
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 5 June 2024 07:13
মাত্র বছর খানেক আগের কথা। তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় দলের মর্যাদা কেড়ে নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে টিপ্পনি করতে ছাড়েনি বিজেপি। আঞ্চলিক শক্তি বলে দেগে দিয়ে বলেছিল, বাংলার বাইরে তাঁদের কোনও মূল্যই নেই।
সদ্যসমাপ্ত লোকসভা ভোটে সেই খেলা রাতারাতি ঘুরে গেল। তৃণমূল যে বাংলায় কেবল জিতল তাই নয়, বিজেপিকে রীতিমতো ধরাশায়ী করে স্যুইপ করল রাজ্যে। আর এই বড়সড় জয়ই মমতাকে ফের প্রাসঙ্গিক করে দিল জাতীয় রাজনীতিতে। ২০২৪-এর এই সাধারণ নির্বাচনে জেতার পরে বলাই যায়, মমতা বন্দ্যাপাধ্যায় এখন আর কেবল বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নন, তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছেন। তাঁকে আর উপেক্ষা করা যাবে না।
কেন হঠাৎ এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
এর উত্তর এবং কার্যকারণ খুবই সহজ। সেই ২০১৪ সাল থেকে ভারতে একটিই দলের শাসন ব্যবস্থা চলছে। এনডিএ সরকার কেবল নামেই একটি জোট। বাস্তবে, বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় শরিক দলগুলির কোনও গুরুত্বই ছিল না সরকার পরিচালনায়। কেন্দ্র বলতে ভারত বিজেপি-কেই জানত, দেশ চালানোর লোক বলতেও চিনত স্রেফ দু'জন মানুষকে, নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ।
এই একদলীয় শাসন ব্যবস্থারই অবসান ঘটিয়েছে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন। এনডিএ বেশি ভোট পেলেও, ভোটের অঙ্কে স্পষ্ট, যে বিজেপি আর একক বৃহত্তম সংখ্যাগরিষ্ঠ দল নয়। সরকার গড়তে হলে তাদের নির্ভর করতে হবে তেলুগু দেশম, সংযুক্ত জনতা দলের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলির উপরেই। আর গত কয়েক বছর ধরে দেখাই যাচ্ছে, ভারতে অধিকাংশ আঞ্চলিক শক্তিই নির্ভরযোগ্য নয়। আজ সঙ্গে আছে, কাল নেই।
যেমন বাজপেয়ী জমানায় টিডিপি দল তথা চন্দ্রবাবু নায়ডু বিজেপি শরিক ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি বেগতিক দেখেই সঙ্গ ছেড়েছিলেন চন্দ্রবাবু। নীতীশ কুমারের জেডিইউ যে কতবার বিজেপির সঙ্গে জুড়েছে, কতবার ছেড়েছে, তারও ইয়ত্তা নেই। তাই নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে জোট সরকার তৈরি হলেও, একটা আশঙ্কা থেকেই যাবে এদিক ওদিক হওয়ার। তা রুখতে, বিজেপিকে সেই আঞ্চলিক শক্তির মুখাপেক্ষী হয়েই থাকতে হবে।
এখন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলও একটি আঞ্চলিক শক্তি। বেশ জোরদার শক্তি। কিন্তু, দরকার পড়লে মমতা তথা তৃণমূল যে মোদীকে সমর্থন দিয়ে দেবেন বা তাঁদের জোটে সামিল হয়ে যাবেন, ব্যাপারটা ততটা সরল নয়। বরং বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদীর চিন্তাই বাড়াবে এই দল। কারণ, জাতীয় স্তরে বিরোধী জোটে তৃণমূল এখন তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি। কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির পরই তাদের সাংসদ সংখ্যা। সুতরাং সংসদের ভিতরে ও বাইরে বিজেপিকে চাপে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন মমতা। তাই গত দশ বছর ধরে কেন্দ্রে ক্ষমতায় থেকে বিজেপি মমতা বা তৃণমূলের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করেছে, তা এখন চালিয়ে যাওয়া মুশকিল।
শুধু তাই নয়, জাতীয় রাজনীতিতে মমতার প্রাসঙ্গিকতা বাড়ার অন্য কারণও রয়েছে। কীরকম? এই ভোটে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ৫৪ থেকে বেড়ে প্রায় ১০০ ছুঁইছুঁই হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এর কৃতিত্ব পুরোপুরি কংগ্রেসের একার নয়। মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ুতে জোটে থাকার সুবিধা পেয়েছে কংগ্রেস। সনিয়া-রাহুলের দল সদ্য ক্ষমতায় ফিরেছে কর্নাটক ও তেলেঙ্গানায়। তবে সেখানে বিজেপির সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে কংগ্রেসের ফল আশাপ্রদ নয়। বরং সেখানে বিজেপিই অধিকাংশ আসনে জিতেছে। কর্নাটকে ২৮টি আসনের মধ্যে ১৭টিতেই জিতেছে বিজেপি। তেলেঙ্গানায় ১৭টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ৮টি আসনে, কংগ্রেস মাত্র ৬টি আসনে জিতেছে। গুজরাত ও মধ্যপ্রদেশে বিজেপির সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে সবকটি আসনে হেরেছে কংগ্রেস। ছত্তীসগড়েও প্রায় একই অবস্থা। একমাত্র পাঞ্জাব ও রাজস্থানে কিছুটা মুখরক্ষা হয়েছে কংগ্রেসের।
ফলে একথা স্পষ্ট, যে এই কংগ্রেসকেও বিরোধী বন্ধুদের সঙ্গে তালমিল করেই চলতে হবে। এবং সেই বিরোধী জোটে কংগ্রেসকে বিগ ব্রাদারের ভূমিকা নিতে দেবেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বরং হতে পারে, তিনি নিজেই বিরোধী জোটের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন।
মঙ্গলবার লোকসভা ভোটের ফলাফল স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যও এদিক থেকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “কংগ্রেসকে বলেছিলাম, তোমরা একা পারবে না। ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করো। কংগ্রেস তা করেই ফল পেয়েছে। বাংলাতেও ওদের দুটো আসন ছাড়তে চেয়েছিলাম। ওরা রাজি হয়নি। রাজি হলে অন্তত দুটো আসনে জিতে যেত।”
এখন প্রশ্ন হল, মোদীর নেতৃত্বে বিজেপির আশানুরূপ ফল হল না কেন? পশ্চিমবঙ্গের আগামী দিনের রাজনীতিতে এর কী প্রভাব পড়বে?
এর উত্তরও পরিষ্কার। সহজ কথায়, এই লোকসভা ভোটে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ নরেন্দ্র মোদীর ‘গ্যারান্টি’ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাঁকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বারাণসীতে নরেন্দ্র মোদীর জয়ের ব্যবধানও আগের ভোটের তুলনায় অনেক কমে গেছে। কারণ, বহু মানুষ মনে করেছেন, আচ্ছে দিন আসেনি। কৃষকদের আয় দ্বিগুণ হয়নি। বছরে ২ কোটি বেকারের কর্মসংস্থান হয়নি। অর্থাৎ মোদীর প্রতিশ্রুতিগুলি ফাঁপা, গ্যারান্টিগুলি আসলে ভাঁওতা।
শুধু তাই নয়, যেভাবে কেবল দু’জন মানুষ দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছিলেন, তাতে স্বৈরাচারের গন্ধও বেরোতে শুরু করেছিল। সমাজে বিভাজনের বিষ ছড়ানো নিয়েও অসন্তুষ্ট ছিলেন বহু মানুষ। তা ছাড়া মহারাষ্ট্রে মানুষের মতামতকে দুমড়েমুচড়ে, অন্য দল ভাঙিয়ে সরকার গঠন, ইডি-সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সিগুলিকে অতিসক্রিয় করে তোলা, বিচার ব্যবস্থার উপর প্রভাব খাটানোর মতো বিষয়গুলিও বিপুল সংখ্যক মানুষ মেনে নিতে পারেনি।
সেই মোদী-প্রত্যাখ্যানের মেজাজ থেকে বাংলাও বিচ্ছিন্ন ছিল না। তাই লোকসভা ভোটে বাংলায় ভরাডুবিই হয়েছে বিজেপির। আবার কেন্দ্রেও এখন মোদী-শাহ জুটি দুর্বল। তাই রাজ্যেও বেশ স্বস্তিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হয়তো এবার কিছুটা হলেও সরকার ও দলকে ভাল করে গুছিয়ে নেবেন তিনি। হয়তো একই সঙ্গে নিজেকে প্রস্তুত করবেন জাতীয় রাজনীতির মঞ্চের জন্যও!