দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিনের শেষে ঘুমের দেশে... রবি ঠাকুর বলেছিলেন।
আর ঘুমই যদি না আসে! রাতের বেলা একদৃষ্টে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে নিজেকে যতই হিপনোটাইজ় করার চেষ্টা করা হোক না কেন, ঘুম ঠিক নাকের ডগা দিয়ে পিছলে পগাড় পাড়। রাত বাড়লেই মোবাইলের নীল আলো চোখ ভেদ করে একেবারে মাথায় গিয়ে সেঁধোয়। কাজেই “ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি” গান গাইলেও ঘুমের দেখা নেই। ‘আজ একটু ঘুমোবো’ এই ভরসা নিয়ে বিছানায় গিয়েও লাভ হয় না। ঘুম-ঘুম উত্তেজনায় ঘুমের বারোটা বেজে যায়।
এই যে ঘুম আসছি আসছি করেও আসে না, তার অনেক কারণ। ডাক্তাররা বলেন ঘুম না আসাটাই একটা রোগ। শরীরেরও তো একটা ঘড়ি আছে। সেও কাঁটায় কাঁটায় চলতে চায়। খিদে পাওয়ার যেমন সময় আছে, ঘুমেরও তেমনি সময় আছে। হাড়-মাংস-পেশী সমেত একটা শরীরকে চালানোর ধকল তো কম কিছু নয়! একটা সময় আসে যখন পেশীরাও বিশ্রাম চায়, স্নায়ুরা ঝিমিয়ে পড়ে, চোখের পাতা ঝাঁপ বন্ধ করতে চায়। তখনই ঘুম নেমে আসে। আর ক্লান্ত শরীরেও যদি ঘুম না আসে তার মানেই গণ্ডগোল বেঁধেছে ধরে নিতে হবে। ডাক্তারা বলেন অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া। তবে ঘুম না আসার রোগ যাকে বলে ‘স্লিপিং ডিসঅর্ডার’ (Sleeping Disorder) বলে তার অনেক রকমসকম আছে। যার শরীরে যেমন অস্বস্তি তার রোগের ধরনও তেমন।
রাত নামে, ঘুম আসে না
ঘুম আসে না কেন? রাত বাড়লে কান পাতলে এই দীর্ঘশ্বাস এখন ঘরে ঘরে। মাছে-ভাতে বাঙালি যাদের ঘুমের অভাব ছিল না, দুপুরে হোক বা রাতে বিছানায় টানটান হলেই ঘুমের ঝাঁপি খুলে যেত, তাদের ঘরেও হানা দিয়েছে অনিদ্রা। চারদিকে এখন শুধু ঘুম নেই, ঘুম নেই রব। ডাক্তাররা বলেন ঘুম না আসার কারণ যতটা শারীরিক ততটাই মানসিক। সেডেন্টারি লাইফস্টাইলে মানুষ সবসময়েই একরাশ চিন্তা-ভাবনা মাথায়, মনে জমিয়ে রাখে। অবসাদ, স্ট্রেসে হাঁসফাঁস করে ব্রেন। এত চিন্তার পাহাড় ডিঙিয়ে তাই শান্তির ঘুম নেমে আসাটা খুবই মুশকিল।
শারীরিক কারণও রয়েছে। ডায়াবেটিস, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, ফ্যাটি লিভার ও ওবেসিটির সমস্যা থাকে যাদের তারাও স্লিপিং ডিসঅর্ডারে ভোগে।
হরমোনের তারতম্যও ঘুম না আসার বড় কারণ। মহিলাদের মেনোপজের সময় হরমোনের নানারকম বদল হয়। তার প্রভাব পড়ে শরীরে। যার কারণেও অনেক সময় অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া এসে হানা দেয়।
পেশাগত কারণও থাকতে পারে। প্রতিযোগিতার দৌড়ে সারাদিনই কম্পিউটার, ল্যাপটপে মুখ গুঁজে থাকলে মাথায় চাপ পড়ে। স্নায়ুরা বিদ্রোহ করে। রাতে শুয়েও অনেকের মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি করার অভ্যাস আছে। ডাক্তাররা বলেন, মোবাইলের নীল আলো সরাসরি মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করে। ঘুমের ব্যাঘাত হয়। দিনের পর দিন এমন চালালে ক্রনিক স্লিপিং ডিসঅর্ডারও হতে পারে। যারা নাইট শিফট করে, তাদের পর্যাপ্ত ঘুমের দরকার হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্রামের সময়েও যদি নানারকম চিন্তা-ভাবনা বা মোবাইল-ট্যাবে ব্যস্ততা থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় রকম রোগ হতে পারে।
হেডফোনে দীর্ঘ সময় গান শোনার অভ্যাস আছে অনেকের। রাতে শুয়ে কানে হেডফোনে গুঁজে মনে যতই আবেগ আসুক, চোখে ঘুম সহজে আসবে না। ডাক্তাররা বলেন, হাই-ভলিউমে গান শোনেন যাঁরা, তাঁদের মস্তিষ্কে চাপ পড়ে। মাথা ব্যথা দিয়ে শুরু হয়ে মাইগ্রেনে গিয়ে শেষ হতে পারে। কাজেই ঘুমের রোগ যে এসে হানা দেবে সেটা বলাই বাহুল্য।
অনিদ্রা আরও একটা বড় কারণ হল শরীরচর্চার অভাব। খালি খাওয়া আর শোওয়ার দিকে ঝোঁক থাকলে শরীরও তার প্রতিবাদ করবে এটা তো জানা কথাই। অনিয়মিত ডায়েট, পুষ্টিকর খাবারের বদলে জাঙ্ক ফুড, তেল-মশলাদার খাবারে গলা-বুক জ্বালা, অম্বলে ঘুমের দফারফা হয়। তার উপর নিয়মিত এক্সারসাইজ না করলে রক্ত চলাচল ঠিকমতো হয় না, পেশীও ভরপুর শক্তি পায় না, গোটা সিস্টেমটাই বিগড়ে যায়।
ঘুমের রোগ
রাতের বেলা আকাশের দিকে চেয়ে তারা গোনা ছাড়া যখন আর উপায় থাকে না, তখনই বুঝতে হবে অনিদ্রা এসে হানা দিয়েছে। সবসময়েই যে রোগ হবে এমনটা নয়। অনেকেই মানসিক অবসাদ বা অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে ঘুমোতে পারেন না। মানসিক উদ্বেগও এর জন্য দায়ী। সবসময়েই যদি মাথা ও মন উত্তেজিত থাকে তাহলে স্নায়ুরা নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারে না। মনের মধ্যে তোলপাড় চলতে থাকে যার ফল ঘুম না আসা। এই সমস্যাই যদি দীর্ঘমেয়াদী হয়ে দাঁড়ায় তখনই তাকে রোগ বলা চলে। এই ঘুমের রোগ আবার নানা ধরনের।
ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা। সমীক্ষা বলছে, বিশ্বে প্রতি ১০০ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মধ্যে ৩৫-৪৫ জনই ইনসমনিয়ার সমস্যায় ভোগেন। ভারতে ৯% মানুষের ক্রনিক ইনসমনিয়া আছে। তবে এই সংখ্যা বেশিও হতে পারে। অন্তত ৩০% ভোগেন পার্শিয়াল বা অকেশনাল ইনসমনিয়ায়। অবসাদ, স্ট্রেস, মনোসংযোগের অভাব, স্থূলত্ব, হরমোনের তারতম্য, হজমের সমস্যা, লাইফস্টাইলে বদল ইত্যাদি নানা কারণ অনিদ্রা রোগের জন্য দায়ী। ক্রনিক রোগ থাকলেও তার থেকে ইনসমনিয়া হতে পারে।
স্লিপ অ্যাপনিয়া সাধারণত ঘুমের সময় শ্বাসের সমস্যার কারণে হয়। অনেকেরই নাক ডাকার সমস্যা থাকে। এর কারণ শ্বাস চালাচল বাধা পাওয়া। শরীরে কম অক্সিজেন ঢোকে ফলে নানারকম শারীরিক অস্বস্তি শুরু হয়। যার কারণে ঘুমের ব্যাঘাত হয়। সমীক্ষা বলছে, ভারতে ৩৫-৬৫ বছর বয়সী ৪.৪%-১৯.৭% পুরুষই স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভোগেন। এই সমস্যা রয়েছে মহিলাদেরও, ২.৫%-৭.৪%।
প্যারাসোমনিয়াস হল আরও একরকমের স্লিপ ডিসঅর্ডার। অজান্তে অনেকেই ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলা করেন যাকে ‘স্লিপ-ওয়াকিং’ বলে। তাছাড়া ঘুমের মধ্যে কথা বলা ‘স্লিপ-টকিং’, দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করা, গোঙানো ইত্যাদি নানা উপসর্গ আছে এই রোগের। ঘুমের মধ্যে বিছানাতেই প্রস্রাব করে ফেলার রোগ আছে অনেকের, শিশুরা ছাড়াও প্রাপ্তবয়স্করাও এই রোগের শিকার। এটাও স্লিপ ডিসঅর্ডারের একটা কারণ বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়াও অনেক রকমের স্লিপ ডিসঅর্ডার আছে যেমন রেস্টলেস লেগ সিন্ড্রোম, নারকোলেপসি, ডিলেইড স্লিপ ফেজ ডিসঅর্ডার ইত্যাদি।
আয় ঘুম
দিনে কম করেও ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা টানা ঘুম দরকার। তবেই বর্তমান লাইফস্টাইলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে গুছিয়ে নেওয়া যাবে। ঘুম না হলেই বিপদ আসবে নানা ভাবে। শরীর ভোগাবে, হার্টের রোগ হানা দেবে। অতিরিক্ত চিন্তা, টেনশন থেকে মানসিক রোগে ধরবে, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড একে একে সবই আসবে হুড়মুড়িয়ে।
একটানা, ক্লান্তিহীন নিশ্চিন্ত ঘুম পেতে হলে কিছু নিয়ম মানতেই হবে। ঘুমের বড়ি গাদা গাদা খেলে তার অন্যরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। ওষুধের বদলে বরং মানসিক স্থিতিতে কাজে দেয় বেশি। বিশেষজ্ঞরা তাই প্রথমেই বলেন, প্রতিদিন শোয়ার আগে কিছুক্ষণ মেডিটেশন করতে। মন শান্ত রেখে প্রাণায়াম বা যোগব্যায়ামে খুব দ্রুত কাজ হয়।
রাতের খাওয়া আর ঘুমের মধ্যে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টার বিরতি থাকতে হবে। এই সময় হাঁটাহাঁটি করলে খাবার হজম হয় দ্রুত। পাকস্থলী শান্ত থাকে, অম্বলের বাড়বাড়ন্ত হয় না। ঘুমও আসে তাড়াতাড়ি।
ঘুমনোর আগে চা, কফি বা ঠাণ্ডা পানীয় না খাওয়াই ভাল। সিগারেট টেনে ঘুমোতে যাওয়াও খুব একটা ভাল অভ্যাস নয়। এতে ঘুমের ক্ষতি তো হয়ই, শরীরেও তার ছাপ পড়ে। মদ্যপান করে ঘুমোতে যাওয়ার অভ্যাস থাকে অনেকের। এই অভ্যাস একসময় বদভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। তখন অ্যালকোহল ছাড়া ঘুম আসতে চায় না।
অতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনা না করাই ভাল, বিশেষত ঘুমনোর সময়। স্ট্রেস ফ্রি হয়ে ঘুমোতে যান।
ঘুম কেন আসছে না এই ভাবনা থেকেও ঘুম হয় না অনেকের। চিন্তা থেকে উদ্বেগ বাড়ে, ঘুমের ক্ষতি হয়। এই সময় হালকা মেডিটেশন করে নিলে ভাল কাজ দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাতে হালকা সুতির পোশাক পরে ঘুমোতে যাওয়া উচিত। আঁটোসাঁটো পোশাক বা সিন্থেটিক পোশাকে ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে।
একটানা বহুদিন ধরে ঘুমের সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই উচিত।