
শেষ আপডেট: 19 April 2024 17:56
অমল সরকার
‘বয়ফ্রেন্ড সরকারি চাকরি পাচ্ছে না? বয়ফ্রেন্ড না বদলে সরকার বদলান।’ দেওয়ালে লেখা এই কথাটি কয়েকদিন যাবৎ হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকেও ঘুরছে।
দিল্লির নামজাদা সংস্থা সিএসডিএস তাদের সদ্য প্রকাশিত সমীক্ষায় জানিয়েছে, এবারের লোকসভা নির্বাচনে আম আদমির প্রধান ইস্যু মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি। আজকের ভারতের এই পাহাড়প্রমাণ সমস্যাটি সাধারণের কাছে জলবৎ তরলং করে তুলে ধরতে দেওয়ালের ওই লেখাটি সমাজমাধ্যমে বহু মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সরকারি চাকরি নিয়ে তাতে একদিকে যেমন দিল্লির ক্ষমতা থেকে নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে সরানোর আহ্বান আছে, একই সঙ্গে বাংলায় চাকরি দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৃণমূল সরকারের জন্যও তা মস্ত রাজনৈতিক খোঁচা। তবে বলাইবাহুল্য, লোকসভা ভোটে কেন্দ্রের সরকার ও শাসক দলকেই অনেক বেশি আক্রমণের মোকাবিলা করতে হবে। বিজেপিকে বিঁধে দেওয়াল লেখা হয়েছে, ‘দরকার ছিল ভাত, ধরিয়ে দিল জাত। দরকার ছিল কর্ম, ধরিয়ে দল ধর্ম।’
শুক্রবার এবারের লোকসভা নির্বাচনের সাত দফা টুর্নামেন্টের সূচনা হয়ে গিয়েছে। চার বছর আগে বিধানসভা নির্বাচনে সাড়া ফেলে দেওয়া তৃণমূলের স্লোগান ‘খেলা হবে’ এবার তেমন একটা শোনা যাচ্ছে না। যদিও স্লোগানের কপিরাইট যাঁর সেই দেবাংশু ভট্টাচার্য নিজেও এবার প্রার্থী। কোনও সন্দেহ নেই, ২০২১-এর ভোট তৃণমূলকে অনেক শক্তি জুগিয়েছিল ‘খেলা হবে।’ ব্যান্ডেজ বাঁধা পায়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সভার পর সভায় বলেছিলেন, ‘খেলা হবে।’
বেশিরভাগ বড় দলই ভোট বৈতরণী পেরতে এখন বেসরকারি উপদেষ্টা নিয়োগ করে। মোদীকে ‘চা-ওয়ালা’, মমতা সম্পর্কে ‘বাংলা ঘরের মেয়েকে চায়’ কথাগুলি উপদেষ্টাদের অবদান। যদিও কালজয়ী বেশিরভাগ স্লোগান, ছড়ারই কপিরাইটের দাবিদার নেই। কারণ, সেগুলির সৃষ্টিকর্তারা সৃষ্টি করেছিলেন রাজনৈতিক আদর্শ এবং দলের প্রতি কর্তব্য থেকে।
আজও ভারতের রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত তিনটি স্লোগান ‘বন্দে মাতরম’, জয়হিন্দ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ, একই সঙ্গে সবচেয়ে পুরনো। বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের বন্দে মাতরম গানটি কংগ্রেসের সম্মেলনে গাওয়ার পর থেকে সেটি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রেরণা হয়ে ওঠে। হাজার হাজার মানুষ বন্দে মাতরম ধ্বনি দিতে দিতে জীবন বাজি রেখে ইংরেজ পুলিশের দিকে ধেয়ে যায়। বিপ্লবী জীবন বেছে নেন অসংখ্য নারী-পুরুষ।
আজাদ হিন্দ বাহিনী থেকে ‘জয় হিন্দ’ কথাটি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। আর ভগৎ সিংহের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ আজ আর শুধু কমিউনিস্ট পার্টি নয়, বাম-ডান নির্বিশেষে সব প্রতিবাদীর মুখে উচ্চারিত হয়। যেমন কালজয়ী হয়ে আছে ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’, ‘বাঁচতে হলে আন্দোলন করতে হবে’, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’-এর মতো বামপন্থীদের স্লোগানগুলি। বাংলায় ক্ষমতা দখলের লগ্নে তৃণমূলের মুখেও এই স্লোগানগুলি শোনা গিয়েছে। অনেকেই যে কারণে বলে থাকেন, ক্ষমতা দখলে বামপন্থার জার্সি বেশ কাজে আসে বেশি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মন্ত্রের মতো কাজ করেছিল শেখ মুজিবুর রহমানের 'জয়বাংলা' স্লোগান, হালে যা এপারেও শোনা যাচ্ছে। ইন্দিরা গান্ধীর ‘গরিবি হটাও’ এবং নরেন্দ্র মোদীর ‘অচ্ছে দিন’-এর প্রতিশ্রুতির পরিণতি, প্রতিক্রিয়া নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা হতেই পারে। অনেকেরই হয়তো মনে নেই বিজেপি নেতাদের মুখে ‘জয় জওয়ান জয় কিষান’ কথাটি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর। এখন জয়ের সঙ্গে শ্রীরাম যোগ করাই যেন দস্তুর।
ছড়া, স্লোগান জাতীয় রাজনীতির অনুষঙ্গ হলেও দেওয়াল লিখনের চল সব রাজ্যে সমান নয়। বাংলার ধারেকাছে নেই বাকি কোনও রাজ্য। অভিজ্ঞতা বলে নির্বাচনী হিংসার সূত্রপাত দেওয়াল দখল থেকে। নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতায় একটা চুনকাম করা দেওয়ালের নিচের দিকে লেখা ছিল ‘অল ওয়াল ফর সিপিআই (এম), আপ টু ২০০০। তার নিচে তৃণমূল লিখে দিয়েছিল, ‘অল ওয়াল ফর তৃণমূল কংগ্রেস আফটার ২০০০।’ ঘটনাচক্রে ২০০০ সালে কলকাতা পুরসভায় ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। দলের বয়স তখন মাত্র দুই। এগারো বছর পর গোটা রাজ্যেই পরিবর্তন হয়। ২০১১-এর সেই বিধানসভা ভোটে বহুল ব্যবহৃত এবং দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা শব্দটি ছিল ‘পরিবর্তন’।
শব্দটির রাজনৈতিক তাৎপর্য এতটাই যে পাঁচ বছর পর ‘পরিবর্তনের পরিবর্তন’ চেয়ে ভোট চাইতে হয় সিপিএমকে। সেই স্লোগান এবার শোনা না গেলেও ঘুরে ফিরে সিপিএম দেশের সঙ্গে রাজ্যেও পরিবর্তনের কথাই বলছে। ২০২৪-বাংলায় বাম প্রত্যাবর্তনের ভোট হবে কি না তা নিয়ে কৌতূহল তুঙ্গে। বাম রাজনীতির নিবিড় পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, সিপিএম-সহ বামদলগুলির নানা দুর্বলতার একটি হল ভাল স্লোগানের অভাব।
আগেই বলেছি, রাজনীতির স্লোগান, ভোটের ছড়ার আয়ু বা মেয়াদের ফারাক আছে। ১৯৮৯-এর লোকসভা ভোটে বোফর্স কামান কেলেঙ্কারির অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে নিয়ে লেখা ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়’ সম্ভবত গোটা দেশেই কোন একটি নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত স্লোগান। ওই কথা লিখে বাংলার দেওয়াল ভরিয়ে দিয়েছিল সিপিএম।
রাজীবের বিরুদ্ধে বোফর্স দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। রাহুল গান্ধী সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ২০১৯-এর ভোটে রাফাল বিমান কেনা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ বলে নরেন্দ্র মোদীকে বিঁধেছিলেন। এবার ‘চোর’ কথাটি বাংলায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে বাকিরা। দেওয়াল লেখা হয়েছে, ‘পাশ করতে টেট, নবান্নে চাই ভেট।’
নির্বাচনী প্রতীকের মতো রাজনীতির সহজপাঠ হিসাবে স্লোগান, ছড়া তুলনাহীন। রাজনীতির জটিল কথা আম আদমির বোধগম্য করে তুলতে এগুলির ব্যবহার দেশের প্রথম নির্বাচন থেকেই চালু হয়েছে। আবার রাজনীতির কারণেই বহু স্লোগান, ছড়া ইত্যাদি হারিয়ে যায়। ভাবাবেগে আঘাত লাগবে অনুমান করেই সিপিএম সেই স্লোগানটটি দেওয়াল থেকেও মুছে দিয়েছিল ১৯৯৮ সালের লোকসভা ভোটে যা পার্টির কর্মী-সমর্থকদের মুখে মুখে ফিরত। সেবার সদ্য জন্ম নেওয়া তৃণমূল বিজেপির হাত ধরে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিল। সিপিএমের সেবার স্লোগান ছিল, ‘বিষবৃক্ষের দুটি ফুল, বিজেপি ও তৃণমূল।’ বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক পদ্ম ফুলের সঙ্গে হিন্দু ভাবাবেগ জড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, ঘাসফুলও ত্যাজ্য নয়, যা তৃণমূলের প্রতীক।
লক্ষণীয় হল, সিপিএমের ‘দিদি-মোদী’ স্লোগানের জবাবে মমতার পাল্টা ‘রাম-বাম’ সমান প্রচার পেয়েছে। ২০১৪-র লোকসভা ভোটে রাম-বামের সঙ্গে কংগ্রেসকে জুড়ে নিয়ে তৃণমূল স্লোগান দিয়েছিল, ‘একই বৃন্তে তিনটি ফুল, সিপিএম-কংগ্রেস-পদ্মফুল। তিন দলের একটাই গুণ, সন্ত্রাস আর মানুষ খুন।’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর চার-সাড়ে চার দশকের রাজনীতিতে ‘সিপিএমের সন্ত্রাস’ কথাটিই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন। সিপিএম পাল্টা তৃণমূলের বিরুদ্ধে চুরিচামারির পাশাপাশি সন্ত্রাসের অভিযোগেও সরব। তারা দেওয়ালে লিখেছে, ‘শত কমরেডকে মারলি তোরা, আদর্শটাকে পারবি? মারবি যত বাড়বে মিছিল। মার কত মার মারবি।’
২০১৬ ও ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের আগে তৃণমূলের সেই ছড়াটিও সাড়া ফেলেছিল, ‘ভোটে নতুন চমক, সাপে নেউলের সন্ধি, বাম কংগ্রেস জোট বেঁধেছে, মাথায় নতুন ফন্দি।’
বিজেপির জয় শ্রীরাম এখন বহু মুখে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগে গেরুয়া শিবিরের মুখে মুখে ফিরত, ‘এক ধাক্কা আউর দো, বাবরি মসজিদ তোড় দো।’ সেই মসজিদ ভেঙে ফেলার পর তারা নতুন স্লোগান তোলে, ‘এ তো সিরফ ঝাঁকি হ্যায়, কাশী, মথুরা বাকি হ্যায়।’ বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ, মথুরার শাহী ইদগা মসজিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। আদালত সেগুলি বেআইনি বাড়ি ঠাউরে সরিয়ে নেওয়ার নিদান দেবে না এমন নিশ্চয়তা নেই।
ভোটের প্রচারে ব্যক্তি আক্রমণের পথ পরিহার করতে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের পই পই করে অনুরোধ করেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমার। কমিশন দিস্তা দিস্তা নির্দেশিকা পাঠাচ্ছে। তাতেও প্রার্থীকে তুই-তোকারি করা থেকে জাত-ধর্ম-চরিত্র নিয়ে কটাক্ষের বিরাম নেই। পুরনো ভোটের ছড়ায় চোখ বোলালে বোঝা যায় অসুখটা নতুন নয়, বলতে গেলে গোড়াকার ব্যামো। ছয়-সাত দশকে বাংলার রাজনীতিতে কংগ্রেসের নামজাদা নেতা ছিলেন অতুল্য ঘোষ। তাঁর একটা চোখে দৃষ্টিশক্তি ছিল না। আড়ালে অনেকেই তাঁকে ‘কানা অতুল্য’ বলতেন। এমনকী দেওয়ালে লেখা হয়েছিল, ‘জলের শত্রু কচরিপানা, দেশের শত্রু অতুল্য কানা।’
ভারত-চিন যুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়। সিপিআইয়ের দলীয় প্রতীক নিয়ে কংগ্রেস দেওয়ালে দেওয়ালে লেখে, ‘চিনের চিহ্ন কাস্তে-হাতুড়ি, পাকিস্তানের তারা, এরপরও কি বলতে হবে দেশের শত্রু কারা?’
ভোটের ছড়া, দেওয়াল লিখনে অক্ষত হয়ে আছে দুই কমিউনিস্ট পার্টির বিবাদ। ১৯৬৪-তে সিপিআই ভেঙে সিপিএম, ’৬৭তে সিপিএম থেকে বেরিয়ে গিয়ে নকশালপন্থীরা তৈরি করে সিপিআই (এমএল)। জরুরি অবস্থার দিনগুলিতেও ইন্দিরা গান্ধীর পাশে ছিল আদি কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআই। পরের ভোটে কংগ্রেসের নতুন প্রতীক আর সিপিআইকে জড়িয়ে সিপিএম দেওয়ালে লিখেছিল, ‘দিল্লি থেকে এল গাই, সঙ্গে বাছুর সিপিআই।’ সেই অতীতকে পিছনে ফেলে দুই কমিউনিস্ট পার্টি জোট বেঁধেছে বহুকাল।
দেওয়াল লিখন আর ছড়াতেই থাকে ভোটারের মন জয়ে কাজের ফিরিস্তি আর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ভোটার দেবতার মন বুঝতে পারে ক’জনে! প্রতিশ্রুতিকে কটাক্ষ করে দাদা ঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিত লিখেছিলেন, ‘ভোট দিয়ে যা/আয় ভোটার আয়/মাছ কুটলে মুড়ো দিব/গাই বিয়োলে দুধ দিব/দুধ খেতে বাটি দিব/সুদ দিলে টাকা দিব/ফি দিলে উকিল দিব……..।
গত বছর অক্টোবরে প্রয়াত হয়েছেন প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট অমল চক্রবর্তী। ১৯৮৭-র ১০ মার্চ বিধানসভা ভোটের সময় যুগান্তর পত্রিকায় রোজনামচা বিভাগে তাঁর আঁকা কার্টুনের সঙ্গে ছাপা ডাঃ স্বপন চক্রবর্তীর ছড়াটি এই ব্যাপারে কালজয়ী বলা চলে। ‘ভোটদিন’ শীর্ষক ছড়াটিতে লেখা হয়েছিল—পদযাত্রা লোকারণ্য মহাধূমধাম/প্রার্থীরা লুটায় পথে করিছে প্রণাম/গলবস্ত্র ভোটপ্রার্থীরা বলে, করো পার/‘আমাকেই ভোটটি দিও’/হাসিছে ভোটার।