিকাংশই প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেহ চালাতে প্রায় কোনও শক্তিরই প্রয়োজন লাগে না। ফলে বিনা খাদ্যে টার্ডিগ্রেডরা বাঁচতে পারে বহুবছর।
শুধু খাদ্য নয়, জল ছাড়াও টার্ডিগ্রেড বাঁচতে পারে বহু বছর। প্রখর রোদে শুকিয়ে যাওয়া পুকুরের ফুটিফাটা মাটিতে, কাঠ হয়ে পড়ে থাকা জলজ উদ্ভিদের দেহের ভেতর দিব্যি এরা বেঁচে থাকে। জলপান না করেই। বছরের পর বছর। জীববিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বিস্ময়কর ঘটনাটির মূলে আছে টার্ডিগ্রেডের দেহে থাকা কিছু প্রোটিন। যে প্রোটিনগুলি এদের দেহে জলের অভাব পূরণ করে দেয়। তবে পরিবেশে জলের সন্ধান পেলে, আবার টার্ডিগ্রেডরা শরীরে প্রয়োজনীয় জল ভরে নেয়। তাই গবেষকদের মতে পৃথিবীতে যতরকম দুর্যোগ ঘটে, সবগুলি থেকে বেঁচে ফেরার বিশ্বরেকর্ড আছে এই টার্ডিগ্রেডদের।
বিজ্ঞানীরা সামান্যই জানিয়েছেন, তবে টার্ডিগ্রেডকে নিয়ে তাঁদের গবেষণা এখনও তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা টার্ডিগ্রেডকে নিয়ে আরও উচ্চতর গবেষণায় সঁপে দিয়েছেন নিজেদের। আসলে বিজ্ঞানীরা বুঝেছেন, চরম অসহনীয় পরিবেশকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে টার্ডিগ্রেডদের পৃথিবীতে টিকে থাকার অসামান্য ক্ষমতা,একদিন মানুষের কাজেও লাগতে পারে। রেফ্রিজারেশন ছাড়াই কীভাবে শুক্রাণু, রক্ত, টিকা,স্টেমসেল, কর্নিয়া ও অন্যান্য জৈববস্তু সংরক্ষণ করে রাখা যায়, তার পথ দেখাতে পারে এই টার্ডিগ্রেডই।