
শেষ আপডেট: 2 February 2019 12:30
রুপাঞ্জন গোস্বামী
ভারতেরই এক পাহাড়ি উপত্যকার ঘিঞ্জি মফস্বলের দোতলা সাদামাটা বাড়ি। বাড়িতে লুকিয়ে আছে তিন জঙ্গি। পণবন্দি করে রেখেছে বাড়ির পাঁচজনকে। প্রায় আটঘণ্টা কেটে গেছে। জঙ্গিরা তাদের দাবি জানিয়েছে ভারত সরকারকে। অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য দাবী। মেনে নেওয়া যাবে না। কিন্তু জঙ্গিরা জানিয়েছে তারা আত্মঘাতী মিশনে এসেছে। দাবি না মিটলে তারা পণবন্দিদের একে একে হত্যা করবে। তারপর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা নিজেদের সাথে বাড়িটিকেও উড়িয়ে দেবে। উভয়পক্ষে চলতে থাকে কথা। উপত্যকা ঘিরে নামতে থাকে হিমশীতল রাত। বাড়িটি ঘিরে আছে ভারতীয় সেনা বাহিনী। থেকে থেকে ছুটে আসছে জঙ্গিদের গুলি। বাড়ির ওপরে সার্চ লাইট ফেলে রাখা হয়েছে। পাড়ার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। হটাৎ, সার্চ লাইটের আলো নিভে যায়। জঙ্গিরা এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। যখন এসব চলছে, তখন রাতের আঁধারে জ্বলে ওঠে পাঁচ জোড়া চোখ। নিঃশব্দে বাড়িটির দিকে এগিয়ে যায় পাঁচটি কালো চিতা। অকল্পনীয় ক্ষিপ্রতায় দু'জন উঠে পড়েন বাড়ির ছাদে। তিনজন বাড়ির সামনে ও পিছনে পজিশন নেন। আচমকাই নীচের দরজায় কান ফাটানো বিস্ফোরণ হয়। গোটা এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এক সঙ্গে দু'টি করে মোট চারটে গুলির শব্দ শোনা যায়। তারপর সব চুপ। দশ মিনিট পর জ্বলে ওঠে সার্চ লাইটের আলো। বাড়িটির পাল্লাহীন দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসেন পাঁচজন NSG কম্যান্ডো। সঙ্গে পাঁচ পণবন্দি। বাড়ির ভেতর পড়ে থাকে বিস্ফোরক বোঝাই জ্যাকেট পরা দুই জঙ্গির দেহ। দুজনের কপালেই গভীর ক্ষত। তৃতীয় জঙ্গি পড়ে আছে সিঁড়িতে। নিঃশব্দে তার শ্বাসনালী অতি মসৃণ ভাবে ফালাফালা করে দিয়েছে, এক শাণিত Glock Knife।
বিমান কব্জা করে রাখা হাইজ্যাকার বা বহু মানুষকে পণবন্দি করে রাখা সন্ত্রাসবাদীদের ওপর, চোখের নিমেষে প্রাণঘাতী হামলা চালানোর জন্য, গৃহমন্ত্রকের অধীনে সদা জাগ্রত থাকেন NSG কম্যান্ডোরা। এঁরাই দেশের সেরা বাহিনী। গুলি চালান একেবারে সঠিক নিশানায়। যে কোনও পরিস্থিতিতে, ঠান্ডা মাথায় শত্রুর মাথায় গুলি করার অকল্পনীয় দক্ষতা থাকে এঁদের।
পণবন্দি উদ্ধার মিশন, সন্ত্রাসবাদী হামলার প্রত্যাঘাত ছাড়াও IED জাতীয় বিস্ফোরক খুঁজে বার করে নিস্ক্রিয় করা, বিস্ফোরণ পরবর্তী তদন্ত করা ও দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের সুরক্ষা দান করাও NSG-এর কাজ। ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (NSG) অধীনে আছে তিন বাহিনী,স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ (SAG), স্পেশাল রেঞ্জার গ্রুপ (SRG) ও স্পেশাল কম্পোজিট গ্রুপ (SCG)
NSG-তে যোগ দেওয়ার আগে প্রত্যেক জওয়ানকে আলাদা ট্রেনিং দেওয়া হয়। NSG-এর জন্য নির্বাচিত জওয়ানকে পাঠানো হয় ৯০ দিনের প্রশিক্ষণ শিবিরে। ফিজিক্যাল ফিটনেস উচ্চমানে রাখতে, প্রায় ২৬ ধরণের ট্রেনিং দেওয়া হয়। দেওয়া হয় সহ্যশক্তি বাড়ানো ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার প্রশিক্ষণও।
বিপদসঙ্কুল ক্রসকান্ট্রি রেসের পর করানো হয় টার্গেট-শ্যুটিং প্র্যাকটিস। ৯০ দিনের প্রশিক্ষণ শিবিরে আসা জওয়ানদের মধ্যে প্রায় ৭০- ৮০ শতাংশ, এই প্রাণান্তকর প্রশিক্ষণ শিবির থেকেই বাদ চলে যান। যাঁরা টিকে থাকেন, তাঁরাই NSG-তে যোগদান করার সুযোগ পান।
NSG-তে যোগ দেওয়ার পরে শুরু হয় ৯ মাসের আরও কঠিন ট্রেনিং। NSG কম্যান্ডোদের 'one shot one kill' এর লক্ষে তৈরি করা হয়। NSG কম্যান্ডোদের শুধু মাত্র Head-shot বা শত্রুর মাথাতেই একমাত্র গুলি করার ট্রেনিং দেওয়া হয়।প্রশিক্ষণের সময়ে টার্গেটের পাশে দাঁড় করানো হয় একজন কম্যান্ডোকে। তারপর টার্গেট লক্ষ করে গুলি করতে থাকেন আর একজন কম্যান্ডো। গুলির নিশানা নিখুঁত হতেই হবে। অনুশীলনের সময়ে ৮৫ শতাংশ বুলেটকে টার্গেটে হিট করতেই হবে। এটাই হলো ন্যূনতম মাপকাঠি।
তাঁরা সদা জাগ্রত আছেন, এটা জানাতে, ভারতীয় সেনাবাহিনী এক সপ্তাহে যে পরিমাণ গুলি খরচ করে, NSG কম্যান্ডোরা এক সপ্তাহে তার থেকে বেশি গুলি খরচ করেন। দু’মাসে একজন NSG কম্যান্ডো গড়ে ১৪,০০০ রাউন্ড গুলি খরচ করেন। সঙ্গে শেখানো হয় parkour ও Pekiti-Tirsia Kali নামে ফিলিপিন্সের দুটি মার্শাল আর্ট। ৯ মাসের ট্রেনিং শেষে সেরা কয়েকজনকে ইজরায়েলে আরও উন্নত প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়।
শত্রুর অবস্থান বুঝতে NSG কম্যান্ডোরা ব্যবহার করেন kamikaze drone। এটি ছাড়াও NSG কম্যান্ডোদের হাতে আছে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম মিলিটারি ড্রোন Black Hornet Nano এবং আকাশ থেকে শত্রুকে লক্ষ করে গ্রেনেড ছুঁড়তে সক্ষম 38 mm weaponised drone।
আছে রিমোর্ট কন্ট্রোলে চালানো গাড়ি ROV । যেটি ১৫০ কেজি IED (improvised explosive device) ছাড়াও বহন করতে পারে রাসায়নিক, জৈব, তেজস্ক্রিয় ও আণবিক অস্ত্রও। অনেক অভিযানে NSG কম্যান্ডোদের সঙ্গী হয় k9 নামে এক ভয়ংকর ডগ স্কোয়াড।
অপারেশন ব্ল্যাক থান্ডার, অপারেশন অশ্বমেধ, অপারেশন বজ্রশক্তি, অপারেশন ব্ল্যাক টর্নেডো ছাড়াও একের পর এক রুদ্ধশ্বাস অভিযানে সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন NSG কম্যান্ডোরা। তাই হয়তো, একের বিরুদ্ধে এক, এই পরিস্থিতিতে NSG কম্যান্ডোরা আজ বিশ্বসেরা। ভারতের NSG আজ পৃথিবীর সেরা পাঁচ কম্যান্ডো বাহিনীর অন্যতম। যাদের মূলমন্ত্র, " सर्वत्र सर्वोत्तम सुरक्षा"।