
শেষ আপডেট: 22 April 2020 06:18
অতীতের সিয়ালকোট শহর।[/caption]
কয়েক বছরের মধ্যে গিগার তিন পুত্র সন্তান জন্ম নিয়েছিল। বড় পুত্রকে নিয়ে পীরের কাছে এসেছিলেন গিগা। পুত্র সন্তানটিকে পীরবাবার পায়ের কাছে বসিয়ে বলেছিলেন, “আমি আমার ছেলেকে আপনাকে উপহার দিলাম। এখন আপনি পুত্র সন্তানটির দাম বলুন। আমি আপনাকে টাকা দিয়ে সন্তানটি কিনে নেবো।” অবাস্তব কিছু বলেননি গিগা, কারণ তখনকার দিনে এটাই ছিল রীতি।
কিন্তু গিগাকে হতচকিত করে দিয়ে পীরসাহেব বলেছিলেন, টাকা নেবেন না, তিনি চান সন্তানটিকে। কান্নায় ভেঙে পড়ে গিগা বলেছিলেন, পীরবাবাকে তিনি প্রচুর অর্থ দেবেন। এমন কি ছেলের ওজনের সমান সোনা-রুপো দেবেন। কিন্তু পীরসাহেব তাঁর শর্তে অনড় ছিলেন। শর্ত অনুযায়ী তাঁকে ছেলেই দিতে হবে। পীরসাহেবের শর্ত মানতে পারেননি গিগা। শর্ত ভেঙে ছেলে নিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন।
ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গিয়েছিলেন পীর সাহেব। তাঁর কথা না মানার অর্থ, তাঁকে অসম্মান করা। রাগে কাঁপতে কাঁপতে পীরসাহেব 'বেইমান' বলেছিলেন সিয়ালকোট শহরের বাসিন্দাদের। অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, শহর ও শহরের বাসিন্দারা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। অপমানিত, অভিমানী পীরসাহেব নিজেকে স্বেচ্ছায় বন্দি করে ফেলেছিলেন দরগার গম্বুজওয়ালা ঘরটির ভেতর। ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন ভেতর থেকে। শিষ্যদের বলেছিলেন, তাঁকে যেন কেউ কোনও ভাবেই বিরক্ত না করে। তিনি তপস্যায় বসবেন। ঘর থেকে নিজেই বেরিয়ে আসবেন চল্লিশ দিন পর। সেই দিন বেইমান শহরবাসীর ওপর নেমে আসবে তাঁর অভিশাপ। ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পে শহরের কেউ বাঁচবেন না, তিনি ও তাঁর গোটা কয়েক শিষ্য ছাড়া।
দাবানলের মত খবরটি ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা শহরে। শহরবাসীরা নিশ্চিত ছিলেন, পীর তাঁর দৈব ক্ষমতায় সিয়ালকোট শহর ধ্বংস করে দেবেন। হিন্দুরা বিভিন্ন দেবতার কাছে, মুসলিমরা বিভিন্ন মসজিদ, দরগা ও মাজারে মানত করতে শুরু করে দিয়েছিলেন শহর ও নিজেদের জীবন বাঁচাতে। ক্ষমা চাওয়ার জন্য শহরবাসীরা বার বার গিয়েছিলেন পীরের দরজায়। কিন্তু পীরবাবা ছিলেন অনড় ও নিশ্চুপ।
[caption id="attachment_211637" align="aligncenter" width="800"]
সিয়ালকোটে এসেছিলেন গুরু নানক।[/caption]
ঠিক সেই সময়, কাশ্মীর থেকে পাসুর যাওয়ার পথে শিয়ালকোট শহরে এসেছিলেন শিখদের প্রথম ও প্রধান ধর্মগুরু 'নানক'। সিয়ালকোট শহরের বাইরে, একটি কবরস্থানের পাশে থাকা একটি বের (কুল) গাছের নীচে, তিনি বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসেছিলেন। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছিল পীরসাহেবের দরগার সুদৃশ্য গম্বুজ। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর গুরু নানক, পীরের দরগায় পাঠিয়েছিলেন শিষ্য মর্দানাকে। শিষ্য মর্দানা গিয়ে পীরের দরজায় প্রহরারত পীরের মুরিদদের (শিষ্য) বলেছিলেন শিখ ধর্মগুরু গুরু নানকদেব এসেছেন। তিনি পীরের সঙ্গে কথা বলতে চান। কিন্তু পীরের মুরিদরা বলেছিলেন, তাঁরা তাঁদের গুরুর কথা অমান্য করতে পারবেন না। তাঁকে কোনও মতেই বিরক্ত করা যাবেনা। মর্দানা ফিরে এসেছিলেন তাঁর গুরুর কাছে।
সিয়ালকোট শহরে ইতিমধ্যে খবর ছড়িয়ে গিয়েছিল, শহরের বাইরে সাদা পোশাক পরা এক দেবদূত এসেছেন। তিনি চেষ্টা করেছেন পীরের সঙ্গে কথা বলার। কিন্তু পীরবাবা তাঁকেও ফিরিয়ে দিয়েছেন। আতঙ্কিত শহরবাসী দৌড়ে এসেছিলেন গুরু নানকের কাছে। পীরবাবার ক্রোধ থেকে শহরকে বাঁচাবার জন্য আবার অনুরোধ করেছিলেন তাঁরা। গুরুনানকজী শিষ্য মর্দানাকে আবার পাঠিয়েছিলেন পীরের দরজায়। শহরের মানুষেদের পক্ষ থেকে। গুরুনানক এবার মর্দানাকে বলে দিয়েছিলেন, যদি মর্দানা আবার ব্যর্থ হন, তিনি যেন পীরের মুরিদদের বলে আসেন, পীরের তপস্যা মাঝপথে ভঙ্গ হবেই। তাই ভক্তদের মুখের দিকে তাকিয়ে পীরসাহেব যেন ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু দ্বিতীয়বারও, ব্যর্থ হয়েছিলেন মর্দানা। মুরিদরা তাঁদের বক্তব্যে অনড় ছিলেন।
[caption id="attachment_211638" align="aligncenter" width="700"]
গুরু নানকের ডান দিকে শিষ্য মর্দানা।[/caption]
মর্দানার মুখে সব শুনে গুরু নানক স্মিত হেসেছিলেন। মর্দানাকে ভজন গাইতে বলেছিলেন। সুমিষ্ট কন্ঠে ভজন গাইতে শুরু করেছিলেন শিষ্য মর্দানা। কুল গাছের নিচে উপবিষ্ট গুরু নানক অর্ধনিমীলিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন পীরের দরগার গম্বুজটির দিকে। হতাশ শহরবাসী বসে পড়েছিলেন কুলগাছটিকে ঘিরে। সূর্য তখন ঠিক মাঝ গগনে। মেঘমুক্ত ঘন নীল আকাশে উড়ছিল একঝাঁক সাদা পায়রা। সহসা, ভয়ঙ্কর বজ্রপাতের শব্দ ভেসে এসেছিল গম্বুজের দিক থেকে। কেঁপে উঠেছিল শিয়ালকোট শহর। আতঙ্কিত শহরবাসীরা দেখেছিলেন, পীরসাহেবের দরগার গম্বুজটির মাথায় ভয়ঙ্কর ফাটল ধরেছে।
গম্বুজের বাকি অংশ ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত পীর প্রতিজ্ঞা ভুলে দরজা খুলে দৌড়ে বাইরে এসেছিলেন। হতাশ হয়েছিলেন পীরের মুরিদরা। বাবাকে দেখতে পেয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন পীরবাবার ভক্তরা। তাঁরা গুরু নানকের পায়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন। গুরুনানকের খবর পেয়ে পীরবাবা এসেছিলেন কুল গাছটির কাছে। শহরবাসীর বিরুদ্ধে প্রতিজ্ঞাভঙ্গের অভিযোগ করেছিলেন। নানককে বলেছিলেন, শহরবাসীরা মিথ্যুক, পীর ফকির সন্ন্যাসীতে তাদের ভক্তি নেই। তাই শহরবাসীর শাস্তি পাওয়া উচিত।
[caption id="attachment_211639" align="aligncenter" width="495"]
আজও পীরসাহেবের গম্বুজটির মাথায় আছে সেই ফাটল।[/caption]
গুরু নানক হেসে বলেছিলেন, “পীরের কাজ ক্ষমা করা, ধংস করা নয়। ঈশ্বর বা আল্লা, ভালোবাসারই অপর নাম। আমরা তাঁর দাস। খোদার ক্ষমার পথই আমাদের পথ হওয়া উচিত। পৃথিবী এমনিতেই অবিশ্বাস ও ঘৃণায় পরিপূর্ণ। আমরা ঈশ্বরের সেবকরা তাই ভালোবাসার বীজ বপন করব।। আপনি যদি সন্তানের পিতা হতেন। আপনি কাউকে কি আপনার সন্তান মন থেকে চিরতরে দিয়ে দিতে পারতেন! আমার মনে হয় না পুরো শহর মিথ্যুক।" এই বলে গুরু নানক, শিষ্য মর্দানাকে শহরের দোকানে এক পয়সার সত্য আর এক পয়সার মিথ্যা কিনতে পাঠিয়েছিলেন।
[caption id="attachment_211641" align="aligncenter" width="1024"]
আজও আছে গুরু নানকের স্মৃতি মাখা সেই কুল গাছ।[/caption]
দোকানদাররা মর্দানার মুখে তা শুনে হেসে কুটোপাটি। সবাই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মর্দানাকে, একজন দোকানি ছাড়া। তাঁর নাম মৌলা কারার। একটি কাগজে তিনি লিখে দিয়েছিলেন, মৃত্যুই সত্য এবং জীবন মিথ্যা। কাগজটি গুরু নানককে দেখাতে বলেছিলেন। মর্দানা গুরু নানককে চিরকূটটি দিয়েছিলেন। গুরু নানক স্মিত হেসে চিরকূটটি পীরবাবাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “দেখুন আপনার কথা ঠিক নয়, আধ্যাত্মিক ভাবে জীবিত অন্তত একজন মানুষ এই শহরে আছেন। এছাড়া সত্য কী আর মিথ্যা কী ,সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটা জানা সম্ভব নয়। তাই সারা শহরের ওপর আপনার এই ভয়ঙ্কর ক্রোধ অযৌক্তিক।” এরপর পীরসাহেব তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। ক্ষমা করেছিলেন সিয়ালকোটবাসীদের।
ঘটনাটির পর বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল কুলগাছটি। গাছটির অদূরে, গুরু নানকের ভক্ত নাথা সিংহ তৈরি করেছিলেন গুরুদ্বার 'বাবে দি বের সাহিব'। গুরু নানকের এই ঘটনাটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে। গুরু নানকের স্মৃতিমাখা সেই কুল গাছটি আজও জীবিত আছে। আজও আছে পীর হামজা গাউস সাহেবের সেই ফাটল ধরা গম্বুজটিও। এই অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে।