
শেষ আপডেট: 12 April 2020 16:38
চিলি ও আর্জেন্টিনার সীমান্তে আছে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি 'এল লুল্লাইল্লাকো' (৬৭৩৯ মি)। ১৯৯৯ সালের ১৬ মার্চ, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের নিজস্ব অভিযাত্রী জোহান রেইনহার্ড আগ্নেয়গিরিটির শিখরে উঠে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিটির বরফ ঢাকা শিখরে ঘুমিয়ে আছে একটি সমাধিক্ষেত্র। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে ডেকে নিয়েছিলেন নীচে বেসক্যাম্পে থাকা তাঁর দলের সব সদস্যকে। 'এল লুল্লাইল্লাকো' অভিযানে আসার আগে এই আগ্নেয়গিরিটি নিয়ে প্রচুর পড়াশুনা করে, তারপর অভিযানে এসেছিলেন রেইনহার্ড। কিন্তু কোনও জার্নালে খুঁজে পাননি শৃঙ্গের ওপরে থাকা সমাধিক্ষেত্রটির কথা। তাই নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দে, প্রবল ঠান্ডাতেও ঘেমে উঠেছিলেন রেইনহার্ড।
[caption id="attachment_208053" align="aligncenter" width="800"]
এল লুল্লাইল্লাকো (৬৭৩৯ মিটার)।[/caption]
একদিন পরে, আগ্নেয়গিরিটির শৃঙ্গে উঠে এসেছিলেন দলটির বাকি সদস্যরা। রেইনহার্ডের মুখে সব শুনে, পুরো দলটি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সমাধি রহস্যের সন্ধানে। দলটি দেখেছিল, পাহাড়ের ওপরে চৌকো একটি গর্ত করা হয়েছে। গর্তটিতে নেমে গিয়েছে একটি পাথরের সিঁড়ি। সেই সিঁড়ির দুই দিকে আছে তিনটি বড়সড় কুলুঙ্গি। কুলুঙ্গি বা খোপগুলি পাথর দিয়ে বন্ধ করা। পাথরগুলি সরিয়ে চমকে উঠেছিলেন রেইনহার্ডের দলের সদস্যরা। তিনটি কুলুঙ্গিতে কুঁকড়ে বসে আছে তিনটি শিশুর মমি। পোড়খাওয়া অভিযাত্রী রেইনহার্ড বুঝতে পেরেছিলেন, শিশু তিনটির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি বরং কষ্ট দিয়ে, তিলে তিলে তাদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
এল লুল্লাইল্লাকো শিখরের সেই ইনকা সমাধিক্ষেত্র।[/caption]
প্রাথমিক গবেষণা থেকে জানা গিয়েছিল, সমাধিক্ষেত্রটি ইনকাদের। মমিগুলি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। মমি তিনটির মধ্যে ছিল দুটি বালিকার ও একটি বালকের মমি। ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গিয়েছিল বালিকা দুজন একই পরিবারের, কিন্তু বালকটি অন্য পরিবারের। প্রত্নতাত্বিকদের মতে লাতিন আমেরিকায় এর আগে এত ভালভাবে সংরক্ষিত মমি খুঁজে পাননি তাঁরা। প্রত্নতাত্বিকেরা তাঁদের অসীম কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন অভিযাত্রী রেইনহার্ডকে। তাঁর জন্যেই গবেষণার নতুন এক দুয়ার খুলে গিয়েছিল লাতিন আমেরিকার প্রত্নতাত্বিকদের কাছে।
অভিযাত্রী রেইনহার্ড সমাধি থেকে বের করে এনেছিলেন মমিগুলি।[/caption]
লা ডনসেল্লা।[/caption]
প্রত্নতাত্বিকেরা জানিয়েছিলেন, ১৩ বছরের 'লা ডনসেল্লা'র মাথায় থাকা কয়েকটি পাকা চুল প্রমাণ করে, কী অসম্ভব মানসিক চাপ নিয়ে তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে হয়েছিল। জীবন্ত সমাধি দেওয়ার আগে 'লা ডনসেল্লা'কে প্রচুর পরিমাণে ভুট্টার মদ খাওয়ানো হয়েছিল। যাতে সে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে। প্রত্নতাত্বিকেরা 'লা ডনসেল্লা'র মুখের ভেতরে পেয়েছিলেন কোকা পাতা। যা নেশা করার জন্য ও হাই অল্টিটিউড সিকনেস কাটানোর জন্য লাতিন আমেরিকার অধিবাসীরা হাজার হাজার বছর ধরে ব্যবহার করে আসছে্ন। 'লা ডনসেল্লা'র ফুসফুসে পাওয়া গিয়েছিল ব্যাকটিরিয়া সংক্রমণের চিহ্নও।
সমাধিক্ষেত্রের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে মুখ করে শোয়ানো হয়েছিল ৬ বছরের বালিকা 'লা নিনা ডেল রায়ো'কে। তার পরনে ছিল হালকা বাদামি আকসু পোশাক। ছোট্ট শরীরটি মোড়া ছিল লাল হলুদ উল দিয়ে বোনা, কারুকার্য করা একটি কম্বল দিয়ে। বালিকার মাথাটি ছিল, অস্বাভাবিক লম্বা। আরেকটি বিষয় গবেষকদের নজরে এসেছিল। 'লা ডনসেল্লা'কে মৃত্যুর আগে দেবকন্যা হিসাবে যে যত্ন করা হয়েছিল, তা পায়নি ৬ বছরের এই হতভাগ্য নাবালিকা 'লা নিনা ডেল রায়ো'। 'লা ডনসেল্লা'র থেকেও নির্মমভাবে এই শিশুটির মৃত্যু ঘটানো হয়েছিল। যখন রেইনহার্ড 'লা নিনা ডেল রায়ো'কে খুঁজে পেয়েছিলেন, বালিকাটির মুখ, একটা কান এবং একদিকের কাঁধ পুড়ে গিয়েছিল। গবেষকেরা বলছেন, সম্ভবত পাহাড়চুড়ায় কখনও বাজ পড়েছিল, সেই কারণেই পুড়ে গিয়েছিল 'লা নিনা ডেল রায়ো'। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছিল বালিকাটির মৃত্যুর অনেক পরে।
[caption id="attachment_208057" align="aligncenter" width="590"]
লা নিনা ডেল রায়ো।[/caption]
সবচেয়ে যন্ত্রণা দিয়ে মারা হয়েছিল 'এল নিনো' নামের বালকটিকে। জীবন্ত অবস্থাতেই দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধা হয়েছিল ৭ বছরের কচি শরীরটাকে। এতই জোরে বাঁধা হয়েছিল, যে 'এল নিনো'র বুকের ও কোমরের পাতলা হাড় ভেঙে গিয়েছিল। প্রচন্ড কষ্ট পেয়ে মৃত্যু হয়েছিল বালকটির। মৃত্যুর আগে শরীর আঁকড়ে ধরা দড়ির চাপে রক্তবমি করেছিল 'এল নিনো'। তার প্রমাণ ছিলো 'এল নিনো'র পোশাকে। তার চুলে উকুন পাওয়া গিয়েছিলো। তিনজনের মধ্যে সেই একমাত্র শিশু, যাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। সম্ভবত আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে পালাতে চেয়েছিল 'এল নিনো'।
আর্জেন্টিনার সল্টায় অবস্থিত ‘দ্য হাই কান্ট্রি আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়াম’-এর এক বিশেষ কক্ষে আজও বসে আছে 'লা ডনসেল্লা'। কক্ষের বায়ুচাপ, অক্সিজেনের মাত্রা ও তাপমাত্রা রাখা হয়েছে 'এল লুল্লাইল্লাকো'র শিখরের মতো। ৫১৪ বছরের পুরোনো মমি 'লা ডনসেল্লা'র দেহকে স্বাভাবিক উপায়ে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে। সারা পৃথিবী থেকে দর্শকরা দেখতে আসেন লা ডনসেল্লাকে। কিন্তু তাঁরা দেখতে পান না, 'লা নিনা ডেল রায়ো' এবং 'এল নিনো'র মমি। কারণ তাদের নিয়ে এখনও চলছে গবেষণা, লোকচক্ষুর অন্তরালে।
[caption id="attachment_208058" align="aligncenter" width="634"]
এল নিনো।[/caption]
যে অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল এল নিনোকে।[/caption]
পাহাড়ের চূড়ায় আগে থেকেই খুঁড়ে রাখা হয়েছিল শিশুগুলির সমাধি। চূড়ায় পৌঁছে শিশুগুলিকে প্রথমে পশুর ঝলসানো মাংস খাওয়ানো হয়েছিল। তারপর আকন্ঠ পান করানো হয়েছিল ভুট্টার মদ। সবশেষে শিশুগুলিকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল শৃঙ্গের পাথর, মাটি, বরফ খুঁড়ে তৈরী মৃত্যুগুহায়। শুরু হয়েছিল, ইনকা পুরোহিতদের ধর্মীয় আচার। শিশুগুলি আচ্ছন্নভাব কাটলেই, জোর করে মুখে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল মদ। মুখে ঠুসে দেওয়া হয়েছিল কোকা পাতা। এক সময়ে শেষ হয়েছিল ইনকা পুরোহিতদের ধর্মীয় আচার। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায়, চৌবাচ্ছার মতো সমাধিক্ষেত্রে, হতভাগ্য শিশুগুলিকে মৃত্যুর হাতে ফেলে রেখে নেমে এসেছিল ইনকা পুরোহিত ও রাজপুরুষেরা।
রাতে 'এল লুল্লাইল্লাকো'র শিখরে শুরু হয়েছিল তুষারপাত। নেশায় আচ্ছন্ন অবস্থায়, জমে কাঠ হতে শুরু করেছিল হতভাগ্য 'লা ডনসেল্লা', 'লা নিনা ডেল রায়ো' এবং 'এল নিনো'র দেহ। একদিন, দু'দিন, তিনদিন, এরপর এক সময় শিশুগুলির চোখে এসে গিয়েছিল ঘুম, শেষ ঘুম। শিশুগুলি মুক্তি পেয়েছিল পৈশাচিক যন্ত্রণা থেকে। কিন্তু, তিনটি সবুজ প্রাণের নির্মম হত্যায় আদৌ কি তুষ্ট হয়েছিলেন ইনকা দেবতারা! না, তুষ্ট হননি, হতে পারেন না। তাই কয়েক দশকের মধ্যেই,স্প্যানিশদের হাতে নির্মম ভাবে ধংস হয়ে গিয়েছিল ইনকা সভ্যতা। সেদিন কিন্তু 'লা ডনসেল্লা', 'লা নিনা ডেল রায়ো' ও 'এল নিনো'র আত্মারা লুল্লাইল্লাকো পর্বতচূড়া থেকে ইনকা সাম্রাজ্য বাঁচাতে নেমে আসেনি। হয়ত নিয়েছিল প্রতিশোধ, এক নির্মম প্রতিশোধ।