
শেষ আপডেট: 25 March 2023 18:10
মারফি বেবি’ এবং মারফি রেডিও।[/caption]
‘মারফি রেডিও’ ছিল ইংল্যান্ডের একটি বিখ্যাত রেডিও ও টেলিভিশন নির্মাতা কোম্পানি। ইংল্যান্ডের ওয়েলউইনে ছিল এদের সদর দফতর। ফ্র্যাঙ্ক মারফি ও ইজে পাওয়ার ১৯২৯ সালে এই কোম্পানিটি তৈরি করেছিলেন, আধুনিক রেডিও সেটের বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান বাজার ধরার উদ্দেশ্য নিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় 'মারফি রেডিও' কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। যুদ্ধরত ব্রিটিশ সেনাদের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য কিছু উন্নতমানের রেডিও সেট বানিয়েছিল। সেই সেটগুলির মধ্যে জনপ্রিয় ছিল Wireless Set No. 38 সেটটি। এছাড়াও সমুদ্রপথে থাকা ব্রিটিশ নৌসেনাদের কাছে খবর পৌঁছনোর জন্য 'মারফি রেডিও' বানিয়েছিল শক্তিশালী B40 সিরিজের রেডিও।
[caption id="attachment_208148" align="alignnone" width="236"]
মারফি রেডিওর বিজ্ঞাপনে শর্মিলা ঠাকুর।[/caption]
কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে ফ্র্যাঙ্ক মারফি ১৯৩৭ সালে নিজের তৈরি করা কোম্পানি থেকে বেরিয়ে গিয়ে তৈরি করেছিলেন আর একটি কোম্পানি। নাম দিয়েছিলেন ‘FM Radio’ বা ফ্র্যাঙ্ক মারফি রেডিও। ১৯৫৫ সালে ৬৫ বছর বয়সে ফ্র্যাঙ্ক মারফি প্রয়াত হলেও, বিশ্বজুড়ে তাঁর নামাঙ্কিত ব্র্যান্ড ‘মারফি' রেডিও সেট রমরমিয়ে চলছিল। ‘মারফি’ রেডিওর ঢেউ এসে পড়েছিল ভারতের বিশাল বাজারেও। একসময় ভারতের বাজার ছেয়ে ফেলেছিল ‘মারফি’ রেডিও। তখনকার দিনের জনপ্রিয় দুই চিত্রতারকা শর্মিলা ঠাকুর ও বৈজয়ন্তীমালাকে নিয়মিত দেখা যেত মারফি রেডিওর বিজ্ঞাপনে। কিন্তু তারপর হঠাৎই বিজ্ঞাপনে দেখা গিয়েছিল গালে আঙুল দেওয়া একটি শিশুর মিষ্টি মুখ। সুপারহিট হয়ে গিয়েছিল বিজ্ঞাপনটি। কিন্তু শিশুটির নাম বা পরিচয় কখনও জানা যায়নি। জানা যায়নি সে ভারতীয় না বিদেশি।
কিন্তু বেশ কয়েকমাস পরে শিশুটির মুখ বিজ্ঞাপন থেকে সরিয়ে নিয়েছিল মারফি রেডিও। এর পিছনে ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। জানা গিয়েছিল বিজ্ঞাপনের শিশুকন্যাটির মৃত্যু হয়েছিল আকস্মিকভাবে। কিন্তু শিশুকন্যাটির বিজ্ঞাপন ছিল সুপারহিট। তাই 'মারফি রেডিও' ভারতজুড়ে খুঁজতে শুরু করেছিল প্রয়াত শিশুকন্যাটির মতো দেখতে একটি ভারতীয় শিশুর মুখ। যেটি হবে মারফি রেডিওর প্রতীক। মারফি রেডিওর বিজ্ঞাপন বানানোর কাজ করত যে কোম্পানিটি, তার লোকজন সারা ভারতের পথে ঘাটে নেমে পড়েছিলেন।
তাঁদেরই একজন ঘটনাচক্রে ছিলেন মানালিতে। মানালির এক গ্রামে সেই ভদ্রলোক দেখতে পেয়েছিলেন তিব্বত থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া একটি পরিবারকে। তাঁদের সঙ্গে থাকা তিন বছরের একটি শিশুকে দেখে চমকে উঠেছিলেন ভদ্রলোক। মারফি রেডিওর সুপারহিট বিজ্ঞাপনের শিশুকন্যাটির সঙ্গে এই শিশুপুত্রটির হুবহু মিল। ব্যাস,বাকিটা ইতিহাস। কয়েকদিনের মধ্যে সারা ভারতজুড়ে খবরের কাগজ, পত্রপত্রিকায়, হোর্ডিং-এ ঘুরতে শুরু করেছিল তিন বছর বয়সী তিব্বতি শিশুটির ছবি। কিন্তু তখনও শিশুটির পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল। শিশুটির পরিচয় জানা গিয়েছিল ঘটনাটির ৩৭ বছর পর।
[caption id="attachment_208152" align="alignnone" width="720"]
মারফি রেডিওর বিজ্ঞাপনে সেই তিব্বতি শিশুটি।[/caption]
কারণ বিজ্ঞাপনের জন্য ছবিটি তোলার পর, শিশুটি প্রায় কুড়ি বছর কাটিয়েছিল বৌদ্ধ মনাস্ট্রিতে। বিজ্ঞাপনের শিশুটির নাম ছিল কাগিউর টুল্কু রিনপোচে। তিব্বতীদের ধর্মীয় আচার অনুসারে, বংশের প্রথম সন্তানকে মনাস্ট্রিতে বাধ্যতামূলকভাবে পাঠাতে হয়। ধর্মশিক্ষা ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে। একই ঘটনা ঘটেছিল ‘মারফি বেবি’র ক্ষেত্রেও। ২০ বছর পর মনাস্ট্রি থেকে যুবক হয়ে সংসারে ফিরে এসেছিলেন কাগিউর টুল্কু রিনপোচে। হয়ে উঠেছিলেন তিব্বতীয় ভেষজ চিকিৎসার একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। বেশ কিছু বছর মানালিতে কাটিয়ে ভাগ্যের সন্ধানে চলে গিয়েছিলেন দিল্লি। এখানেই একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে রিনপোচের দেখা হয়ে গিয়েছিল হিন্দি ছবির মোহময়ী নায়িকা মন্দাকিনীর সঙ্গে।
[caption id="attachment_208155" align="alignnone" width="500"]
মন্দাকিনীর সঙ্গে ‘মারফি’ বেবি রিনিপোচে।[/caption]
সেই মন্দাকিনী, যাঁকে রাজকাপুরের ‘রাম তেরি গঙ্গা ময়লি’ ছবিতে দেখা গিয়েছিল। দেখা গিয়েছিল দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে শারজার ক্রিকেট মাঠের প্রেসবক্সে। ইয়াসমিন যোশেফ ওরফে মন্দাকিনী তখন হারিয়ে গিয়েছিলেন ছবির জগৎ থেকে। দাউদের সঙ্গে নাম জড়িয়ে যাওয়ায় সারা ভারতে প্রায় একঘরে হয়ে দিন কাটছিল তাঁর। রিনপোচের সঙ্গে মন্দাকিনীর আলাপ থেকে হয়েছিল বন্ধুত্ব, সেখান থেকে প্রেম। মন্দাকিনীর সঙ্গে ৯০-এর দশকের শুরুতে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল রিনপোচের। কিছুদিন দিল্লিতে কাটিয়ে মন্দাকিনী আর রিমপোচে চলে গিয়েছিলেন মুম্বই।
[caption id="attachment_208156" align="alignnone" width="960"]
কাগিউর রিনপোচেকে বিয়ে করলেন মন্দাকিনী।[/caption]
[caption id="attachment_208163" align="aligncenter" width="602"]
বিয়ের পর প্রথম গিয়েছিলেন দলাই লামার আশীর্বাদ নিতে।[/caption]
এখনও মুম্বাইতেই থাকেন তাঁরা, লোকচক্ষুর আড়ালে তাঁদের সুখী সংসার নিয়ে। মুম্বাইতে নিজের যোগা ক্লাস চালান মন্দাকিনী। ডাঃ রিনপোচে চালান তাঁর টিবেটান মেডিসিন সেন্টার। মন্দাকিনী আজ রুপালী পর্দা থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে চলে গিয়েছেন। মাঝে মাঝে একমাত্র কন্যা আর স্বামীকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান লাদাখ হিমালয়ে থাকা বিভিন্ন বৌদ্ধ মনাস্ট্রিতে। কখনও যান দলাই লামার আশীর্বাদ নিতে। ভাবতে অবাক লাগে যে দুটি মানুষ একসময় ভারতের ঘরে ঘরে পরিচিত ছিলেন, আজ তাঁরা প্রচারের আলো থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে প্রভু বুদ্ধের পায়ে বিলীন হয়ে গিয়েছেন।