
শেষ আপডেট: 28 March 2020 12:57
মৌসুনির প্রাণকেন্দ্র বাগডাঙ্গা বাজার এখন জনশূন্য। যে প্রকাশের চায়ের দোকানে সারাদিন তাসের আড্ডা চলে সেই দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো ছেলে-ছোকরাকে ঘরে ঢোকাচ্ছে সিভিক পুলিশ। বাগডাঙ্গায় হাট বসে সোম আর শুক্রবারে। গত সোমবার শেষ হাট বসেছিল, এই শুক্রবার হাট বসেনি, কবে আবার বসবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
আজন্ম মৌসুনিবাসী সরল দাসের কাছে জানতে চাই, ‘হাট না বসলে খাবেন কী?’ সরল হাসির সঙ্গে একরাশ আত্মবিশ্বাস মিশিয়ে জবাব দিলেন, ‘আমাদের প্রত্যেকের ঘরে যা শাকসবজি হয় তাতেই চলে যাবে, আর পুকুরে জাল ফেললেই মাছ পাব’। বললাম, ‘বালিয়াড়ার গরীব মানুষদের কীভাবে চলবে দিন?’ মৌসুনি কো-অপারেটিভ হাইস্কুলের কর্মী সরলবাবু জানালেন, তাদের কাছে সরকারি চাল পৌঁছে গেছে, আর পা বাড়ালেই নদী, খাওয়ার ব্যাপারে দিন কয়েকের চিন্তা আপাতত নেই।
চিন্তা হল, যাঁরা ফিরে এসেছেন তাঁরা কেউ কি এই মারণ ভাইরাস বহন করছেন শরীরে? দিন কয়েক আগে দুবাই থেকে জ্বর নিয়ে ফিরেছিলেন যে যুবক তাঁকে সরলবাবুরাই জোর করে স্থানীয় দ্বারিকনগরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠিয়েছিলেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারবাবু কোনও ঝুঁকি না নিয়ে সেই যুবককে পাঠিয়েছিলেন বেলেঘাটা আইডি-তে। বেলেঘাটা আইডি অবশ্য তাঁকে ফিট সার্টিফিকেট দিয়েছে, দিয়েছে বাধ্যতামূলক ঘরে থাকার পরামর্শও। আর আরব আমিরশাহিতে সদ্য বিয়ে করা বউকে নিয়ে গিয়েছিলেন যে যুবক তিনি ফিরে এসেছেন দিন কয়েক হল। সেই দম্পতিও আপাতত গৃহবন্দি কাকদ্বীপ হাসপাতালের নির্দেশে।
গত কয়েক বছরে মৌসুনির দক্ষিণ দিকে পর্যটনের বেশ রমরমা। শহরের বহু মানুষ আসেন দিন কয়েকের ছুটি কাটাতে। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ছাড়াই গড়ে ওঠা সেসব ‘হোম স্টে’-র ভাল-মন্দ নিয়ে কথা বলার সময় এখন নয়। তবে যেদিন রাজ্য সরকারের নির্দেশে স্কুলগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হল সেদিন আসা একদল পর্যটককে প্রায় তাড়িয়ে ছেড়েছেন বালিয়াড়ার মানুষ।
স্বাস্থ্যপরীক্ষার পর্যাপ্ত পরিকাঠামো হয়তো সুন্দরবনের এই প্রান্তিক দ্বীপে নেই কিন্তু এসব ঘটনা শুনে মাঝে মাঝে মনে হয়, ইউরোপের উন্নত দেশ ইতালির থেকেও বোধহয় আমাদের সুন্দরবনের এই প্রান্তিক মানুষেরা এগিয়ে আছেন সচেতনতায়। গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথোপকথনে যখন জানতে চাই— ‘খেয়া তো বন্ধ, হাট বসছে না, অসুবিধা হবে না আপনাদের?’ উত্তর আসে, ‘আমাদের যা অসুবিধা হবে তার চেয়ে বেশি অসুবিধা হবে শহরের মানুষের। আজ স্পেশাল খেয়ায় উচ্ছে আর ঝিঙে গেছে কলকাতায়, গত সপ্তাহে চাষিরা দাম পেয়েছেন উচ্ছের জন্য কেজিতে ছ-সাত টাকা, আজ তার দাম কেজিতে দশ-বারো টাকা। আমাদের খাবার কিছুদিনের অন্তত গ্রামেই মজুত আছে কিন্তু গ্রামের সবজি বা মাছ শহরের বাজারে না গেলে শহরের চলবে তো?’
এই প্রশ্ন ও উত্তর আমাদের এক বৃহত্তর সত্যের সম্মুখীন করে। আজও বাংলার এইসব ছোট ছোট গ্রাম স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারেন, ‘কিছু দিন চলে যাবে আমাদের, আপনাদের চলবে তো?’
শহুরে উচ্চবিত্তদের হাত ধরে গ্রামের দোড়গোড়ায় চলে আসা মৃত্যুর ছায়াঘেরা আজকের বিপন্ন পৃথিবীকে ভবিষ্যতের পথ দেখাবে কি এইসব ছোট ছোট স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামের আত্মবিশ্বাসী বেঁচে থাকা?
লেখক ‘শুধু সুন্দরবন চর্চা’ পত্রিকার সম্পাদক
আলোকচিত্র: অভিজিৎ চক্রবর্তী