
শেষ আপডেট: 2 March 2021 08:54
দেশটার নাম যে মিশর, তার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে আছে হাড় হিম করা নানান গল্পের উপাদান। কায়রো শহর থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরে কিংস ভ্যালিতে মরুভূমির বুকে ঘুমিয়ে রয়েছে হাজার হাজার বছরের প্রাচীন মানুষের দল। তাঁদের ঘিরেও গল্পকাহিনি কম নেই। আর এই মরুভূমি, পিরামিড আর মমির দেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে অবিকল হিন্দু মন্দিরের মতো দেখতে এক প্রাসাদও। 'কুয়াসর-ই-ব্যারন' নামের সেই প্রাসাদ না কি পিরামিডের চেয়েও ভয়ংকর আর রহস্যজনক।
[caption id="attachment_2245745" align="aligncenter" width="600"]
সেই বিখ্যাত কিংস ভ্যালি[/caption]
বেলজিয়াম থেকে মিশরে আসা শিল্পপতি ব্যারন এডওয়ার্ড এমপেইনের একটু বেশিই অনুরাগ ছিল হিন্দু ধর্ম আর সংস্কৃতির প্রতি। পাথর কুঁদে তৈরি হিন্দু মন্দিরের স্থাপত্য খুব ভালো লাগত তাঁর। সেই শৈলীর ধাঁচেই নীলনদের তীরে পেল্লায় এক প্রাসাদ বানিয়ে ফেলেন এই ধনকুবের। একেবারে হিন্দু মন্দিরের মতো দেখতে সেই হাভেলিটি কায়রো শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে অচিরেই। আলেকজান্দ্রে মার্সেল নামে বেলজিয়ামের এক স্থপতির ডিজাইনে ১৯০৭ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল এই হাভেলি। দক্ষিণ ভারতের মন্দিরের ঢংয়ে তৈরি এই প্রাসাদের আর্কিটেকচারের দায়িত্বে ছিলেন জর্জেস-লুই ক্লাউড নামের আরেক শ্বেতাঙ্গ।
কংক্রিটে তৈরি এই দোতলা প্রাসাদের গায়ে নানাজায়গায় খোদাই করা আছে হিন্দু পুরাণের নানা কাহিনি। মেঝেতে পাতা দামি গোলাপি মার্বেল। ঘোরানো সিঁড়ি, শোবার ঘর, লাইব্রেরি, লিভিং রুম সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে স্থাপত্যশৈলীর দারুণ সব নিদর্শন। দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলোয় ক্ষণেক্ষণে রঙ বদলায় এই আশ্চর্য প্রাসাদ। তবু এখানে বসবাস করার সাহস দেখায়না কেউ। ভুলেও কেউ রাত কাটাতে চান না এই কুখ্যাত হাভেলিতে। কিন্তু কেন?
[caption id="attachment_2227946" align="aligncenter" width="499"]
কুয়াসর-ই-ব্যারনের অসাধারণ স্থাপত্য[/caption]
মরুভূমির ভিতর ৬০০০ একর জমি নিয়ে একটা প্রায় মিনি শহর তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছিলেন ব্যারন। প্ল্যান ছিল, সেখানে থাকবে সুইমিং পুল, ফুলের বাগান, ইনডোর আর আউটডোর খেলাধুলোর জায়গা। কিন্তু প্রাসাদ তৈরি শেষ হতেই একের পর এক বিপদের খাঁড়া নেমে আসে ব্যারনের পরিবারের উপর।
ব্যারনের এই রহস্যময় হাভেলি নিয়ে কায়রোর লোকের মুখে মুখে ঘোরে আশ্চর্য সব কাহিনি। একদিন নাকি আচমকাই প্রাসাদের ঘূর্ণায়মান বারান্দা থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায় ব্যারনের বোন হেলেনার। তিনি ওইসময় ওই বিশেষ জায়গায় কী করছিলেন, পড়েই বা গেলেন কীভাবে, তা আজও জানা যায়নি।
এই ঘটনার শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ঘটে যায় আরও একটা দুর্ঘটনা। ব্যারনের মানসিকভাবে অসুস্থ মেয়ে মারিয়মকে একদিন পাওয়া গেল প্রাসাদের লিফটের ভেতর মৃত অবস্থায়। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু ভয় পাইয়ে দিয়েছিল পরিবারের সকলকে। একই পরিবারের দু'দুজনের এই অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল কায়রোর অলিতে-গলিতে। দিনের বেলাও লোকে 'কুয়াসর-ই-ব্যারন'এর পথে যেতে ভয় পেত। এরপর ১৯২৯ সালে ওই বাড়িতেই মারা যান গৃহকর্তা ব্যারন এডওয়ার্ড এমপেইন।তারপর থেকে আর কোনও পরিবার কখনও রাত কাটায়নি এ বাড়িতে।
[caption id="attachment_2245763" align="aligncenter" width="375"]
ব্যারন এডওয়ার্ড এমপেইন[/caption]
ফাঁকা বাড়িতে প্রথম প্রথম চোরডাকাতের উপদ্রব বেড়েছিল বটে, কিন্তু রহস্যময় কিছু ব্যাপার-স্যাপার দেখে ফেলার পর ভয়ে চোর-ডাকাতেরাও আর পা রাখেনা ব্যারন প্রাসাদের ত্রিসীমানায়। কায়রোর মানুষের মুখে মুখে আজও ঘোরে আশ্চর্য অনেক গল্প। এই প্রাসাদের মধ্যে ঢুকলেই না কি রক্তের দাগ ফুটে উঠত মেঝেছে, শোনা যেত অশরীরী কান্না। এমনই অনেক ব্যাখ্যাতীত কাণ্ডকারখানায় এ বাড়িকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। মিশরের মানুষ বিশ্বাস করে যতই দেখতে সুন্দর হোক না কেন, এ বাড়ির মধ্যে এক অশুভ শক্তির ছায়া আছে, যা তছনছ করে দিতে পারে সুখের গেরস্থালি।
একের পর এক দুর্ঘটনায় বিপর্যস্ত ব্যারনের পরিবার সেই ১৯৫২ সালেই কায়রো ছেড়ে স্বদেশে ফিরে যান। তারপর থেকে পরপর হাতবদল হয়ে ১৯৫৭ থেকে এই রাজকীয় প্রাসাদের মালিকানা যায় এক সৌদি ব্যবসায়ীর হাতে। শোনা যায়, পরের মালিকেরাও কেউ রাতে থাকার সাহস দেখায়নি এই প্রাসাদে। এই অট্টালিকায় দিনেরবেলা এলেও গা ছমছম করে।
২০০৫-এ ভারতীয় দূতাবাস এটি অধিগ্রহণ করে এখানে সংস্কৃতি কেন্দ্র গড়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত প্রাসাদটি অধিগ্রহণ করে ইজিপ্ট সরকার এবং বর্তমানে এর সারাইয়ের কাজ চলছে।
আশা করা যায়, খুব শিগগিরই এর অতীত গৌরব ফিরিয়ে দেওয়া যাবে। কোভিড বেড়া ডিঙিয়ে 'কুয়াসর-ই-ব্যারন'এর দরজাও খুলে দেওয়া হবে পর্যটকদের জন্য।